Home » রাজনীতি » টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স :: রাজনৈতিক আনুগত্যের বাণিজ্য

টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স :: রাজনৈতিক আনুগত্যের বাণিজ্য

ফ্লোরা সরকার

political-tv-channelsবেসরকারি টেলিভিশনের রাজনৈতিক লাইসেন্স” শিরোনামে গত ২০ অক্টোবর, ২০১৩, প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায় শেষ সময়ে আরো একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া সর্বশেষ এই চ্যানেলের নাম ৫২ (বায়ান্ন)। উল্লেখিত খবরে আরো জানা যায়, আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আব্দুল মালেক উকিলের ছেলে বাহারউদ্দিন খেলনের স্ত্রীর নামে দেয়া হয়েছে এই লাইসেন্স। তার সঙ্গে রয়েছে বেঙ্গল গ্রুপ। বাহারউদ্দিন বর্তমানে বিটিভির উপপরিচালক (বার্তা)। টিভি চ্যানেল স্থাপন এবং পরিচালনায় আর্থিক সঙ্গতি নেই তার। তাছাড়া সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে লাইসেন্স পেতে পারেন না। তাই বেঙ্গল গ্রুপকে অর্থায়নকারী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেন ‘বেঙ্গল টেলিভিশন চ্যানেল লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি। তথ্যমন্ত্রণালয় থেকে গত ১ অক্টোবর এই কোম্পানির নামে দেয়া হয় লাইসেন্স। চ্যানেল বায়ান্ন সহ বর্তমান মেয়াদে মোট ১৬টি চ্যানেলের লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধিতে আমাদের অবশ্যই কোন আপত্তি থাকার কথা না। গত বিএনপি সরকারের সময়ে দেয়া হয়েছিল ১১ টির লাইসেন্স। অর্থাৎ সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায় চ্যানেলের সংখ্যা। যদিও বিএনপি সময়ের ১১ টি চ্যানেলের মাঝে বর্তমানে চালু রয়েছে ছয়টি বৈশাখী, এন.টি.ভি, আরটিভি, বাংলাভিশন, দেশটিভি এবং এস..টিভি, যদিও ইতিমধ্যে কিছু চ্যানেলের মালিকানার বদল ঘটেছে। চ্যানেল ওয়ান বন্ধ হয়ে গেছে। দিগন্তএবং ইসলামিক টিভির সম্প্রচার ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। টিভি চ্যানেলের এই সংখ্যা হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে থাকে মূলত রাজনৈতিক কারণে, কোন চ্যানেলের মাননিয়ন্ত্রণজনিত কারণে নয়। যেমন বিএনপি সময়ে টেরিস্টরিয়ালজনিত জটিলতাকে কেন্দ্র করে একুশে টিভির সম্প্রচারও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। টিভি চ্যানেলের এই সম্প্রচার বৃদ্ধি এবং বন্ধ দুটোই ঘটে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে আর এখানেই আমাদের আশঙ্কা। কেননা সমগ্র বিশ্বে টিভি চ্যানেলগুলো প্রধানত বিনোদন এবং অবাধ তথ্য প্রবাহের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে প্রদর্শিত হয়ে থাকে। আমাদের দেশে এই দুটোরই (বিনোদন এবং অবাধ তথ্য প্রবাহ) ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। কীভাবে, কেনো ঘটে তা আমরা আলোচনার মধ্যে দিয়েই জানতে পারবো। আলোচনার সুবিধার্থে দুটো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে – () টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ এবং () টিভি চ্যানেলের সংখ্যাবৃদ্ধি। তার আগে আমরা বিশ্বমিডিয়ার পরিস্থিতির দিকে সংক্ষিপ্ত আকারে সামান্য দৃষ্টি দিতে পারি।

