Home » অর্থনীতি » ফুকুশিমা : নজিরবিহীন বৈশ্বিক হুমকি – প্রথম পর্ব

ফুকুশিমা : নজিরবিহীন বৈশ্বিক হুমকি – প্রথম পর্ব

কেভিন জেসি এবং মার্গারেট ফ্লাওয়ার্স

সূত্র: জেড নেট

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

fukoshimaবিজ্ঞানীরা সব ধরনের গোপনীয়তা পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই সব তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। ৯ ও ১০ নভেম্বর ফুকুশিমা দিবস ঘোষণা করার কথাও বলেছেন।

প্রথমে যতটুকু আশঙ্কা করা হচ্ছিল, বর্তমানে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্ট থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি তেজষ্ক্রিয় নির্গত হচ্ছে। আর এই বিপদ কেবল জাপানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সাগরের পানির মাধ্যমে কল্পনাতীত বিপদ সৃষ্টি করছে।

প্রায় আড়াই বছর আগে তথা ২০১১ সালের ১১ মার্চ ভূমিকম্প এবং এর জের ধরে সৃষ্ট সুনামি আঘাত হানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে। প্রথমে মনে হয়েছিল, খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, বিপদের প্রকৃতি ততই ভয়ঙ্করভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এ কারণে অনেকেই বলছেন, ফুকুশিমা ঘটনাটি প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রথম পৃষ্ঠার খবর হওয়া উচিত। অথচ এর উল্লেখ বিরল। ফুকুশিমা সমস্যা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন। মানুষ কোনোকালেই তেজষ্ক্রিয়ার এত ঝুঁকির মধ্যে পড়েনি। এই সমস্যা সমাধানে এবং পৃথিবীকে বিপদমুক্ত করার জন্য বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের সাহায্য প্রয়োজন।

পারমাণবিক প্রকৌশলী আরনি গান্ডারসেন এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল ফুকুশিমা সঙ্কট উত্তরণে ১৫ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছেন। বিজ্ঞানীরা সব ধরনের গোপনীয়তা পরিহার করারও আহ্বান জানিয়েছেন। তারা কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই সব তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তারা ৯ ও ১০ নভেম্বর ফুকুশিমা দিবস ঘোষণা করার কথাও বলেছেন। তারা ১১ নভেম্বর জাতিসংঘে একটি চিঠি ও একটি আবেদন পেশ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। ওই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য হলো সেদিন নিরস্ত্রিকরণ দিবস এবং একইসঙ্গে ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্যোগ সৃষ্টিকারী ভূমিকম্প ও সুনামির ৩২তম মাস পূর্ণকারী দিবস।

ফুকুশিমা সমস্যা

ফুকুশিমার প্রধান সমস্যা তিনটি : ) তিনটি জ্বালানি চুল্লির মূল অংশ পাওয়া না যাওয়া; ) প্লান্টটি থেকে আড়াই বছর ধরে তেজষ্ক্রিয় পানি চুইয়ে পড়া; এবং ৩) ১১ হাজার ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রড, সম্ভবত মানুষের সৃষ্ট সবচেয়ে বিপজ্জনক বস্তু, প্লান্টটিতে মজুত রয়েছে এবং সেগুলো অপসারণ করতে হবে। এসব রডের এক হাজার ৫৩৩টি খুবই নিরাপত্তাহীন ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এই তিনটি সমস্যার যেকোনো একটি ব্যাপক মাত্রায় তেজষ্ক্রিয় নির্গমন ঘটাতে পারে। আর এই তেজষ্ক্রিয় মাত্রাটি এত বেশি হতে পারে, যার নজির মানব ইতিহাসে নেই। এসব থেকে কেমন বিপদ আসতে পারে, তা এখানে উল্লেখ করা হলো

জ্বালানি চুল্লির মূল অংশ পাওয়া না যাওয়া : ২০১১ সালের ১১ মার্চ ফুকুশিমায় দুর্ঘটনার পর থেকে তিনটি চুল্লির মূল অংশ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনটি চুল্লির গলে যাওয়ার নজিরও নেই। আশঙ্কা করা হচ্ছে, করিয়াম লাভা নামে পরিচিত এসব চুল্লি ১, ২ ও ৩ নম্বর ভবনের বেজমেন্ট দিয়ে কোনো না কোনোভাবে মাটির নিচে চলে গেছে।

পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে ৪০ বছর ধরে গবেষণায় নিয়োজিত হারভে ওয়াসারম্যান জানিয়েছেন, গত চার দশকে কেউই পারমাণবিক চুল্লির বহুমাত্রিকভাবে গলে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলেনি। অথচ সেটাই ঘটেছে ফুকুশিমায়।

