Home » রাজনীতি » একদলীয় নির্বাচনে জনবৈধতা মেলে না

একদলীয় নির্বাচনে জনবৈধতা মেলে না

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-62বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এখন আশংকাটি স্পষ্ট যে, ক্ষমতাসীনরা বিএনপিকে বাদ দিয়েই একদলীয় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। ঘটনাপ্রবাহ যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে জনগনের কাছে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহন করুকএটি ক্ষমতাসীন সরকার আদৌ চায় কিনা? নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কর্মকান্ড, আরপিও সংশোধন, তফসিল ঘোষণা না করাসব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, সহসাই সরকারের অভিপ্রায় অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে তৎপর হয়ে উঠবে রাষ্ট্রীয় সমগ্র ব্যবস্থা। এর মাঝেও যারা সব দলের অংশগ্রহনে নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখতে চান, তারা মনে করছেন, শেষতক একক নির্বাচনটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে না। সহিংসতা, ধংসযজ্ঞ, সংঘাত অব্যাহত থাকলে জরুরী অবস্থা জারি হতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন। আবার অনেকে এটাও মনে করছেন, /১১ এর মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে। এর বিপরীতে নানা আলোচনায় বিশ্লেষকরা এরকমও দাবি করছেন যে, অতীত অভিজ্ঞতায় দুই নেত্রীর কেউই ১/১১ এর পূনরাবৃত্তি চাইবেন না। এ কারনে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হবে। এই মূহুর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষেণ করলে তিনটি অপশন জনগনের সামনে অবয়ব পেতে শুরু করেছে। তাঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, এক. বিএনপিকে ছাড়াই আওয়ামী লীগের ভাষায় সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অথবা নির্বাচন অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে যাওয়া, দুই. জরুরি অবস্থা জারি এবং ১/১১ আদলে একটি সরকারের ক্ষমতাসীন হওয়া কিম্বা তিন. দুই জোটের মধ্যে সমঝোতা এবং নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান।

তিনটি অপশনের মধ্যে প্রথমটির বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে জনগন মনে করে। এর মূল কারন হচ্ছে, শেখ হাসিনা তার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কালে নির্বাচনপূর্ব যেসব জরীপ হাতে পেয়েছেন, তাতে একটি বিষয়ে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত যে, একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নূন্যতম নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে আওয়ামী লীগের জয়ী হবার কোন সম্ভাবনা নেই। প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, সংবাদপত্রের জরিপে এমনকি সরকারী সংস্থাগুলোর রিপোর্টে পরাজয়ের চিত্রটি তিনি সম্ভবত: পেয়ে গেছেন। সুতরাং জেনেশুনে বিএনপি’র কাছে ক্ষমতা তুলে দিতে তিনি রাজি নন। ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন নির্বাচনে পরাজয় জেনে একজন অনুগত তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বেছে নিয়েছিলেন। সে রকম একটি সরকারের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসতেও চেয়েছিলেন এবং পরিনামে ১/১১ এর সরকার ডেকে এনেছিলেন। শেখ হাসিনা কি তারই পূনরাবৃত্তি করছেন এবং প্রশ্ন হচ্ছে, এর চূড়ান্ত পরিনতি কি হতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশে একক এবং একদলীয় সংসদ নির্বাচনের রোগটি নতুন নয়, পুরোনোই। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন নিয়ে নেয়। অন্যান্য দল পায় মাত্র ৭টি আসন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বলতে গেলে ওটাই ছিল একক নির্বাচন। নির্বাচনে বলপ্রয়োগ, রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ব্যবহার করার নজীর ওই প্রথম। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের বিজয় ঠেকাতে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিয়ে আসাসহ বেশ কিছু ঘটনার কথা অনেকেরই হয়তো মনে আছে। ১৯৮৬ সালে দেশের প্রধান একটি দল বিএনপি এবং বাম রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতির জন্য এটি ছিল খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, আওয়ামী লীগের মত সংগঠিত ও সুসংঘবদ্ধ একটি দল সামরিক জান্তা আয়োজিত একটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদেরকে জয়ী হতে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, সামরিক শাসনের বৈধতাও এনে দিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, গোপন সমঝোতার এই নির্বাচনে জামায়াত অনুগামী হয়েছিল আওয়ামী লীগের। সামরিক শাসক এরশাদের দল এবং আওয়ামী লীগের মতো একটি সুসংগঠিত শক্তির পক্ষেও ওই সংসদটিকে টিকিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি শেষ পর্যন্তও তৈরি করতে পারেনি। আইনি বৈধতা থাকলেও জনগণের বৈধতা মেলেনি ওই সংসদটির ক্ষেত্রে। মাত্র ১ বছর ৯ মাস ২৭ দিন পরে আবারো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি ছিল প্রথম একদলীয় নির্বাচন। ১৯৯০ এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে পতিত এরশাদের সঙ্গে ঐ একদলীয় সংসদেরও বিলুপ্তি ঘটে। ১৯৯৬ সালেও বিএনপি এদেশে একক একটি নির্বাচন করেছিল যার আয়ুষ্কাল ছিল খুবই স্বল্প সময়ের। কাজেই একদলীয় নির্বাচন শেষ পর্যন্ত জনবৈধতা পায় না।