২০১০ সালের ১৬ জুন, আইসল্যান্ডের পার্লামেন্ট ‘অলথিং’ এ সারারাত আলোচনা শেষে ভোর ৪টায় একটি যুগান্তকারী আইন পাশ হয়। আইনটি হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, অবাধ তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা এবং ফিফথ এস্টেট (ইন্টারনেট)-এর কর্মকাণ্ড চালানোর স্বাধীনতা। যদিও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে আইসল্যান্ড বরাবরই বিশ্বে এক নম্বর রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করতো কিন্তু এই আইন পাশ করার মধ্য দিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তথা সাংবাদিকতার স্বর্গে পরিণত হলো। শুধু তাই না, আইসল্যান্ডের পার্লামেন্ট (অলথিং) ‘বক্তব্য স্বাধীনতা’র জন্যে একটি পুরস্কারও ঘোষণা করে, যা নোবেল পুরস্কারের সমকক্ষ। এই পুরস্কার বিশ্বের সব অনুসন্ধানী এবং হুইসেলব্লোয়ারদের (সমাজে, সরকারে বা কোনো সংগঠনের অবৈধ বা গোপন অনভিপ্রেত তথ্যের প্রকাশকারী এবং সাবধানকারী) জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। আইসল্যান্ড পার্লামেন্টের একজন সংসদ সদস্য ইভা জলি আইনটির পক্ষে উৎফুল্ল হয়ে বলেন – “দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে যেয়ে দেখেছি, একটি শক্তিশালী পদ্ধতি দরকার, যার মাধ্যমে সত্যিকারের তথ্য পাওয়া যাবে এবং জনগণও সব খবর পেতে পারে। তাদের জন্যে পূর্ণ তথ্য যা সত্য ও অবিকৃতভাবে পাওয়া যাবে, যাতে তারা সরকার এবং তাদের কর্মকাচারীর ওপর নজর রাখতে পারে। গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রের মালিক, জনগণের মালিক নয়। সরকার প্রতিনিধিমাত্র, কিছু দায়িত্ব পালনের জন্য। অথচ একবার ক্ষমতায় গেলে তারা মালিকের মতো ব্যবহার করে”। আইনটি নিয়ে আইসল্যান্ডে মাতামাতি হলেও মার্কিন সংবাদমাধ্যগুলোকে তেমন নাড়া দিতে পারেনি। কেননা সেই বছরেই উইকিলিক্সের মাধ্যমে ইরাক এবং আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং অন্যান্য কর্মকান্ডের পুরোটাই যে মিথ্যাচারের মধ্যে দিয়ে সংঘটিত হয়েছিল তা বিশ্ব জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সি.আই.. বিশ্লেষক রে ম্যাকগভার্ন অভিযোগের সুরে বলেন যারা (মার্কিনি) এই কর্পোরেট মিডিয়ার মালিক এবং পরিচালক তাদের সামনে একটি বিষাদী সমস্যা হলো ব্যবসা এবং বিবেক। ব্যবসা করতে হলে সরকার ও প্রেসার গ্রুপের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দিতে হবে। অথচ বিবেক এবং সাংবাদিকতার জন্যে সত্য বলতে হয় কাজেই সংবাদ মাধ্যমকে দুটির একটি পথ বেছে নিতে হবে প্রথম কাজটি খুব সহজ, সরকারি হুকুমের প্রেসরিলিজ এবং তথ্যটুকু গ্রহণ করা। অপরটি হলো উইকিলিক্সকে অনুসরণ করে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সত্যকে প্রকাশ করা, যা সরকারি চাপের মুখে চাপা মাথা নত করবে না”। মার্কিনি প্রচারযন্ত্রের মুনাফা নির্ভরতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন মার্কিনি ভাষাতাত্ত্বিক এবং পন্ডিত নোয়াম চমস্কি, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তার “ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট দ্য পলিটিক্যাল ইকোনোমি অফ দ্য মাস মিডিয়া” বইটিতে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পশ্চিমা (বিশেষত মার্কিনি) গণমাধ্যমগুলো সেখানকার বড় বড় পুঁজিপতিরা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর দ্বারা বিপুল পরিমাণ মুনাফা হাতিয়ে নেয়। তথ্যের ধরণ, গুণাগুণ, পরিবেশন কৌশল সবটাই মুনাফা ভিত্তিক। গণমতের প্রতিনিধিত্বকারী বলে পরিচিত এসব গণমাধ্যমে জনমত উচ্চারিত হয়না। জনমতের ভান ধরে এসব মিডিয়া প্রকৃতপক্ষে জনমতকে বিভ্রান্ত করে। জনগণের প্রয়োজন জনগণ নির্ধারণ করতে পারেনা, মিডিয়া নির্ধারণ করে দেয়। শুধু তাই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি জায়েজ করার জন্যে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করে এবং মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে তার একটি নমুনা চমস্কির একটি বক্তৃতায় আমরা অবলোকন করি হান্টিংটন তত্ত্বের সেই প্রেক্ষাপটটি আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই ? ‘ঠান্ডা লড়াই’ শেষ হওয়ার পরের ঘটনা সেটা। সোভিয়েত ইউনিয়ান ধক্ষসে যাবার পর ‘ঠান্ডা লড়াই’ তত্ত্বের অজুহাত আর টিকলো না। এখন দরকার নতুন কোন ছুতো। সত্যি বলতে কী, এই ধরণের একটা ছুতোর সন্ধান চলেছে বেশ অনেকদিন ধরে, তা প্রায় বছর কুড়ি তো হবেই। রেগ্যান প্রশাসন চালু হবার সময় থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছিলো যে রাশিয়ান ভয় দেখিয়ে আর বেশিদিন চলবে না। ফলে তারা শাসনভার গ্রহণ করলো এই বলে যে, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের আতঙ্ক নিরসন করাই এখন তাদের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য। কৌশলে সামান্য রদবদল হলো ঠিকই, কিন্তু শাসননীতি থাকলো একই রকম। মনে রাখবেন, বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম কাজই হলো, চারপাশে কী ঘটছে মানুষ যেন তা বুঝতে নাপারে তার ব্যবস্থা করা —-” (‘মিলিটারিজম, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড পিপলস রাইট টু ইনফরমেশন’ শীর্ষক বক্তৃতার পর প্রশ্নের উত্তরে, ২০০১)। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শক্তিধর দেশের মিডিয়ারই যখন এই অবস্থা তখন বাংলাদেশের মতো কথিত তৃতীয় বিশ্বের মিডিয়ার অবস্থা যে তা থেকে খুব একটা উন্নতস্তরে অবস্থান করবে না তা বলাইবাহুল্য।

