Home » রাজনীতি » ক্ষমতাসীনদের আত্মঘাতী কাজ-কারবার

ক্ষমতাসীনদের আত্মঘাতী কাজ-কারবার

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-cartoon-21নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ এবং হালে সবর্দলীয় সরকার গঠনের কথা সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে। তবে তাদের দিক থেকে এমন কোনো নিশ্চয়তা মিলছে না যে, সব দলকে রাজনীতির ময়দানে এবং নির্বাচনে সমান সুযোগসুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হবে না এমন বিষয়টি। বাস্তবেও এমনটা দেখা গেছে গত পক্ষকালের মধ্যেই। ৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে শোকসভাটি করেছে, ঠিক একই স্থানে ২৫ অক্টোবর কি পরিস্থিতিতেপরিবেশে সমাবেশটি করতে হয়েছিল বিরোধী দল বিএনপিকে। পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে, পুলিশ দিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, দেশবাসীকে সীমাহীন আতঙ্কের মধ্যে ফেলে অবশেষে ৫টি মাইক ব্যবহারসহ ১৩ দফা শর্ত দিয়ে, নানা বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করে ওই সমাবেশটি করতে দেয়া হয়েছিল। অথচ ক্ষমতাসীন হওয়ার জোর দেখিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করে, রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে, পোস্টারলিফলেট দিয়ে, শত শত যানবাহনে মানুষ এনে ৩ নভেম্বরের শোকসভাটিকে কিভাবে নির্বাচনী সভায় রূপ দেয়া হলো দেশবাসী তার প্রত্যক্ষদর্শী। এ সভাকে সফল করতে পুলিশর‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তাও সবাই দেখেছে। এই দৃশ্য যে নতুন নয়, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে দৃশ্যমাণ পুরনো চিত্র তাও সবাই জানে। প্রথমদিন থেকে সরকার বিরোধী দল, পক্ষ ও মতের উপরে যে সীমাহীন অত্যাচারনিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা, গুম করছে এসবও তো সবার জানা।

প্রধানমন্ত্রীসহ বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বার বার বলছেন, আগামী নির্বাচনটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ হবে। প্রধানমন্ত্রী এমনও উদাহরণ দিয়ে থাকেন, তার অধীনে যতোগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে কোনো কারচুপি হয়নি। অতএব তিনি এবং তার সরকারই যে কারো চেয়ে বেশি যোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এমনটি বোঝানোর জন্য তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বর্তমান সরকার পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনকে দলের কাজে এবং বিরোধীদের দমনপীড়নে যে একপেশে মনোভাব দেখিয়েছে তা এ সরকারটির বিশ্বাসযোগ্যতার উপরে আস্থা হারিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

সরকার শেষ পর্যন্ত একদলীয় নির্বাচনের পথেই যাচ্ছে এবং সেমতো প্রস্তুতিও নিচ্ছে। আর এমন একটি নির্বাচনের পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য তাদের দিক থেকে নানা সময়ে নানা প্রত্যক্ষপরোক্ষ কলাকৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, তা বোধ করি এ দেশের ইতিহাসে ইতোপূর্বে আর কখনো ঘটেনি। সর্বদলীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাস্তবে নিজেরা নিজেরা মিলে সর্বদলীয় সরকারের ব্যবস্থাটি করা হয়েছে। মহাজোটভুক্ত এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে আরো জনা দু’য়েককে ওই মন্ত্রীসভায় দেখা যাবে বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। এছাড়া জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টি এবং ক্ষমতাসীন জোটের দলগুলোকে নিয়েই মন্ত্রীসভাটি করার বিষয়টি আপাততঃ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চেষ্টা হচ্ছে বিএনপি থেকে দু’একজনকে মন্ত্রী করা যায় কিনা। দল ভাঙার চেষ্টারও খবর আছে। সোমবার মন্ত্রীসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিএনপির অনেকেই নির্বাচনে আসবে বলে তার কাছে তথ্য রয়েছে। কাজেই এই কৌশলটিও এখন দৃশ্যমাণ হতে শুরু করেছে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কি সরকারের খুটি এবং জনভিত্তি আরো মজবুত হবে? সরকারের ধারণা হয়তো হবে। কিন্তু বাস্তবে এমনটি কখনোই হয় না। ঢাকার প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক যৌথ জনমত জরিপের ফলাফল ওই পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে ২ নভেম্বর। এতে বলা হয়েছে, শতকরা ৫৫ ভাগ মানুষ আগামী নির্বাচনে ভোট দেবে বিরোধী দল বিএনপিকে এবং ২৮ শতাংশ ভোট দেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে। আর শতকরা ৭৭ ভাগ বলেছেন, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হোক তাই চান। গত ১১ মে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলো’র জনমত জরিপে বলা হয়েছিল শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এবং ওই জরিপে বলা হয়েছিল, ৮৫ ভাগ মানুষ মনে করেন দেশের অবস্থা খারাপ। ২০১১ এবং ২০১২ সালের জরিপেও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল।

কাজেই ক্ষমতাসীনরা জনমত তাদের পক্ষে রয়েছে বলে যা প্রচার করছেন, তা যে সহি এবং সঠিক নয় তা স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের এই মতামত ও মনোভাবের বিপক্ষে যাওয়াটা কি ক্ষমতাসীনদের জন্য আত্মঘাতী হবে না? তাদের সব উদ্যোগ কি দেশ এবং এর মানুষকে আরো বিপন্ন করে তুলবে না?