Home » রাজনীতি » ডেট এক্সপায়ার্ড সরকারের অসম্ভব সব আচরণ

ডেট এক্সপায়ার্ড সরকারের অসম্ভব সব আচরণ

আবীর হাসান

political-cartoons-53গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টাকে এড়িয়েই যে নির্বাচনটা হওয়াতে চাচ্ছে সরকার তা এখন পরিষ্কার। আর সংবিধানের সর্বশেস পরিবর্তিত বিধানের বশবর্তী থাকা, না থাকাটাই এখন প্রধান রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে উঠেছে। কুর্নিশ করে মন্ত্রীদের তারিখবিহীন পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার আনুষ্ঠানিকতাও হল। হল মনোনয়নপত্র বিক্রিও। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠাতে শুরু করেছে দিকে দিকে। সংসদও সচল থাকছে নাকি বিরোধী দলের অপেক্ষায়। আর বিরোধী দল রাজপথে। ডাকসাইটে নেতাদের কয়েকজন জেলে, বাকিরা পলাতক।

এই তালিকাও পরিস্থিতিকে পুরোটা বোঝাতে পারছে না কারণ কোন ব্যাপারই স্বাভাবিক নয়। কেন সংবিধান পরিবর্তন করে সেই সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করতে হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন না করে, তার যে কৈফিয়ত ক্ষমতাসীনরা দিয়ে যাচ্ছেন তা স্বাভাবিক নয় প্রথমদিকে বলা হতো ‘ওয়ান ইলেভেন যাতে আর না আসে সে জন্য।’ এখন বলা হচ্ছে – ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করার জন্য।’ স্বাভাবিক কৈফিয়ত বা যুৎসই অজুহাত নিশ্চয়ই হয় না এটা।

১১ নভেম্বর মন্ত্রিসভা আবার বৈঠক করল আবার যেভাবে মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র জমা নেয়া হলো তাও স্বাভাবিক নয়। অন্তত এমন ঘটনা ইতোপূর্বে আর ঘটেনি। কারণ পদত্যাগের প্রক্রিয়া নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করলেই করা মাত্র তা কার্যকর হবে এমনটাই বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে ভিন্ন পরিস্থিতি দেখছি, মন্ত্রীরা পদত্যাগও করলেন আবার স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়েও যাচ্ছেন। এ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির অস্বাভাবিক সরকার।

স্বাভাবিক ভাবে যে সবকিছু চলছে তা তো বলছে না নির্বাচন কমিশনও। সচল সংসদেও প্রাণচাঞ্চল্য নেই এবং অস্বাভাবিকভাবে কাটল বিরোধী দলের ৮৪ ঘন্টার হরতাল কর্মসূচিও। আর অস্বাভাবিকের অস্বাভাবিক হলো এখন গণতন্ত্রটাই।

তবে কথাবার্তার অস্বাভাবিকতা আরও বেশি আর কর্মের অস্বাভাবিকতা মানুষকে গুজব তৈরিতে প্ররোচিত করছে। সংলাপ এখন যেন একটা আপ্তবাক্য। সবাই বলছেন, ক্ষমতাসীনরা বলছেন সংলাপের দ্বার খোলা, বিরোধী দল বলছে সংলাপে রাজি, বিদেশিরা বলছে, সংলাপ দেখতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংলাপে কে যায়? অন্ধকার কি আলোর দিকে যাচ্ছে? যদি যায় তাহলে আলোর রেখা দেখা যাবে অচিরেই। কিন্তু সংলাপ শব্দটির আগে ওই অস্বাভাবিক শব্দটাকে গুরুত্ব দিলে বোঝা যাবে আলো যেটুকু ছিল তাও যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে।

অর্থাৎ মাত্র সন্ধ্যা হলো, এবার ঘোর কালো অমাবস্যার রাত আসছে। আর সেই রাতে নিশাচরদের দখলে চলে যাবে এই দেশ। ভয় দেখিয়ে সংলাপ কিংবা জিম্মি করে সংলাপ। পুলিশর‌্যাবের অস্ত্র উচানো রাস্তার মোড় দখল, দুর্বৃত্তদের বোমাবাজিজ্বালাও পোড়াও সবই কপটতার নামান্তর বইতো নয়।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, মানুষের এ কষ্ট দেখে নাকি তার প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কতোটা কষ্ট দেখলে তার ইচ্ছাকে তিনি বাস্তবে রূপ দেবেন? এক কথা শুনে মনে পড়ে বব ডিলানের গান, যার অনুবাদ করে গিয়েছেন কবির সুমন। তাতে বলা হয়েছে – ‘কত হাজার মরলে তবে বলবে তুমি শেষে/অনেক বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে।’ আরও কথা আছে ওই গানেই – ‘কতোটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়।’

