Home » রাজনীতি » সমতল মাঠ কই – সবই তো এবড়ো-তেবড়ো

সমতল মাঠ কই – সবই তো এবড়ো-তেবড়ো

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-cartoon-12৫ নভেম্বর সকালে বেসরকারী টেলিভিশনগুলির পরিবেশিত খবরে হরতাল চিত্র দেখানো হচ্ছিল। এসব চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বিএনপি’র পুরানা পল্টন অফিস ঘিরে রেখেছে পুলিশ। অবরুদ্ধ নেতাকর্মীরা মূল ফটকে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝেমধ্যে টিভি চ্যানেলগুলোতে সাক্ষাতকার দিচ্ছেনদেখে মনে হচ্ছে ছুটির আমেজে রয়েছেন তারা। মিছিলপিকেটিংসমাবেশ কিছুই করছেন না তারা। অফিস থেকে বেরুলেই গ্রেফতারের আশংকা রয়েছে, সম্ভবত: এই আতঙ্কেই মাঠে নামছেন না তারা। রাজধানীর রাজপথে তাদের দায়িত্বশীল কোন নেতাকে দেখা যায়নি। এমনকি অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাদেরও দেখা মিলছে না। কারন তারা জানেন, হরতাল ডেকে দিয়ে আগের দিন বোমাবাজি করে, ককটেল ফাটিয়ে, গাড়ি পুড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও মোটামুটি একটি হরতাল হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের সামনে বলা হবে, জনগণ হরতালে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছে। সরকারী নির্যাতন, গুলি, গ্রেফতার উপেক্ষা করে।

অন্য দৃশ্যটি দেখা গেল, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। আওয়ামী লীগ নেতারা আছেন বেশ খোশ মেজাজে। তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে পুলিশ, র‌্যাব। তারা অবরুদ্ধ নন। চাইলেই হরতাল বিরোধী মিছিল, পিকেটিং, সমাবেশ করছেন। কেউ বাধা দিচ্ছে না। টিভি ক্যামেরায় সাক্ষাতকার দিয়ে আরো কঠোর হুমকি দিতে পারছেন, হরতাল ঠেকাতে প্রয়োজনে যেকোন ব্যবস্থা তারা গ্রহন করতে পারেন।

এরকম পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশের যেকোন মানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের অবস্থান কোন সমতল মাঠে নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড শব্দটি হালে বহুল পরিচিত হয়ে উঠলেও দুই দলের সেরকম মাঠ পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে চরম অসমতা। গত ৫ বছর ধরেই এই অবস্থাটি বিরাজ করেছে। বিএনপি কেন, যখনই সরকার বিরোধী কোন ইস্যুতে আন্দোলন, সমাবেশ বা হরতাল করতে চাওয়া হয়েছে, তখনই সরকারের পুলিশ দিয়ে তা নিমর্মভাবে দমন করা হয়েছে। মামলা, গ্রেফতার, হয়রানি করা হয়েছে। জনস্বার্থে গড়ে ওঠা যে কোন আন্দোলনকে বলা হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর অপচেষ্টা। ফলে, রাজনীতিতে অবধারিতভাবেই চরম নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সন্ত্রাস, বোমাবাজি, জ্বালাওপোড়াও দখল করে নিয়েছে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির স্থানটি। এই সুযোগটি নিয়েছে, জামায়াতে ইসলাম।

বিএনপি নেতা ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া জনসভা করতে চাইলে ঢাকা শহরে সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। কোন সভ্য দেশে, যেখানে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, সেখানে এরকম নজির পাওয়া যাবে না। সেখানে অবশ্যই এটি সাংবিধানিক অধিকার হরনের সামিল হয়ে যাবে। চট্টগ্রামে বিএনপি সভা আহবানের স্থলে ক্ষমতাসীনরা সভা ডেকে দিলে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। সারাদেশ জুড়ে কমবেশি চিত্রটি এরকম। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার পুলিশের বক্তব্য প্রায় অভিন্ন। সন্ত্রাস সৃষ্টির আংশকা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে তারা এসব করে থাকেন। তবে জনগণ নিশ্চিত যে, সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশেই এরকম নিবর্তনমূলক আদেশ এবং ঘটনা ঘটেই চলেছে। কারন, তারা দেখছেন অনেক দেনদরবারের পরে খালেদা জিয়াকে পল্টন ময়দানে জনসভা করার অনুমতি দেয়া হয়না। আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসভা করতে চাইলে তাতে কোন বিধিনিষেধ আসে না, কোন সংকট তৈরী হয় না। কারন জনগণ বোঝে, সংকটের মূল উৎসটি কোথায়।

সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে এখন সমতল ভূমিতে পদচারনা শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দল ও তার জোটের। বিরোধী দল ও জোটের জন্য মাঠটি এত অসমতল যে, প্রতি পদক্ষেপে তাদেরকে হোঁচট খেতে হচ্ছে, পুলিশর‌্যাববিজেবি এবং তাদেরই জামায়াতশিবির ক্যাডারদের সামনে। এর ফলে নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের ধারা ব্যাহত যে হতে চলেছে, তা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি কোথায় চলেছে সেটি বোঝা যাচ্ছে, যে কোন অবস্থায় একটি নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই মন্ত্রীদের পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন। কোনো কোনো মন্ত্রী আভাস দিয়েছেন, কথিত সর্বদলীয় সরকার গঠিত হতে পারে এ মাসের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে। বিএনপি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সর্বদলীয় সরকারে তারা যাচ্ছে না। নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে না নিলে নির্বাচন তো দুরের কথাকোন আলোচনায়ই বসবে না তারা।

এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন জনগণের অনেক কৌতুহল জাগিয়ে তুলেছে। গত সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনায় যারা মুখরতারাও স্বীকার করবেন যে, আগের নির্বাচন কমিশনটি অনেক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছিল। ভোটার লিষ্ট তৈরী, নির্বাচনের আচরনবিধি তৈরী, প্রতিযোগিতার জন্য সমতল মাঠ সর্বোপরি একটি অবাধ,সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন তারা করেছিলেন। সে কারনে বর্তমান কমিশনের কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক। কিন্তু শুরুতেই আরপিও সংশোধন করে নির্বাচন বানিজ্যের যে পথ তারা উন্মুক্ত করে দিলেন, সে রকম নৈতিকতা বিরোধী সিদ্ধান্তের কি জবাব তারা দেবেন? কমিশন নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ষ্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার কথা জানিয়েছেন। দেরীতে হলেও ইসি স্বীকার করেছে যে, জাতীয় নির্বাচনের মত একটি বিশাল কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া এটির সাফল্য অত্যন্ত দূরহ, প্রায় অসম্ভব। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বিরোধী দলগুলোর একটি দাবি নৈতিকভাবেই ইসি স্বীকার করে নিল।

তবে নির্বাচন কমিশন এখনই তফসিল ঘোষণা না করার পক্ষে রাজনৈতিক সমঝোতাকে ছুতো হিসেবে দাড় করিয়েছে। সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। কিন্তু কমিশিন দাবি করছে, তফসিল ঘোষণার পর দিন গণনা শুরু হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে তাদের অন্তত তফসিল ঘোষণা করে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা উচিত বলে জনগণ প্রত্যাশা করে। সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা সরকারী কাজে গিয়ে নির্বাচন প্রচারনা চালাচ্ছেন এটি কোন অবস্থাতেই মেনে নেয়া উচিত নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমতল মাঠ তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, নির্বাচনের একটি অনুকূল পরিবেশ ও তাদের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত: নির্বাহী বিভাগের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে অন্তত:পক্ষে লাগামটি টেনে ধরতে পারে।।