সবশেষ সংশোধিত সংবিধানের আওতায় আগামী সংসদ নির্বাচন করার ব্যাপারে শেখ হাসিনা সংকল্পবদ্ধ। এক্ষেত্রে যুক্তি হচ্ছে, অনির্বাচিত কারো হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না। সংবিধান সমুন্নত রেখেই যে কোন উপায়ে নির্বাচনটি তিনি করবেনই। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া নির্দলীয়, নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না এটি পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহন তার জন্য আত্মঘাতী হবে, সেটি তিনি বুঝে গেছেন। তিনি বলেই দিয়েছেন, প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে এমন ব্যবস্থা আনা হোক, যাতে নির্দলীয় আদলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হোক। কোন অবস্থাতেই তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না। প্রয়োজনে এ ধরনের কোন একদলীয় নির্বাচন, তা যতই বলা হোক সর্বদলীয় সরকারের অধীনে, তার ভাষায় তিনি সে নির্বাচন প্রতিহত করতে প্রস্তুত। দুই পক্ষই শক্তি দিয়ে জিততে চাইছে। এর ফলে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে জনগনকে। লড়াইয়ে যেই জিতুক তাতে জনগনের কোন উপকার বা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে না। এজন্যই সারাদেশের জনগনের কাছে প্রশ্নটি হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন কি হবে? হলে, কিভাবে? প্রধানমন্ত্রীর সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সূত্র মানলে, নির্বাচন অবশ্যই হতে হবে, যথাসময়ে এবং বিএনপিকে বাদ দিয়েই।

বাংলাদেশের ভূরাজনীতিগত গুরুত্বের কারনে স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলি এবং দাতাগোষ্ঠির প্রভাব প্রধান দুটি দল কখনোই উপেক্ষা করতে পারে না। এটি এখন মোটামৃটি পরিস্কার যে, পাশ্ববর্তী শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তার মূল কারন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ভারতের নিরাপত্তাজনিত স্বার্থ সুরক্ষিত থাকেএটি তাদের তরফ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা মনে করেন, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস, উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ প্রশয় দেন না এবং দমনে শক্ত ভূমিকা নিয়ে থাকেনভারতের সন্তুষ্টির জায়গা হচ্ছে এটি। বাংলাদেশ প্রশ্নে, পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ভারতের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন এবং সেমত করেই তারা তাদের অবস্থান অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছেন। নির্বাচন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে এসব বিষয় প্রভাবিত করছে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিরোধী দল হিসেবে গত পাঁচ বছরে বিএনপি নিজেকে যেমন সংগঠিত কোন দল হিসেবে,যেমন প্রমান করতে পারেনি, তেমনি সবচেয়ে কাঙ্খিত ইস্যুগুলিতে জনমতকে সংগঠিত করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে শক্তিশালী কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। গোটা পাঁচ বছরে তাদের নেতিবাচক রাজনীতি সরকারকে একের পর এক স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নিতে সুযোগ করে দিয়েছে। আগামীতে একটি মোটামুটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা জিতবে, তাদের এ ধারনাও ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনগনের নেতিবাচক পারসেপশন থেকে উদ্ভুত। কারন গত ২০ বছরে বাংলাদেশের ভোটের মূল ট্রেন্ড হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল পুন:নির্বাচিত হয়নি। সুতরাং ভোটের রাজনীতিতে এই মূহুর্তে বিএনপি’র জন্য ঝুঁকি একটাই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার আশংকা।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনা’র বদ্ধমূল ধারনা বিএনপি’র আন্দোলনের শক্তি নেই। জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে সন্ত্রাস, ধংসযজ্ঞ চালালেও নির্বাচন প্রতিহত করার শক্তি বিএনপি’র নেই। তিনি আরো মনে করেন, এই সন্ত্রাস, বোমাবাজি, জ্বালাওপোড়াওয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। সেজন্যই জনগনকে নিরাপত্তা দেবার বদলে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ভয়াবহ সব ঘটনায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ, প্রশাসন সাজানোএ অবস্থায় দুচারটে হরতাল, অবরোধ করে জনগনের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা যাবে, কিন্তু শেষাবধি নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না বিএনপি। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নানা বির্তকের জন্ম দিয়েছে। কমিশন দৃশ্যমান এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যা তাদের স্বাধীন এবং নিরপেক্ষতাকে প্রকাশ করে। বরং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে তারা আরেকটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই সংশোধনের ফলে যে কোন দল ভেঙ্গে বা দল থেকে লোক ভাগিয়ে এনে নির্বাচনে অংশ নেয়ানো যাবে। আর এক্ষেত্রে যে বিএনপিই টার্গেট, এ কথা বলাই বাহুল্য। সে কারনেই পরিস্থিতির নাটকীয় মোড় না ঘটলে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন করবে, সেটি মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনের আওতায় কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও হোঁচট খেয়েছে বার বার। এখানে সংসদীয় রাজনীতির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বৈরতান্ত্রিকতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং এভাবে ক্ষমতাসীন কোন দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়। বর্তমান সরকারও এই বিবেচনায় কাজ করছে এবং বিএনপিকে বাদ দিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকারের নামে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে কিছুদিনের জন্য হলেও ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা আপাতত: সেই পথেই এগুচ্ছেন। খুব নিকট ভবিতব্যই বলে দেবে বাংলাদেশের জনগনের ভাগ্যে কি আছে!