Home » অর্থনীতি » আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (শেষ পর্ব)

আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নেপথ্যে (শেষ পর্ব)

অস্ত্র বিক্রির গোপন লেনদেনের চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে

ডেভিড লে এবং রব ইভানস, দি গার্ডিয়ান থেকে

arms tradeবিএই’র যে সব শেয়ারের দর পড়ে গিয়েছিল ইতোমধ্যে সেগুলোতে আবার তেজীভাব লক্ষ্য করা গেল। অনেকেই মনে করেন, গোল্ডস্মিথ তার দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি যা করেছেন সেটি অত্যন্ত খারাপ একটি কাজ। দুর্নীতি বিরোধী যুক্তরাজ্যের একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি তিনি কার্যকরভাবেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। হোয়াইট হলের গোলমেলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি ঘোষণা করে দেন, বিদেশী কোনো ঘুষ গ্রহণকারী যতোক্ষণ পর্যন্ত না স্বীকার করবেন যে, তিনি তার পক্ষ হয়ে ঘুষের অর্থ গ্রহণ করার জন্য নিজের অধীনস্থ কাউকে দায়িত্ব দেননি, ততোক্ষণ পর্যন্ত ২০০২ আইনের আওতায় ঘুষ প্রদানের দায়ে কারো বিরুদ্ধে কোনো রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়াল এই যে, এসএফও বিশ্বের কারো বিরুদ্ধে কোনো রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়াল এই যে, এসএফও বিশ্বের আরো চারটি দেশে বিএই’র দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে তদন্ত কাজ চালাচ্ছিল সেগুলো বাতিল না হয়ে আর উপায় নেই। আর শেষ পর্যনন্ত এসএফও বিদেশের মাটিতে যদি বিআইএ’র দুর্নীতির কোনো ঘটনা শনাক্ত করেও তবু এটা বিশ্বাস করাবার কোনো কারণ নেই যে, সে দেশের শাসকরা ভিন্ন দেশের একটি আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়ে নিজেদের জন্য বিব্রতকর একটা অবস্থা তৈরি করবেন।

আর শাসক যদি নিজেই ঘুষের অর্থ গ্রহণ করেন সেক্ষেত্রে অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবে, যেমনটা করেছিলেন গত শতকের সত্তরের দশকে ইরানের শাহ এবং সৌদি বাদশাহর ভাই? ব্রিটেন আইনগত ত্রুটি সংক্রান্ত এই অভিযোগগুলো মীমাংসার ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও সে দুর্নীতি সংক্রান্ত আইনগুলোর আধুনিকায়নের ব্যাপারে ওইসিডি’র কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনাকারীগণ রণে ভঙ্গ দিয়ে অবসান আর হতাশায় নিমজ্জিত হলেন। দুর্নীতির মামলাগুলে নিয়ন্ত্রণকারী এসএফও কর্মকর্তা ম্যাথু কোয়িং নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অফিসে যান এবং কিভাবে আরো ব্যবসা পাওয়া যায় সে সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করেন। সুতরাং বিএই’র ঘটনাটি শেষ পর্যনন্ত কারো কারো কাছে ব্রিটেনের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতে থাকলো।

তবে একথাও ঠিক, এই কেলেঙ্কারির ঘটনাটি দেশের সর্ববৃহৎ অস্ত্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটির এবং নিজেকে অতিমাত্রায় নীতিনিষ্ঠ হিসেবে দাবি করা একজন প্রধানমন্ত্রীর সুনাম চিরতরে বিনষ্ট করে দিয়েছিল।

ওইসিডি প্যারিসে বিষয়টির বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব এক নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করে যার ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিও সম্পাদিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। লনন্ডনে দুর্নীতিবিরোধী অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে প্রতিবাদ জানিয়ে যান। আর বিশ্বজুড়ে ব্রিটেন একটি ভণ্ডজাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

জাল বিস্তৃত হতে থাকলো

ব্রিটেনের সিরিয়াস ফ্রড অফিসের (এসএফও) পরিচালক ছিলেন রবার্ট ওয়ারডল। গার্ডিয়ান পত্রিকা ২০০৩ সালে বিএই’র বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের খবরটি ফাঁস করে দেয়ার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কৌসুলিগণ তদন্ত কাজ শুরু করে দেন। ব্রিটেনের সিরিয়াস ফ্রড অফিসও শুরুতেই বিষয়টি হাতে নেয়। অফিসে সহকারী পরিচালক হেলেন গার্লিক এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবিরোধী পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট রবার্ট এলেনের যৌথ নেতৃত্বে একটি তদন্ত দলও গঠন করা হয়। কিন্তু বিএই’র সৌদি মামলার ব্যাপারে চলতে থাকা তাদের তদন্ত কার্যক্রমটি ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সৌদি শাসক পরিবার থেকে আসা হুমকি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। টনি ব্লেয়ার দাবি করলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ হুমকির মুখে। তবে তদন্ত দলটি বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিএই’র সন্দেহজনক দুর্নীতির ঘটনাগুলোর পিছু লেগে থাকলো। ব্রিটিশরা দুর্নীতির ঘটনাগুলো অধিক হারে উদঘাটন করতে শুরু করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

