Home » রাজনীতি » প্রিপেইড সতর্কতা না উস্কানি

প্রিপেইড সতর্কতা না উস্কানি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

durbinচলে এসেছে আরো ভয়ের দিন। ঈদের আগে থেকে যে ভয়ে ছিল সাধারণ মানুষ সেই ভয়ের বা ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যেই তারা এখন বসবাস শুরু করেছে। চাপা গুমোট অবস্থাও কেটে গেছে তবে সুন্দর সকাল আসেনি। প্রকৃতিতে হেমন্ত থাকলেও রাজনীতিতে খরতাপ ভয়ঙ্কর ঝড়ো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আর তার ঝাপটার মধ্যে পড়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষ। এই ছাপোষা মানুষদের সঙ্গে সঙ্গে সরকারও যে ভয় পেয়েছে তাও বোঝা যাচ্ছে গণগ্রেফতার শুরু করায়।

নভেম্বরের প্রথম দু’সপ্তাহে ৬০ দিন করে হরতাল ডেকেছিল বিরোধী জোট। এই একশ বিশ ঘন্টার হরতাল দিয়েও ব্যাকফুটেই ছিল বিরোধী দল। কারণ হরতাল ডেকে বিএনপি নেতারা রাজপথে নামেননি। এই বিষয়টা জনসাধারণকে বিস্মিত করেছিল, কেউ কেউ হাস্যরসের খোরাকও পেয়েছিলেন ওতে। আর ক্ষুব্ধ ছিল বিএনপির সমর্থকরা খোদ বিএনপি চেয়ারপার্সনও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এরপর গত শুক্রবার ৭২ ঘন্টা হরতাল ডাকার পর পরই শুরু হলো গণগ্রেফতার। বিএনপির নেতাউপনেতাদের অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তল্লাশি চালানো হয়েছে সংসদ সদস্যসহ অনেক নেতার বাড়িতেও। আর তাতেই রাজধানী ছাড়া শনিবার থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়ে গেছে হরতাল। এসব হরতালে ঢিলেঢালাভাব নেই। আগের দুই দফা ৬০ ঘন্টা হরতালের যে ম্রিয়মাণ অবস্থা ছিল সেটার বদলে ক্রোধমত্ততা প্রকাশ পাচ্ছে বিরোধী নেতাকর্মীদের আচরণে।

তাহলে হলোটা কি? ওপর ওপর মনে হচ্ছে ৭২ ঘন্টা হরতাল ডাকার পর সরকার একটা অন্য রকম সিগন্যাল পেয়েছে। নাকি এটাকে বলা হবে ‘প্রিপেইড সতর্কতা।’ এদেশে অনেক কিছুই প্রিপেইড হয় সেলফোনে প্রিপেইড আছে, নানা রকম বিলের ক্ষেত্রে প্রিপেইড ব্যবস্থা আছে, আগাম জামিনের ব্যবস্থাও আছে। এখন সরকারও ওরকম কিছু করে ফেললো নাকি রাজনৈতিক ঝামেলা এড়াতে। নাকি কৌশল ঠিক করতে না পেরে ফিরে গেল স্বৈরাচারীদের পন্থায়। বাংলাদেশের মানুষ পাল্টাপাল্টি স্বৈরাচার কম দেখেনি তাদের প্রধান অস্ত্রই ছিল গ্রেফতার, জেলজুলুম, হয়রানি আর আতঙ্ক সৃষ্টি করা। তারা জানতো ওই আতঙ্কিত জনগণ সমর্থন করে না তাদের তাই অস্ত্রের জোর দেখিয়েই ক্ষমতা ঠেকিয়ে রাখতো, আর একটা খুটি ছিল বিদেশি প্রভুদের সমর্থন। দেশের মানুষের চেয়ে কোন কোন সময় ওটাকেই মূল্য দিত বেশি। কিন্তু মাঝে মাঝে তাতেও বিপত্তি ঘটতো। আর ওদিকের বিপত্তি ঠেকা দিতেই পুলিশি শক্তি নিয়ে নিজের দেশের জনতার ওপর হামলা করতো।