রবিণ ঘোষ ২০০৪ সালে চমৎকার শীরনামে রাজনৈতিকপ্রবন্ধের একটি বই প্রকাশ করেছিলেন, শীরনামটি ছিলো – “যে আমার সঙ্গে নেই, সেই আমার বিরুদ্ধে।” দুনিয়াটাই বোধহয় এখন এই রকম হয়ে গেছে। মতের বিরুদ্ধতার অর্থ সঙ্গ বিরুদ্ধতা। অথচ মতের অমিল যে কার্ল মার্ক্সের বিখ্যাত ‘দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায়’ ভিন্নমতকে একত্রিত করার দিকে ধাবিত করে সেকথা মাথায় একদম কাজ করেনা। বিরুদ্ধ মত অতএব বিরুদ্ধ সঙ্গ, অতএব বিদায়। এভাবেই দুই প্রধান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে বেশকিছু টিভি চ্যানেল। কিন্তু আমরা যতদূর জানি মানুষে বাক ‘রুদ্ধ’ হলেও চিন্তার দরজা থাকে খোলা এবং প্রবাহমান। কাজেই চ্যানেল বন্ধ কোনদিনও কোন স্থায়ী সমাধান তো দিতে পারেই না, মাঝখান থেকে কিছু মানুষ বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে, স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকার নুন্যতম মৌলিক অধিকারটুকুও হারায়। এবং বলাই বাহুল্য বেঁচে থাকার এই নুন্যতম মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়ার কোন অধিকার কোন সরকারের নেই। আশাকরি ভবিষ্যতে এই ধরণের বন্ধ দরজা আর রুদ্ধ হবে না। তবে অনুষ্ঠানের মান, বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের উপস্থাপন, লাইসেন্স গ্রহণে ও চ্যানেল স্থাপনে স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয়ক জটিলতা থাকলে ভিন্ন কথা।