সুইডেনের সরকারি কৌসুলি ক্রাইস্টার ভন দ্য কস্ট বিএই এবং গ্রিপেন ফাইটারের সুইডিশ কোম্পানি সাবের মধ্যেকার যৌথ বিপনন কার্যক্রমে কোনো রকম দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কার্যক্রম চালু করে দেন।

সুইজারল্যান্ড সরকারের বার্নস্থ কেন্দ্রীয় উপকৌসুলি মারিয়া স্নেবলি বিএই’র সম্ভাব্য মুদ্রা পাচার ঘটনার বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত পরিচালনার ঘোষণা দেন। এর আগেই লন্ডনে এসএফও কর্মকর্তারা দুই সৌদি দালাল ওয়াফিক সাইদ এবং মোহাম্মদ সাফাদির সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে তল্লাশি চালিয়েছিল। তবে তাদের কারো বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়নি। ২০০৭ সালের মে’তে সুইস কর্তৃপক্ষ ওয়াফিক ও সাইদের আইনজীবী মার্কবোনাটকে জানায়, সেই সময় তারা ওয়াফিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের লক্ষ্যে কোনো রকম তদন্ত চালাচ্ছিল না।

চিলিতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপাটমেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত সার্গেই মুনজ নামের একজন তদন্ত বিচারক সাবেক স্বৈরশাসক অগান্তে পিনোশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অবৈধ পথে অর্থপ্রাপ্তির অভিযোগের ব্যাপারে একটি তদন্ত চালিয়েছিলেন। রুমানিয়া, তাঞ্জানিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং চেক প্রজাতন্ত্রেও দুর্নীতি দমন ব্যুরোগুলো বেশ জোরেশোরেই একই কাজ করেছে। ২০০৭ সালের ভিয়েনায় একজন দালালকে অর্থ প্রদানের ঘটনাটি ধরা পড়ার পর অস্ট্রীয় সরকারও ইউরোজাস্টের সদর দফতর দ্য হেগে এসে তাদের অন্যান্য ইউরোপীয় কৌসুলির সঙ্গে যোগ দেয়। হাঙ্গেরি এবং বুলগেরিয়ার সঙ্গে বিএই’র গোপন বেচাকেনার চুক্তিটি ২০০৭ সালের জুনে সুইডেনের টেলিভিশন ফাঁস করে দেয়। এই ঘটনার পরপরই হাঙ্গেরি সরকার তাদের নিজস্ব কোম্পানি গ্রিডেনফাইটারের কর্মকাণ্ড তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে। সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে। গার্ডিয়ান পত্রিকা প্রকাশ করে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত তৎকালীন সৌদি রাষ্ট্রদূত যুবরাজ বন্দরের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর জন্য বিএই মার্কিন ব্যাংকের সাহায্য নিয়েছিল।

বিএই’র ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্বস্তিবোধ কাাজ করছিল। ২০০২ সালে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি ওয়েন ওয়াশিংটনে ব্যক্তিগত এক আলাপচারিতায় ব্রিটেনের একজন উচ্চপদস্থ বেসামরিক আমলাকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করতে গিয়ে বলেন : ‘যুক্তরাষ্ট্রে যদি এই পরিমাণ অভিযোগ উত্থাপিত হতো তবে আমাদের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অপরাধ বিভাগ বহু আগেই এ সবের বিরুদ্ধে একটা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে দিত।’

এসএফও কর্তৃক সৌদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে ব্রিটেন ২০০৭ সালে ঘুষবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিকে অমান্য করলে যুক্তরাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। অবশেষে ২০০৭ সালের ২৬ জুন বিএই লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়, মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট তাদের তদন্ত কাজ শুরু করে দিয়েছে। এফসিপিএ’র মামলা পরিচালনাকারী ওয়াশিংটনের প্রধান কৌসুলি মার্ক মেন্ডেলসন ১৯৭৭ সালের ফরেন করাল্ট প্রাকটিসেস এক্টের আওতায় একটি তদন্ত কার্যক্রম চালু করেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেল গর্ডন ব্রাউন প্রশাসনের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর দেখলেন, এতদিন তারা যেই সৌদি দুর্নীতির মামলাটিকে এখতিয়ার বহির্ভূত ঘোষণা করে নিজেদের কৌসুলিদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন ওয়াশিংটন কর্তৃপক্ষ তাদের সামনেই সেই মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। তাদের জন্যে এটি ছিল অত্যন্ত অপমানজনক একটি মূহুর্ত।

বিএই যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র বিক্রির জন্যে গোপন লেনদেন করেছে ইতোমধ্যে সে সবের চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।।

(শেষ)