Home » প্রচ্ছদ কথা » ভারতের মনোভাবে কি কোনো পরিবর্তন আসছে?

ভারতের মনোভাবে কি কোনো পরিবর্তন আসছে?

আমীর খসরু

india-1অনেক আগেই তামাম দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বললেও অবশেষে সেই কথাটিই বলেছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ১১ নভেম্বর এক বিবৃতিতে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন বাংলাদেশে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সমর্থন করে ভারত। নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাংলাদেশীদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশে মতপার্থক্য দূর করার উত্তম পন্থা হলো সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে। এতে বাংলাদেশের লক্ষ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে অবদান রাখবে।

ভারতের এই বিবৃতির পরে অনেকের মনেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যে, তাহলে কি বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থানের সত্যিকার পরিবর্তন এসেছে বা আসার আলামত দেখা যাচ্ছে না, এটা শুধুমাত্র কথার কথা। এর আগে পর পর দু’সপ্তাহ ‘আমাদের বুধবার’এ বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমী দুনিয়া ও চীনের সঙ্গে তাদের মতভিন্নতার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা এখন নিজ দেশে অবস্থান করছেন। দিল্লি সফর শেষেই তিনি নিজ দেশে যান। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে এক অনুষ্ঠানে তিনি আবারও বলেছেন, বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অভিন্ন। এই মনোভাব এবং বক্তব্য যখন তিনি তার দিল্লি সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে উত্থাপন করেছিলেন, তখন দিল্লি ওই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। ভারতের সংবাদ মাধ্যম সূত্রে তখন জানা গিয়েছিল যে, ভারত বলেছিল বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান কোনোক্রমেই এক নয়, ভারতের অবস্থান ভিন্ন। কেন ভিন্ন তারও একটি ব্যাখ্যা তখন দেয়া হয়েছিল। দিল্লি তখন বলেছিল, ভারত মনে করে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ দমন, মৌলবাদী শক্তির উত্থান রোধ বিশেষ করে উত্তরপূর্বাঞ্চলের দিল্লি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে দমনে ভারতকে যেভাবে সাহায্যসহযোগিতা করেছে, তা বাংলাদেশে অতীতের কোনো সরকার করেনি। ভারত স্পষ্টভাবে মনে করে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে উন্নতি গত কয়েক বছরে হয়েছে, তারা তা অব্যাহত থাকুক তাই চায়। ভারত মনে করে, এই উপমহাদেশের সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে হৃদ্যতামূলক সম্পর্ক অব্যাহত থাকাটা জরুরি। ভারত কখনই এটা চায় না যে, বাংলাদেশ কোনো ভাবেই ভারত বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হোক বা এই ভূখণ্ডটি ভারত বিরোধী কর্মকাণ্ডে সহায়ক হোক। তারা এও মনে করে, বর্তমান সরকার বা এ ধরনের একটি সরকার না থাকলে ভারত বিরোধী শক্তি, জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদী কর্মকাণ্ড মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক এবং জামায়াতের সাম্প্রতিক সহিংস কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারত খুবই উদ্বিগ্ন। দিল্লি মনে করে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে মনোভাব তা ওই দলটিকে এবং পক্ষকে প্রকারান্তরে সহায়তা করছে। নিরাপত্তা কৌশলগত দিক দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চায়। এক্ষেত্রে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা কৌশলগত বিষয়টিকে তারা বেশ বড়ভাবেই গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনকে মাথায় রেখেই ভারত অরুনাচলসহ ওই অঞ্চলে সৈন্য শক্তি আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগর বিশেষ করে এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের উপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে চট্টগ্রামে প্রস্তাবিত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরটি ভূরাজনৈতিক, নিরাপত্তা কৌশলগত দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূণ। ভারত এই বন্দরের মাধ্যমে ওই দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন তো চায়। এই হচ্ছে বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান।

দিল্লি বৈঠকের সপ্তাহ খানেকের মাথায় এসে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্দে পেট্রাপোলে এক অনুষ্ঠানে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ভারতকে যে সমর্থনসহযোগিতা দিয়েছে তার উচ্চসিত প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভারতের আপনজন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এছাড়াও দিল্লিতে গত ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের উপরে এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় যাতে বাংলাদেশে প্রাক্তন কয়েকজন ভারতীয় হাইকমিশনার তাদের অভিমত তুলে ধরেন। ওই আলোচনায় বলা হয়, অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে ভারতের বিশালত্বকে সুবিধাজনক দৃষ্টিতে দেখার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ধর্মীয় মৌলবাদের মোকাবেলাও করতে হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হলে এ অঞ্চল অশান্ত হবে।

অন্যদিকে, ভারতেই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই ৮ নভেম্বর এক খবরে বলেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে ভারতের উদ্বেগ থাকায় দেশটির সঙ্গে দূরত্ব ঘোচাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উদ্যোগ নিয়েছেন। পিটিআই ভারতের প্রভাবশালী ইকনোমিক টাইমসএর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ওবামার ওই নির্দেশের পরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের দূরত্ব ঘোচানোর প্রয়াস ইতোমধ্যে চালিয়েছেন। পিটিআই আরো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে জানিয়েছে, বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন তারা চায়। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তারা মাথা ঘামাতে চায় না। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনটি যাতে গ্রহণযোগ্য হয় তা যুক্তরাষ্ট্র কামনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে পিটিআই বলছে, আমরা বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের বিপক্ষে।

বাংলাদেশ প্রশ্নে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই নয়, পশ্চিমী দুনিয়ার দেশগুলো, চীন সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। কিন্তু ভারতের অবস্থানে কিছু ভিন্নতা আছে। তবে ভারতের বিবৃতিটির পরে নানা আলোচনা চলছে যে, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকার পরিবর্তন এসেছে বা আসছে কিনা?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় ভারত সামগ্রিক বিষয়টিকে ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, মন্দির ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের পুলিশ ধরছে না। কিন্তু ওই এলাকারই এমপি এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আশপাশে পুলিশ পাহারায় তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে যা সমগ্র সংখ্যালঘুদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সিপিবিবাসদ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পাবনার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে হামলার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে দায়ী করেছে।

যতোদূর জানা যায়, তাতে এ খবরও মিলছে যে, ভারতের বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশে তীব্র মাত্রায় ভারত বিরোধী মনোভাব বেড়ে যাচ্ছে কিনা সে বিষয়টিও এখন দিল্লি বিবেচনায় নিয়ে এসেছে।

কাজেই একদিকে ভারতের নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, জঙ্গিবাদ দমন এবং এ জাতীয় বিষয়াবলী, অর্থনৈতিকসহ বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমী দুনিয়ার চাপের মধ্যে নিজেদের একলা চলো নীতি গ্রহণ ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ব্যাপারে তাদের অবস্থানের বিষয় অর্থাৎ এ দুটো বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য ও সমন্বয় আনার বিষয়টি নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এখন সামনের দিকগুলোতে আরো স্পষ্ট হবে, ভারত কোন দিকে যাবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তার মাত্রা, জনমত, পশ্চিমী দুনিয়ার চাপ সব মিলিয়ে ভারত গত কয়েকদিনে বেশ ঝামেলার মধ্যেই পড়েছে। এই ঝামেলাকে তারা কিছুদিন আগেও আমলে না নিলেও এখন তাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে ঝামেলা বহুগুণে বেড়ে গেছে।।