আমাদের দ্বিতীয় অভিধাটি অর্থাৎ ‘টিভি চ্যানেলের সংখ্যাবৃদ্ধি’ র অবস্থা আরো ভয়াবহ। ঐ একই তারিখের একই শীরনামের প্রথম আলো থেকে আরো জানা যায় টিভি লাইসেন্স মালিকদের বেশির ভাগেরই চ্যানেল স্থাপন, পরিচালনা এবং অভিজ্ঞতা কোনটাই নেই। তাদের একমাত্র যোগ্যতা রাজনৈতিক যোগাযোগ”। উল্লেখিত খবরটি এই পর্যন্ত যেয়ে থেমে গেলে বেশ হতো। অভিজ্ঞতা অনেকের নাও থাকতে পারে। কাজ করতে করতেই অভিজ্ঞতা বাড়ে। কিন্তু খবরে প্রকাশিত তার পরের অংশটি আরো ভয়ঙ্কর লাইসেন্স নিয়ে অনেকেই পরে উচ্চ মূল্যে মালিকানা বিক্রি করেছেন। আর এই পথে বিনা মূলধনে লাভবান হয়েছেন রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া অনেক চ্যানেল মালিক। অথচ বিক্রির আগে এমনকি সরকারের অনুমতিও নেননি তারা। অনেকে আবার চেষ্টা করেও দরদামে বনিবনা না হওয়ায় বিক্রি করতে পারছেন না। তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের পরিদপ্তর (রেজেসকো) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।” কাজেই রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স নিয়ে তা বিক্রি করা (কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন ছাড়া) যে একধরণের জালিয়াতি এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছেন। এখান থেকে বেশকিছু দিক উঠে আসে

. রাজনৈতিক লাইসেন্স টিভি চ্যানেলকে বণিজ্যিক এবং মুনাফার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

. শুধুমাত্র যারা রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারেন এমন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষমতাবানরাই টিভি লাইসেন্স পাচ্ছেন।

. যোগ্য লোকের জায়গায় অযোগ্য লোকের ভীড় বাড়ছে টিভি চ্যানেলগুলোতে।

. রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে স্থাপিত এসব চ্যানেল খুব স্বাভাবিক ভাবেই জনমতের আনুগত্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের দ্বারা পরিচালিত হবে। এতে করে দেশের সঠিক অবস্থান তুলে ধরা যে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে এতে অবাক হবার কিছু নেই।

. আমরা বহুদলীয় গণতন্ত্র বলে যতটা সোচ্চার ঠিক ততটাই অনুচ্চার বহুদলীয় মিডিয়া স্থাপন নিয়ে।

. মিডিয়ার পেশাদারিত্বের অভাবের কারণে রাজনৈতিক বিভাজনে বিভাজিত হয়ে পড়েছে এসব মিডিয়া।

সপ্তম এবং শেষতম যে পরিণাম তা সবচাইতে ভয়াবহ। এই পরিণাম বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো যে লক্ষ্যে স্থাপিত তার মর্মশ্বাসটুকু নিঃশেষ করে দিবে। প্রথমত: জনগণ প্রকৃত সত্য থেকে বঞ্চিত হবে। অর্ধসত্য বা মিথ্যা তথ্যের ভারে জনগণকে নিমজ্জ্বিত করা হবে এবং জনগণ সেসব মিথ্যা বা অর্ধসত্য খবর, প্রতিবেদন বা বিনোদন বিশ্বাস করতে শুরু করবে। দ্বিতীয়ত: অবাধ তথ্যপ্রবাহ ছাড়াও, যে বিনোদনকে সামনে রেখে অর্থাৎ নাটক, নাচ, গান ও সাংস্কৃতিক অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি উপস্থাপন করা হয়ে থাকে তার মান নামতে শুরু করবে। ইতিমধ্যেই এর মান অনেক নেমে গেছে। মানুষ এখন টেলিভিশনের এসব বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখেনা বললেই চলে। মনে রাখা প্রয়োজন বিনোদনও অন্যান্য পণ্যের মতো অন্যতম একটি অর্থনৈতিক পণ্য। মুক্ত বাজার অর্থনীতির নিয়মে শুধু নয় অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই দেশীয় পণ্যের আকর্ষণ হ্রাস পেলে বিদেশী পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়ে যায়। যখন টিভি ছিলনা তখনও মানুষ দেশি লাক্স ছেড়ে বিদেশী লাক্সের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতো, দেশী রেডিওর চেয়ে বিবিসি অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ছিলো। এটা নিছক একটা উদাহরণ হিসেবে কথাটা বলা হলো। কাজেই যখনই দেশী চ্যানেলে অনীহা চলে আসলে স্বাভাবিক ভাবেই আমরা বিদেশী চ্যানেলের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবো। ইতিমধ্যেই ভারতীয় চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের প্রায় পুরোটা বাজার দখলে নিয়ে ফেলেছে, শুধুমাত্র আমাদের নিম্নমানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কারণে, যে ভারতীয় চ্যানেলের জন্যে সরকারকে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