অতীতের এসব ব্যাপার জনগণ কম বেশি জানে। কিন্তু বর্তমানের ব্যাপারটা এখনো অনেকটাই রহস্যাবৃত্ত। কেন একটা নির্বাচিত সরকার পুলিশ নির্ভর হয়ে উঠবে সেটাও তাদের কাছে এক মহা রহস্য ছিল এতদিন। তবে সে রহস্যের জট মনে হয় খুলে গেছে। বোঝা যাচ্ছে, মাঠ বা রাজপথের তথ্যের চেয়ে এখন অনেক বেশি ‘গোপন গোয়েন্দা তথ্য’ নিয়ে কাজ করছে সরকার। আর সেই তথ্যের মধ্যে সত্য, অসত্যকর্তাভজন তথ্য সবই আছে। কিন্তু সবই তারা বিশ্বাস করছে। শুক্রবার গণগ্রেফতার শুরুর পরপরই একমন্ত্রী আরেক প্রতিমন্ত্রীর বিবৃতি পাওয়া গেছে যাতে তারা বলেছেন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই বিরোধী দলের নেতাদের আটক করা হয়েছে। হ্যাঁ সন্দেহ নেই এই অভিযোগ করেছে কর্তাভজন পুলিশের গোয়েন্দারা। যারা স্বৈরাচারকেও একই রকম তথ্য দিত। আর স্বৈরাচার তাতে বিশ্বাস করে অ্যাকশনেও যেতো।

প্রশ্ন হচ্ছে, পার্থক্যটা তাহলে রইলো কোথায়? মানদন্ডটা কি স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের? অবশ্যই এখন এই প্রজন্মের মানুষ এই মানদন্ডটা বুঝতে চাইবে। সরকার পক্ষ থেকে ওই ঢালাও – ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ বলাটাই মানসম্মত নয়। ওই সুনির্দিষ্ট বিষয়টা খোলাসা করতে হবে সংসদীয় ভাবেই। অধিকন্তু যেখানে সংসদ সচল আছে সেখানে বিষয়টা অন্যত্র নয় সংসদেই খোলাসা করে বলতে হবে তা বিরোধী দল সংসদে যাক আর না যাক। সেই অভ্যাসেও নেই বা আসছে না সরকার। সংসদ সদস্যদের দিয়েই শুরু করেছে তারা এবং তাও কতটা সংসদীয়সাংবিধানিক নিয়ম মেনে সে প্রশ্নও আছে। কারণ সরকারপক্ষীয় এক নেতা বলেছেন, ‘বিরোধী দলের নেতাদের মতামত জানতেই সংসদ অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।’ এখন যারা মতামত দেবেন তাদেরই ধরে ফেললে মতামত দেবেন কারা? প্রশ্ন আছে, সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা ভুলে যাওয়া নিয়েও যেখানে বলা হয়েছিল ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করা’র কথা। স্বভাবতই এ ধরনের বিষয় যারা প্রস্তাবনায় আনেন তাদেরই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত। কিন্তু সে পথে কি সরকার হেটেছে? এক্ষেত্রে সংসদে আসার জন্য বার বার আহ্বান, প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন করা ইত্যাদির উদাহরণ তুলে ধরা হতে পারে। কিন্তু এক দেশদর্শীভাবে না দেখে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি প্রতিদিনের দোষারোপ আর ভাষণের নামে প্রচারণার বিষয়গুলোও হিসাবে আনতে হবে। ওতেই যে আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে।

এখন আসলে বুঝতে হবে আকাশে নয় বাতাসে নয় মাটিতে কি হলো? নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিরোধী দল ৭২ ঘণ্টা হরতাল ডাকার আগে দেশিবিদেশি যে পক্ষগুলোর সঙ্গে দু’দলের শীর্ষ নেতাদের আলোচনা হয়েছে তার ফলাফল কি?

ফলাফল এই যে সাধারণ মানুষের ভয় সরকারের মধ্যেও ছড়িয়েছে। আর তাই যে হরতাল হচ্ছিল সাদামাটা তা বেগবান করতে অনুঘটক হিসেবেই কাজ করলো সরকার। আর পক্ষটা নিল স্বৈরাচারের।

এছাড়া মনে রাখা দরকার গত ৭ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশে ভিডিওতে রেকর্ডকৃত বক্তব্যে বিরোধী দলীয় নেত্রী ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ ভাবে কর্মসূচি পালন করতে এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানি প্রতিরোধ করতে। এর বিপরীতেই এই গণগ্রেফতারের মাধ্যমে উস্কানি দেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। স্বভাবতই এখন বিরোধী দল মারমুখী হলে বর্হিবিশ্বে তাদেরকে দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী বা জঙ্গিবাদী হিসাবে প্রমাণ করতে প্রতিপক্ষের সুবিধা হবে।।