Home » রাজনীতি » রাজনৈতিক মেলোড্রামা :: নতুন করে পুরনো ঘটনা

রাজনৈতিক মেলোড্রামা :: নতুন করে পুরনো ঘটনা

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoon-5বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন চলছে ধুন্ধুমার মেলোড্রামা। ক্লাইমেক্স অনেকটাই তুঙ্গে। সহসাই এর যবনিকাপাত ঘটবে, এরকম কোন আলামত দেখা যাচ্ছে না। এই মেলোড্রামার কেন্দ্রে যারা রয়েছেন, তারা কোন কিছুর তোয়াক্কা বা পরোয়া করছেন না। এর শেষ হতে আরো কত রক্ত ঝরবে, কত লাশ পড়বে, কত সয়সম্পত্তি ধ্বংস হবেতার হিসেব কেউই জানে না। এই নাটকের যে অংশটি মেলোড্রামাসেটি হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য, আর যা কিছু ট্রাজেডিতা হচ্ছে জনগণের, শুধুমাত্র জনগণের জন্য। গত শতকের নব্বইয়ের পরে গণতন্ত্রের নামে, নির্বাচনের নামে, নির্দলীয়নিরপেক্ষতার নামে এই যে ধারাবাহিক মেলোড্রামা অভিনীত হচ্ছে, তার প্রধান দর্শক হিসেবে জনগণ নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এবং বারবার নির্দয় শিকার হচ্ছে ক্ষমতার লড়াইয়ে সব হারিয়েলাশ হয়ে।

জনগণের ট্রাজেডি হচ্ছে, তারা নির্বাচন দেখেন, নির্বাচনে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেনপরিবর্তন দেখেন না। তারা দলবদল দেখেন, কিন্তু দেখেন না ক্ষমতার গোষ্ঠিগত নির্যাতকদের বদল। এগুলো অবশ্য এককভাবে রাজনৈতিক দলেরও ব্যাপার নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে জাতীয়আন্তর্জাতিক স্বার্থ ও প্রভাববলয়। আন্তর্জাতিক প্রভাববলয় ও আঞ্চলিক কৌশলের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনার কারনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আজকের এই মেলোড্রামা সৃষ্টির নেপথ্য কুশীলব তারাই এবং মঞ্চে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা। এটা এখন পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আর অপরিবর্তনতার পেছনে রয়েছে, সমাজে নানা শ্রেণী গোষ্ঠির মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার ভাঙ্গন ও গঠন। আছে সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র, ধনিক শ্রেণী ও আন্তর্জাতিক পুঁজির বাহক বা প্রতিনিধিরা। এনজিও বিকাশের মধ্য দিয়ে গত দুই দশকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এদের সৃষ্ট প্রতিনিধি বা তথাকথিত সুশীল সমাজ। ফলে, তাদের সকলের জন্য খুবই জরুরীতাদের জন্য নির্বাচিত সরকার। তাদের জন্য হুমকি হচ্ছে প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা, যেখানে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ক্ষমতায় টিকে থাকতে বা ক্ষমতায় আসার জন্য ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোকতাদের পুতুল হিসেবে অভিনয় করতে বাধ্য হন।

এই নাটকের প্রধান দুই চরিত্র শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া একই ভূমিকায়কখনও প্রধানমন্ত্রী, কখনও বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে অভিনয় করে যাচ্ছেন। এটি আসল অভিনয় হলে জনগণ বেঁচে যেতো। কিন্তু যেহেতু পুরোটাই বাস্তব সে কারনে দর্শক হিসেবে এখন জনগণ চূড়ান্ত অর্থেই অসহায়। এই প্রধান দুই চরিত্রের সঙ্গে এখানে আরো অনেক কুশীলব রয়েছে। এই সকল কুশীলব বা পার্শ্বচররা এই দুই চরিত্রের পক্ষেই ‘জ্বি হুজুর’ বলতে গিয়ে বাড়িয়ে বলছেন আরো বেশি। এই মেলোড্রামার নেপথ্যে রয়েছে আরো কুশীলবরা, যাদের জনগণ কূটনীতিক কিংবা দাতা সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে জানেন। জনগণ অবাক চোখে দেখছে, এই নেপথ্যের কুশীলবরা তাদের কারো কারো নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রীতিমতো শিষ্টাচার বা স্বীকৃত আচারআচরনগুলি লংঘন করছে একের পর এক। অন্যদিকে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সুশীল সমাজ নামে দুই প্রধান চরিত্রের উচ্ছিষ্টভোগীরা। তারা টক শো, গোল টেবিল বৈঠক, সাক্ষাতকার বা বৈঠকী আলোচনার নামে এন্তার আলোচনাসমালোচনা, পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন, যা মূলত: ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ দু’জনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা দিচ্ছে, কিংবা উস্কে দিচ্ছে তৃতীয় কোন পক্ষকে। এই মেলোড্রামার বাইরে হাতে গোনা যে দুচারজন মানুষ জনগণের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করছেন বা সঠিক দিক নির্দেশনা দেবার প্রয়াস পাচ্ছেন, তারাও হালে পানি পাচ্ছেন না।

এই মেলোড্রামার সবশেষ সংযোজন হচ্ছে, দুই প্রধান চরিত্রের ফোনালাপ, ৩ দিনের হরতাল, এককুড়ি লাশ পড়া, গায়েবানা জানাজা এবং আবার ৩ দিনের হরতাল। বোঝাই যাচ্ছে, আগামী বেশ কিছুদিন দেশটির জনগণ এই হরতাল, অবরোধের নামে ধ্বংসলীলা দেখবে। এ পরিস্থিতিতে সংলাপ, সংলাপ নিয়ে মাতম তুলছেন অনেকেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক এবং নিয়ামক বলে দাবীদার ব্যবসায়ী নেতারা ইতিমধ্যেই গত ২ নভেম্বর রাতে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে মহাসচিব পর্যায়ে বৈঠকের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তারা হরতাল প্রত্যাহারে বিরোধী নেত্রীকে রাজী করাতে পারেননি। ব্যবসায়ী নেতারা এখন দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। স্বভাবত:ই তারা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রীও এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে যেতে পারেন।

