Home » রাজনীতি » বিরোধী দল কী সরকারের শক্তি কেন্দ্রে আঘাত হানতে পেরেছে?

বিরোধী দল কী সরকারের শক্তি কেন্দ্রে আঘাত হানতে পেরেছে?

আবীর হাসান

mirza-fakhrul-2জনগণের উদ্বেগ রয়ে যাচ্ছে উপেক্ষিত। দুর্ভোগে পতিত এক জনগোষ্ঠী এখন অপেক্ষা করছে অন্তবর্তী সরকারের কথা কিংবা নির্বাচনকালীন সরকারের কথা। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানার লক্ষণ নেই ক্ষমতাসীনদের। ওইটা যেন না আসে এবং আরও দূরবর্তী ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি এক সূত্রে গেঁথে একটা অনঢ় রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি করেছে সরকার। এখন জনগণের শক্তির চেয়ে পুলিশি শক্তিই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এর কারণ হয়তো এটাই যে, এই পুলিশ চালানোর ক্ষমতাটা সরকারের এখন পর্যন্ত আছে। আর এই শক্তির বলেই হাঁসের পালকের জলবিন্দুর মতো সমস্ত বিরোধিতাসমালোচনাকে অবলীলায় ঝেড়ে ফেলতে পারছে। কিংবা আরও সহজভাবে কচু পাতায় পানিও বলতে পারেন। সংলাপ হলো না, হচ্ছেও না। এখন নতুন শর্তারোপ হয়েছে হরতাল প্রত্যাহার, তারপর সংলাপ। সংলাপের জন্য খোলামেলা পরিবেশ আছে বা তৈরি করা হয়েছে এমনটা নয়। গত ৩ নভেম্বরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতারা যে ভাষায় নতুন বক্তব্য তুলে ধরেছেন তাতে করে তারা যে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখা ছাড়া অন্য কোনো পক্ষই মানবেন না, তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখানে আরেকটি কথা বলা দরকার, সমাবেশ করার ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীনরা নিদারুণভাবে পক্ষপাত এবং স্বার্থপরতা দেখিয়েছে। বিএনপি এর আগে সমাবেশ করতে চাইলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং শেষমেশ মাত্র পাঁচটি মাইক ব্যবহারের শর্তসহ নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছিল পুলিশ, আওয়ামী লীগের সমাবেশের ক্ষেত্রে হয়েছে তার ঠিক উল্টোটি। সেখানে মাইক ব্যবহারের উপরে বাধা তো দূরে থাক, সমাবেশ সফল করার জন্য পুলিশসহ পুরো প্রশাসন সমাবেশটি সফল করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার চেষ্টায় কোনো কসুর করেনি।

কাজেই এখন আর সংলাপ হলে কি হবে তা নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। বরং ভাবা উচিত, সংলাপ না হলে কি হবে। অনেকে পুরনো পন্থাতেই ভাবছেন এবং আশায় আছেন আর একটি ওয়ান ইলেভেনের জন্য। এ বড় সরস ও সুবিধাবাদী চিন্তা। কারণ এমন আশা যারা করেন তারা নিজেদের সুবিধার দিকটাই চিন্তা করেন। পারিপার্শ্বিকতা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ভাবেন না ভাবেন না ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টি নিয়ে। নৈর্ব্যক্তিক ভাবে যদি দেখেন, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হবে না যে সরকারের ক্ষমতার খুঁটিটা এখন পর্যন্ত শক্ত আছে বলে তাদের ধারণা তা যেভাবেই হোক। কিন্তু বিরোধী দল আলগা করে বা উপড়ে ফেলতে পারেনি। এক্ষেত্রে মনে পড়ছে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী নেতা ম্যালকম এক্সের একটি উক্তি। তিনি বলেছিলেন, ‘নিজের চেয়ে বড় ক্ষমতাকে দেখা ছাড়া ক্ষমতা কখনো পিছু হটে না।’ কৃষ্ণাঙ্গদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার জন্য লড়তে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এ উক্তি করেছিলেন ম্যালকম এক্স।

বাংলাদেশে বিরোধী দল এখন আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে মধ্যম পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে হরতালের তীব্রতাই কেবল বাড়াতে পেরেছে তারা। সরকার যে ক্ষমতার জোরে ‘সংশোধিত সংবিধান’ সম্মত নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা তাদের গেলাতে চাচ্ছে, তার চেয়ে বড় ক্ষমতা তারা দেখাতে পারেনি। ওই বড় ক্ষমতার প্রতিযোগিতাই আসলে এখন চলছে। এক্ষেত্রে বহু ব্যবহৃত অস্ত্র হরতাল যে তেমন একটা যুৎসই বিষয় নয় তা এখন অনেকটাই নিশ্চিত। হ্যাঁ নিশ্চয় হরতালে অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। শিশুকিশোরদের লেখা পড়ার ক্ষতি হচ্ছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের ক্ষমতার যে কেন্দ্র সেখানে কোন বত্যয়বিচ্যুতি কি ঘটছে? আন্তর্জাতিক সমর্থক পরিমণ্ডল উদ্বিগ্ন বটে কিন্তু তাদের ধৈর্য্যচ্যুতি তো সেভাবে এখনো পর্যন্ত ঘটেনি। আর তাই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি নির্দেশনায় পুলিশ খুব কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছে। আর সেটাই গণরোষের তীব্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দিচ্ছে না। রাজপথের গণরোষ ক্ষমতাকে টলাতে পারে এ কথা সত্য তবে সব সময় একই রকম হবে বা হতেই হবে তা সত্য নয়। বাংলাদেশে এখন পরের ব্যাপারটাই সম্ভবত ঘটছে। সমর্থক এবং ভোট ব্যাংক বাড়লেও আন্দোলনে সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারেনি বিরোধী দল এবং পাশাপাশি সরকারের শক্তি কেন্দ্রেও আঘাত হানতে পারেনি। অন্যদিকে সরকারের দিক থেকেও নেই কোন সহজ গণতান্ত্রিক উদ্যোগ। ফলে জনসাধারণ উদ্বিগ্ন এবং দুর্ভোগেও পতিত। তারা অবচেতনে সেই কথাটাই বলছে যা ব্রিটিশ লেখক ও সমালোচক উইলিয়াম হ্যাজলিট লিখেছিলেন, ক্ষমতার জন্য ভালোবাসা কার্যত নিজের জন্যই ভালোবাসা।’

জনসাধারণ এখন বুঝতে পারছে দেশে এখন যে দুঃসহ অবস্থা চলছে তা সরকার পক্ষের ক্ষমতার জন্য ভালোবাসার কারণেই। এখানে সবার জন্য ভালোবাসা অর্থাৎ জনগণের জন্য ভালোবাসা নেই। জনগণের জন্য ভালোবাসা থাকলে বিরোধী দলকে দমানোর অজুহাতে সরকার একের পর এক গণবিরোধী কালাকানুন করতো না কিংবা পুলিশি তাণ্ডবও চালাতো না।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতার জন্য ক্ষমতার ধারাবাহিকতা আর তার আগে অনির্বাচিত সরকারের না পছন্দের যে ফর্মূলা, সেটা ক্ষমতাসীনদের নিজেদের একচ্ছত্র ক্ষমতার জন্যই। ক্ষমতাসীনরা নিজেদেরই ভালোবাসেন, অন্য কাউকে নয়।

অতি আশাবাদীরা এখনো সংলাপ নিয়ে ভাবছেন এবং এও আশা করছেন যে, দুই নেতা বসলে নতুন কোনো ফর্মূলা বের হবে। ৩ নভেম্বরের পর এও কি সম্ভব এবং বিশ্বাসযোগ্য? নতুন ফর্মূলা যদি তাদের মাথায় আসতো তাহলে তো এ রকম অনঢ় অবস্থান কেউ নিতেন না। মেধামান কাজে লাগানোর অবস্থায় কি তারা আছেন? ক্ষমতাটা নিজের জন্য এটাই সত্য। আরও সত্য এই যে বর্তমানে ভোগ করা ক্ষমতার চেয়ে বড় ক্ষমতাও তারা দেখতে পাচ্ছেন না।।