মুনাফাকে সামনে রেখেই যেকোন পণ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। কিন্তু মুনাফার সঙ্গে আনুগত্যের মিশেলে যে পণ্য তৈরি হয় সেই পণ্যে মানুষ বিভ্রান্ত হতে বাধ্য। চমস্কি তার উল্লেখিত বইয়ের এ প্রপাগান্ডা মডেল অধ্যায়ে বলছেন – “যদি সরকার বা কর্পোরেট কমিউনিটি এবং মিডিয়া মনে করে গল্পটি (অর্থাৎ খবর বা প্রতিবেদন) নাটকীয় এবং দর্শক খাবে (দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, আজকাল খবর বা বিনোদনকে ‘খাদ্য’ হিসেবেই পরিগণিত করা হয় অনুবাদক) তাহলে তারা সেই বিষয়টির দিকেই কেন্দ্রীভূত হয় এবং জনগণকে সেভাবেই বহষরমযঃবহ বা আলোকিত করে।” কাজেই মুনাফা ভিত্তিক পণ্য এবং আনুগত্যভিক্তিক পণ্যের মাঝে যে সুক্ষ ভেদরেখা বিরাজ করে তা আমাদের ভালো করে অনুধাবন করতে হবে। যে ভেদরেখা চ্যানেলের রাজনৈতিক লাইসেন্স স্থাপনে উৎসাহ যোগায়। আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন টেলিভিশনের ছোট পর্দাটি কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রপাগান্ডার পর্দা নয়। ডান, বাম, মধ্যপন্থী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের দর্শক ছাড়াও আরো কিছু দর্শক থাকেন যারা দেখে এবং শুনে শেখার চেষ্টা করেন, বোঝার চেষ্টা করেন। একবার নিম্নরুচির পণ্যে অভ্যস্থ হয়ে গেলে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও সেভাবে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। আর নিম্নমানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চয়ই কারো কাম্য নয়। সব থেকে বড় কথা, বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় একবার হেরে গেলে সেই বাজার পুনর্দখল অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বাইরের বাজারের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হয়। বাইরের বাজারের এই মুখাপেক্ষীতা, টেলিভিশনের মতো মিডিয়া আমাদের তখন বিদেশী রুচি, শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপনে এমন ভাবে প্রভাবিত এবং অভ্যস্থ করে তোলে যে তখন আর নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, জীবনযাপনকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আনুগত্য নয় স্বাধীনতা, মুখাপেক্ষীতা নয় আত্মনির্ভরশীলতা, বাণিজ্য নয় বিনোদন ও তথ্যের সত্যনিষ্ঠতা, মুনাফা এবং প্রতিযোগিতাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে। নাহলে বিটিভির অতীত খ্যাত ‘সাহেব বিবি গোলাম’এর বাক্সের মতো আমাদের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বর্তমান বিটিভি খ্যাত শুধুই ‘গোলামের বাক্স’ হয়ে থাকবে। আশাকরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দেশের বিবেকবান মানুষ বিষয়টি ভেবে দেখবেন।।

১টি মন্তব্য

  1. Shirajul Islam Mukul

    বর্তমানে সরকার সমর্থক অনেক মানুষকেই টকশো সমূহের সমালোচনা করতে দেখা যায়, কারণ হলো আলোচকরা সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন বলে। তা তাঁরা করতে পারেন বলেই করেন। আমার মনে হয় তাতে একটা কথা স্পষ্টতা পায় এমনভাবে যে, মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছে। ধন্যবাদ সুন্দর লেখাটার জন্য