Home » রাজনীতি » স্বৈরাচারের মুখ নয় জনগণ চায় নির্বাচিত সরকার

স্বৈরাচারের মুখ নয় জনগণ চায় নির্বাচিত সরকার

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

handcalfবাংলাদেশ রাষ্ট্রটি জন্ম নেয়ার কিছুদিন যেতে না যেতেই, এক বছর নয় মাসের মাথায় ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীটি আনা হয়। আর এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান, নির্বতনমূলক কালাকানুনসমূহ সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে আওয়ামী লীগ যে মায়াকান্না কেঁদেছিল পঞ্চদশ সংশোধনীর আগপর্যন্ত সে সংবিধানকে প্রথম কলঙ্কিত করার শুরু সেখান থেকেই। অবাধে নির্যাতন, নিপীড়নের ব্যবস্থাটি সেদিন আইনি লেবাস পরিয়ে দেয়া হয়েছিল সংবিধান সংশোধন করেই। এর কিছুদিন পরে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। আর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সংসদে পাস করা হয় চতুর্থ সংশোধনী যার মাধ্যমে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম, সংবাদপত্র বন্ধসহ নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। একটি বেসামরিক সরকারের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার এই হচ্ছে গতিধারা, এই হচ্ছে ইতিহাস। এভাবেই স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রথম লগ্নে এসে বেসামরিক শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠা। অথচ শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে’(অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড পৃষ্ঠা : ২০৪)

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্ব তার বক্তব্য এবং পরবর্তীকালের কার্যক্রমে সমন্বয় ঘটাতে পারেননি। সেই যে শুরু, বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে তার পুনরাবৃত্তি একাধিকবার ঘটেছে কখনও সামরিক বা বেসামরিক শাসনের সময়ে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তারই দেয়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ করেছে। ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এবং প্রশাসনকে দলনিরপেক্ষ রাখাসহ নানা অঙ্গীকার করেছিল। এসব অঙ্গীকার ভঙ্গের কথা বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। আরো একটি বিষয় বলা হয়েছে, তারপরেও প্রসঙ্গটি পুনরায় উল্লেখ করা প্রয়োজন। নির্বাচনী ইশতেহারে ৫.৪ দফায় বলা হয়েছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবেএকটি সর্বসম্মত আচরণবিধি মালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বিষয়টিসহ পুরো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এবং এককথায় অস্বীকারের ঘটনাগুলো আমজনতা বার বার দেখতে পাচ্ছেন। দেখতে পাচ্ছেন, কিভাবে বদলে যায় মুখ। তাহলে আগেরটি কি ছিল মুখোশ এ প্রশ্নটিও এসে যায় সঙ্গে সঙ্গেই।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ নানা জটিলতায়পূর্ণ একটি ব্যবস্থা এসে হাজির হয় দেশবাসীর সামনে। কারো পরামর্শ, বক্তব্য, উপদেশ কিংবা দাবি কোনো কিছুই শোনা হয়নি। সমাজের বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত অধিকাংশের মত এবং মতামতের কোনো মূল্যই রইলো না। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথমদিন থেকেই জনমনে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল সরকারটির চরিত্র এবং আসল উদ্দেশ্য নিয়ে। শেষমেষ তার বেশ কিছুটা প্রকাশিত হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পরে। কিন্তু তারপরেও পুরোটা প্রকাশিত হলো না। এখন সংলাপ, আলোচনা, টেলিফোন আলাপ সব বাদ দিয়ে ওসব তো কথার কথা, এমন একটা মনোভাব নিয়ে সরকার কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করে এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত, দীর্ঘমেয়াদী পারলে চিরস্থায়ী করার মানসে। কিন্তু এরপরেও যে সব কিছু প্রকাশিত হয়েছে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। সামনে এ দেশটির ভাগ্য অনেক কিছুই হয়তো আছে যা আমরা জানি না এবং জানতেও দেয়া হয় না। বোধ করি ক্ষমতাসীনদেরও অধিকাংশই জানেন বলে মনে হয় না। একজন কৃষকের ধান ক্ষেতে কোনো এক অভাগার দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত মাথার খুলি পাবার গল্পটি যারা জানেন, তার এও জানেন, খুলিটির ললাটে লেখা ছিল কপালে আরো দুঃখ আছে।’ ধান ক্ষেতে অবহেলায়, অযত্নে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত ওই বস্তুটির কপালে কি আর দুঃখ থাকতে পারে। যারা গল্পটি জানেন, গল্পের শেষটুকুও তারা জানেন আশা করি। শেষ পর্যন্ত কপালে কি দুঃখ আছে তার একটা নিষ্পত্তি হয়েছিল। এটি একটি গল্প মাত্র। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন বাদে দেশবাসী সবার ললাটে তাহলে কি লেখা আছে? আমার জানা নেই। ললাটে ভালো আছে লেখা থাকলেই ভালো ছিল, সবার প্রত্যাশাটিও ছিল তেমনি।