হ্যাঁ জীবনের অপচয় হয়তো এদেশের মানুষ এখনো শেষ করতে পারেনি সে কারণে তারা মানুষ চিনতে পারেনি। ধীরলয়ের পেন্ডুলামের মতো তারা দুলে চলেছে। দুদিক দিয়েই হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত।

অস্বাভাবিক এক নির্বাচনের দিকে যাত্রা করেছে সরকার কিংবা আরও পরিষ্কার করে বলা যায় খোদ প্রধানমন্ত্রীই যদি এখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সাংবিধানিক ভাবেই এটা হয়েছে ২৭ অক্টোবরের পর। আর সব ব্যক্তি ও পদ এখন মূল্যহীন। শেখ হাসিনা সরকারের সর্বেসর্বা, তিনিই প্রধানমন্ত্রী, তিনিই সংসদ নেত্রী, তিনি আওয়ামী লীগ প্রধান। তিনিই একচ্ছত্রভাবে সংবিধানের রক্ষক আর তিনি বলছেন সংবিধান রক্ষা করছে তাকে সংবিধানই ক্ষমতা দিয়েছে তাকে। তাহলে এটা কি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সরকার?

এখন আরও প্রশ্ন উঠছে ক্ষমতাবান তিনি হয়েছেন কিন্তু সেই ক্ষমতাকে কি ধারন করতে পারছেন? বির্মূত মনে হতে পারে প্রশ্নটা। কিন্তু গণতন্ত্রের ঊষালগ্নে প্রাচীন রোমে মহামতি সেনেকা (যিনি সম্রাট হয়েও গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা দিয়েছিলেন জনগণ এবং তার বিরোধীদের) বলেছিলেন, ক্ষমতাবানের ক্ষমতা ধারণ করার কথা।

বাংলাদেশে সর্বময় ক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রীর এখন যে ক্ষমতাটা ধারণ করতে হবে তা হলো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করা। নির্বাচনের ফল কি হবে তা তিনি অতীতের তুলনামূলক বিচার করে বার বার বলছেন। কিন্তু তার আগেই যে ক্ষমতাটা নিয়ে তিনি নির্বাচনের দিকে চলেছেন সেই ক্ষমতাটাকে কি জানুয়ারি পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবেন? কিংবা আরও সুস্পষ্টভাবে বলা যায় এই মেয়াদোর্ত্তীণ অস্বাভাবিক ক্ষমতা কি গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারবে?

বিরোধী দলের আন্দোলনের জন্য এই প্রশ্ন বা সন্দেহ নয়। সন্দেহ হচ্ছে অন্যান্য ফ্যাক্টরের কারণে। যার প্রধানটি হলো জনগণ। উন্নয়নের জোয়ারে তিতিবিরক্ত জনগণ কপটতার কারণেই আস্থা বা বিশ্বাস কোনটাই রাখতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রীর আবেগ তাদেরকে স্পর্শ করতে পারছে না। কারণ জঘন্য অতীতের পা কাদা ঘেটে তিনি না পারছেন জনসাধারণের মধ্যে বিরোধীদের প্রতি ঘৃণার সঞ্চার করতে, না পারছেন তার প্রতি সহানুভূতি আদায় করতে। তিনি সাংবিধানিক যথানিয়মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বললে মানুষ বুঝছে ওটা নিছক তারই তৈরি করা নিয়ম এবং তা কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কাজেই তিনি যে ‘নির্বাচন হওয়াবেন’ এটা তাদের কাছে পরিষ্কার। কিন্তু কোন ক্ষমতায় হওয়াবেন সেটাই রহস্যাবৃত্ত। প্রশাসনিক ক্ষমতা, শৃঙ্খলাবাহিনীর ক্ষমতায় ভোটারবিহীন ব্যালট বাক্স ভরার নির্বাচন এদেশের মানুষ আগেও দেখেছে, মনেও রেখেছে। কাজেই সে রকম কিছু ঘটার ব্যাপারে তারা সবাই সন্দিহান। সত্যটা এই যে, একেকটা করে নির্বাচনী পদক্ষেপ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী আর এগোচ্ছেন অগণতান্ত্রিক অন্ধকারের দিকে। ঘোর কালোর মধ্যে গিয়ে না পড়া পর্যন্ত হয়তো ক্ষান্ত দেবেন না তিনি। মাত্রাহীন জানমালের অপচয় করিয়েই ছাড়বেন। ডেট এক্সপায়ার্ড ওষুধ খেলে যেমন মানুষ মরে তেমনি ডেট এক্সপায়ার্ড সরকারের কারণেও মানুষ মরবে। আরও মরবে…।।