চুল্লিগুলোর অবস্থান না জানতে পারা হতাশাজনক বিষয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্ব আগে কখনো পড়েনি। চুল্লিগুলোর সম্ভাব্য অবস্থানে স্থাপনাটির তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত কোম্পানি টেপকো পানি ঢালছে। তবে তারা নিশ্চিত নয়, যেখানে পানি ঢালা হচ্ছে, সেখানেই চুল্লিগুলো রয়েছে। মাঝে মাঝে মাটির নিচ থেকে গরম পানির স্রোত বের হয়। এতে বোঝা যায়, চুল্লিগুলো এখনো তপ্ত রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো করিয়াম লাভাগুলো হয় প্লান্টের নিচে উন্মুক্ত সাগরে মিশে গেছে বা মিশতে যাচ্ছে। সাগরে যাওয়া মানে বিশাল এলাকায় তেজষ্ক্রিয় উপাদান ছড়িয়ে পড়া। অনেকে বলছেন, সেক্ষেত্রে জাপানের রাজধানী টোকিও’র চারপাশের এলাকায় বসবাসরত ৪০ মিলিয়ন লোককে সরিয়ে নিতে হবে। কোরিয়াম লাভা সাগরে পড়লে ‘হাইড্রোভলকানিক’ বিস্ফোরণের মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। এ নিয়েও অনেকে বিষম উদ্বিগ্ন।

আরেকটি আশঙ্কার বিষয় হলো, করিয়াম লাভার সংস্পর্শে আসা ভূগর্ভস্থ পানির বিপুল মজুত মাসে চার মিটার করে মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে করে দুর্যোগের প্রথম দিকে যে পরিমাণ তেজষ্ক্রিয় নির্গত হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি নির্গমন ঘটতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরে তেজষ্ক্রিয় পানি চুইয়ে পড়া : চলতি বছরের জুলাই মাসে অবশেষে টেপকো স্বীকার করেছে যে, তেজষ্ক্রিয় পানি চুইয়ে পড়ছে। জুলাই মাসে জাপানের পারমাণবিক পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রধান শুনিচি তানাকা সাংবাদিকদের বলেন, প্রায় আড়াই বছর আগে সংঘটিত দুর্যোগের সময় থেকেই তেজষ্ক্রিয় প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ছে। ফরাসি ‘ইনস্টিটিউট ফর রেডিওলজিক্যাল প্রটেকশন অ্যান্ড নিউক্লিয়ার সেফটি’ জানিয়েছে, সমুদ্রে এটাই পারমাণবিক তেজষ্ক্রিয় নিঃসরনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। এরপর সেপ্টেম্বরে জাপান সরকার স্বীকার করে যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। অথচ আড়াই বছর আগে দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকেই যে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, তা বলা হয়নি।

মহাসাগরে কতটুকু তেজষ্ক্রিয় পানি চুইয়ে পড়েছে? এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন ৩০০ টন (৭১,৮৯৫ টন/২৭২,১৫২ লিটার) দূষিত পানি মহাসাগরে প্রবাহিত হচ্ছে। ফুকুশিমা থেকে এই দূষিত পানি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে তিন বছর লাগার কথা। ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস এই তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, ২০১৪ সালের প্রথম দিকেই যুক্তরাষ্ট্র এই তেজষ্ক্রিয় পানির অভিজ্ঞতা লাভ করবে।

ফুকুশিমা বিপর্যয়ের এক মাস পর এফডিএ ঘোষণা করে, তারা প্রশান্ত মহাসাগরে তেজষ্ক্রিয়তা নিরূপনের জন্য মাছ পরীক্ষা বন্ধ করে দিচ্ছে। অথচ নিরপেক্ষ গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়ার পানিতে শিকার করা নীলডানাযুক্ত টুনা মাছে ফুকুশিমার তেজষ্ক্রিয়তা রয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী সমুদ্র প্রতিবেশবিদ ড্যানিয়েল ম্যাডিগানের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রতিটি টুনা মাছেই তেজষ্ক্রিয় উপাদান দেখা গেছে।

ফুকুশিমার কাছে ধরা মাছেও উচ্চ মাত্রায় তেজষ্ক্রিয় আইসোটপ সিজিয়াম১৩৪ পাওয়া গেছে বলে ‘সায়েন্স’ জানিয়েছে। এসব মাছে পাওয়া তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা হ্রাস পায়নি। এতে প্রমাণিত হয়, তেজষ্ক্রিয়দূষিত পানি মহাসাগরে চুইয়ে পড়া অব্যাহত রয়েছে। পারমাণবিক প্লান্টটির আশপাশের অন্তত ৪২টি প্রজাতির মাছ অনিরাপদ বিবেচিত হচ্ছে। তেজষ্ক্রিয় চুইয়ে পড়ার কারণেই দক্ষিণ কোরিয়ায় জাপানি মাছ নিষিদ্ধ রয়েছে। আতঙ্কের বিষয় হলো সিজিয়াম ১৩৪এর অর্ধেক জীবন (এর অর্ধেক উপাদান নষ্ট হতে সময় লাগে) .০৬৫২ বছর। সিজিয়াম ১৩৭এর অর্ধেক জীবন ৩০.১৭ বছর। সিজিয়াম কোনো সময়েই মহাসাগরের মেঝেতে ডুবে যায় না। ফলে মাছকে এর সংস্পর্শে আসতেই হয়।

মানুষের জন্য সিজিয়াম অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি উপাদান। সিজিয়াম উপাদানের সংস্পর্শে এলে মানুষের কোষে ক্ষতি করতে পারে। এতে করে বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, ডায়রিয়া, রক্তপাত হতে পারে। দীর্ঘ সময় সিজিয়ামের সংস্পর্শে থাকলে মানুষ জ্ঞান হারাতেও পারে। এতে মৃত্যুও হতে পারে।।

(চলবে…)