কিন্তু এই দফার আপাতঃ সবশেষ যে ঘটনাটি ঘটলো তার সঙ্গে কি প্রত্যাশার কোনো মিল থাকতে পারে? বিএনপি এই দফার আন্দোলনে অর্থাৎ অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তিনদিনে ৬০ ঘন্টা আবার এ মাসের প্রথম সপ্তাহেই ৬০ ঘন্টা হরতাল পালন করেছে। এতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। তবে একটি কথা বলতেই হবে, বহুল ব্যবহারে অকার্যকর হয়ে পড়ছে হরতাল নামক রাজনৈতিক অস্ত্রটি। জনগণকে সম্পৃক্ত করার মতো, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দাবি আদায়ের জন্য এই হরতাল এখন আর কার্যকর কোনো কর্মসূচি নয়। কিন্তু তারপরেও বিএনপি হরতালের মতো একটি কর্মসূচি কেন বার বার দিচ্ছে তা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন উঠছিল।

এখানে বোধ করি হরতাল সম্পর্কে একটি তথ্য দেয়া যেতে পারে। ১৯৭২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়েই ৭৩৮ দিন হরতাল পালিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়েই হরতাল হয়েছে ৬৭৪ দিন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সময়ে হরতাল পালিত হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে ২৬৬ দিন। (সূত্র : ফ্র্যান্সিস হ্যারিসনের বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কিত গবেষণা পত্র থেকে)। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সময়ে প্রধানত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতেই আওয়ামী লীগজামায়াত এবং অন্যান্য দলের ডাকে ওই হরতালগুলো পালিত হয়েছিল। এই হরতালের ক্রমাগত ব্যবহারের ব্যাপারে খোদ জনগণই যখন প্রশ্ন উত্থাপন করতে যাচ্ছিল তখন বিরোধী দল বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার, নেতাদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, দেশব্যাপী ব্যাপক ধরপাকড় চলছে। সংলাপ হবে না, সরকার একাই একদলীয় নির্বাচন করবে এমন একটা পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ যখন এমনিতেই ভয়ানক আতঙ্কিত তখন এই গ্রেফতারসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি আতঙ্কের মাত্রা এমন পর্যায়ে বাড়িয়ে দিয়েছে যে, আতঙ্কের মাত্রা পরিমাপক কোনো যন্ত্রের পক্ষেও তার সঠিক হিসাব বের করা সম্ভব নয়। এক ভয়ঙ্কর, ভীতিকর, নৈরাজ্যিক এবং দিকদিশাহীন পরিস্থিতির মধ্যে সমগ্র দেশবাসীকে ফেলা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি’র আরেক দফা হরতাল ঘোষণার পরপরই আচানক এই সিদ্ধান্ত কি সরকারের জন্য হঠকারী নয়? স্বরাষ্ট্র ও তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, গ্রেফতারকৃত নেতারা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলেই সরকারকে এই কর্মটি করতে হয়েছে। তাহলে গ্রেফতারধরপাকড় করে কি সরকার আরো বড় ধরনের উস্কানি দেয়নি? আর এই উস্কানির পরেই তো রোববারের হরতাল শুরু হয়ে গেছে শুক্রবার রাত থেকেই। আবার বিএনপিও হরতাল আরো বাড়িয়ে এখন ৮৪ ঘন্টার হরতাল আহ্বান করেছে। আগের কোনো কোনো হরতাল ঢিলেঢালা ভাবে হলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এই ভিন্নতা কি সরকার নিজে নিজে ডেকে আনেনি? এখন তো বলতেই হবে পুরো সপ্তাহের প্রায় সবটা জুড়েই সরকারি উদ্যোগে হরতাল চলছে। সরকারই নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে তার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আখেরে তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে না? এমন ভাবনাটুকুও বোধ করি তাদের চিন্তার মধ্যে নেই। ভালোমন্দ চিন্তাভাবনা বোধবুদ্ধিটুকুতেও সিল মোহর মেরে দেয়া হয়েছে।

পুরো বিষয়টিই একদলীয় নির্বাচনটি করিয়ে নেয়ার জন্য। আর এর জন্য এবং লক্ষ্যেই উস্কানি, হঠকারী সিদ্ধান্ত, আতঙ্ক সৃষ্টিসহ সব আয়োজন। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, একদলীয় নির্বাচন হলে সে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নির্বাচিত সরকার দেখে না দেখে স্বৈরাচারের মুখ। অতীতেও তা দেখেছেন। সামনের দিনগুলোতেও তাই তারা দেখতে পাবেন। যুগে যুগে তাই হয়েছে। তবে একটি বিষয় কেউ মানুক আর না মানুক ইতিহাসের হিসাবনিকাশ পরিষ্কার। এই পন্থায় পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদে বা চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকা যায় না। কারণ জনগণ চায়, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ‘নির্বাচিত সরকারের মুখ’। স্বৈরচারের মুখ তারা দেখতে চায় না, মানতে তো চায়ই না। আর মানানোও যায় না কোনোভাবেই।।