এই মূহুর্তে যদি ধরে নেয়া হয়, দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে একটি সংলাপ শুরু হতে পারে। শর্তহীনভাবেই এটি হতে পারে। গত সপ্তাহে লেখা হয়েছিল, সংলাপঃ হলেই বা কি হবে! সংলাপ নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে অত্যন্ত নেতিবাচক অভিজ্ঞতা। নিকট অতীতে ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র প্রয়াত দুই সাধারন সম্পাদক ও মহাসচিব সংলাপে বসেছিলেন। সে ব্যর্থ সংলাপের পরিনতিতে সংঘটিত হয়েছিল ১/১১ এর মত ঘটনা। সেনা সমর্থিত একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহন করার মধ্য দিয়ে সংলাপের আপাত: পরিসমাপ্তি ঘটে। আরেকটু পেছনে গেলে দেখা যাবে, ১৯৯৫ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিবের প্রতিনিধি স্যার নিনিয়ান স্টিফেন’র মধ্যস্থতায় একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় আলোচনায় বসেছিলেন, বিএনপি’র পক্ষে সংসদ উপনেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগ’র পক্ষে বিরোধী দলীয় উপনেতা প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ। পাঁচ দিনে মোট আলোচনা হয়েছিল ২২ ঘন্টা। গোটা জাতি জানে এই সংলাপের পরিনতি কি হয়েছিল! সংলাপের বিষয়ে সে সময়ে অতি উৎসাহী বিএনপি নেতা তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে মন্ত্রীসভা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।

আমাদের সকলের স্মৃতিতে রয়েছে যে, ঐ সময়ে যে ভাষায় খালেদা জিয়া কথা বলতেন, ঠিক সেই ভাষায় এখন কথা বলছেন শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া বলছেন শেখ হাসিনা’র কথা। ১৯৯৫ সালে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না শেখ হাসিনাতার সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী এবং তার অধীনেই অন্তবর্তীকালীন সরকারের পরিচালনায় নির্বাচন হবে এটি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। ঠিক বর্তমান পরিস্থিতির মত দেশজুড়ে হরতাল, অবরোধ, নাশকতা, সহিংসতার মাঝেই ১৯৯৬’র ১৫ ফেব্রুয়ারী বিএনপি একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে ফেলে। বাংলাদেশে এই সময়ে ৯৫৯৬ এর গোটা পরিস্থিতি উল্টে দিলে সেই সময়কার রাজনীতিবিদদের মেলোড্রামা, জনগণের ভয়াবহ সংকটসবকিছুর সঙ্গে একটি অদ্ভূত সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। সে জন্যই বলা হয়েছিল, দশকের পর দশক ধরে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লড়াইয়ে তারা যে মেলোড্রামা সৃষ্টি করছেন, তার অসহায় শিকার ও নির্বাক দর্শক হয়ে থাকতে হচ্ছে জনগণকে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আবারও ৩ দিনের হরতাল আহবান করেছে। তারা এর মধ্যেই নভেম্বরডিসেম্বরকে ভাগ করে নিয়েছে আন্দোলনের সময় হিসেবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দলীয় সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না অথবা এই সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সে রকম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে কার্যকর কোন সংলাপ বা সমঝোতায় উপনীত হওয়া যে সম্ভব নয় সেটি এখন পরিষ্কার হয়ে উঠতে শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহের হাইকোর্টের রায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে নাসেটি মোটামুটি পরিষ্কার। সে কারনে কোন সংলাপের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাক, সেটি তারা একেবারে চাইবে না। ফলে মরন কামড় দেয়া ছাড়া জামায়াতের বিকল্প কোন উপায় নেই এবং এজন্য তাদের রয়েছে অপরিমেয় অর্থ ও সশস্ত্র জঙ্গী ক্যাডার বাহিনী। সেজন্যই বিএনপিকে তারা আন্দোলনের মাঠে রাখতে চায়। বিএনপি এটা অনুধাবন করলেও তারা সহসাই জামায়াতকে বাদ দিয়ে কতটা অগ্রসর হতে পারবে, সে বিষয়টি সম্ভবত: তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। যতই তারা মুখে বলুক, জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র নির্বাচনের, বাস্তবে এখন তারা ইচ্ছায় হোকঅনিচ্ছায় হোক, জামায়াতের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে চলেছে।

ক্ষমতাসীনরা একটি নির্বাচন করতে চাচ্ছে। বর্তমান সংবিধানের অধীনে। প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকার গঠনের কথা বলেছেন। দলীয় উপদেষ্টা ও দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, খুব শীগগীরই সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবেবিএনপি আসুক আর নাই আসুক। এভাবেই হয়তো ৯৬’র মত একটি একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মহড়া এবং অনুষ্ঠিত হওয়া দেখবে দেশবাসী। সেখানেই সম্ভবত: এই মেলোড্রামাটির একটি পরিনতি ঘটবে কমেডি হিসেবে। কিন্তু তারপর? এর কি ধরনের ট্রাজিক পরিনতি অপেক্ষা করছে আগামীতে সেটি কি আমাদের রাজনীতিবিদরা জানেন না? জেনেশুনেই কি বারবার তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটান?