Home » অর্থনীতি » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৯)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৯)

১১ দফা ও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান

আনু মুহাম্মদ

1969আন্দোলনমুখর পরিস্থিতিতেই ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া ও মেনন গ্রুপ নিয়ে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তাদের পক্ষ থেকে ১৪ জানুয়ারী ১১ দফা কর্মসূচী ঘোষিত হয়। এই ১১ দফায় ৬ দফার সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং কৃষক শ্রমিক ও শিক্ষা বিষয়ক কর্মসূচীও যুক্ত হয়।

১১ দফা কর্মসূচীর কথাগুলো ছিলো নিম্নরূপ:

. () স্বচ্ছল কলেজগুলিকে প্রাদেশিকীকরণের নীতি বাদ দিতে হবে এবং এর মধ্যে যেসব কলেজ প্রাদেশিকীকরণ করা হয়েছে সেগুলিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। কারিগরি, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও কৃষি ছাত্রদের দাবি মানতে হবে। ছাত্র বেতন কমাতে হবে। নারী শিক্ষার প্রসার করতে হবে এবং শিক্ষা সংকোচন নীতি পরিহার করে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করতে হবে।

() কুখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় কালাকানুন সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন প্রদান করতে হবে।

() শাসক গোষ্ঠির শিক্ষা সংকোচন নীতির প্রামাণ্য দলিল ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ ও ‘হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট’ বাতিল করতে হবে এবং ছাত্রসমাজ ও দেশবাসীর স্বার্থে গণমুখী ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে।

. প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

. () শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রকৃতিঃ দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং এর ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের(খবমরংষধঃঁৎব) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের সরাসরি ভোটে।

() কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাঃ কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অংগরাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরংকুশ।

() মুদ্রা বা আর্থসম্বন্ধীয় ক্ষমতাঃ মুদ্রার ব্যাপারে নিুলিখিত দুটির যেকোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে – () সমগ্র দেশের জন্যে দুটি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে, () বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবলমাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসু ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভের পত্তন ও অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।

() রাজস্ব, কর বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতাঃ ফেডারেশনের অংগরাষ্ট্রগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অংগরাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অংগরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।

() বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতাঃ

() ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।

() বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অংগরাষ্ট্রগুলির এক্তিয়ারাধীন থাকবে।

() কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অংগরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।

() অংগরাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্যাদি চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর জাতীয় কোন বাধা নিষেধ থাকবে না।

() শাসনতন্ত্রে অংগরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্বস্বার্থে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।

() আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অংগরাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।

. পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিন্ধুসহ সকল প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে, সাব ফেডারেশন গঠন করতে হবে।

. ব্যাংক, বীমা, ইনসুরেন্স ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করতে হবে।

. কৃষকের উপর হতে খাজনা ও ট্যাক্সের হার হ্রাস করতে হবে এবং বকেয়া খাজনা ও ঋণ মওকুফ করতে হবে। সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল ও তহসীলদারদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। পাটের সর্বনিু মূল্য মণ প্রতি ৪০.০০ টাকা নির্ধারণ এবং আখের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে।

. শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও বোনাস দিতে হবে এবং শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী কালাকানুন প্রত্যাহার করতে হবে এবং ধর্মঘটের অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান করতে হবে।

. পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলসম্পদের সার্বিক ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে।

. জরুরী আইন প্রত্যাহার, নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য আইন প্রত্যাহার করতে হবে।

১০. সিয়াটো, সেন্টো, পাকমার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল করে জোট বর্হিভূত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি কায়েম করতে হবে।

১১. দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক সকল ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী ও নেতৃবৃন্দের অবিলম্বে মুক্তি, গ্রেফতারী পরোয়ানা ও হুলিয়া প্রত্যাহার এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ সকল রাজনৈতিক কারণে জারীকৃত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারী ছাত্রনেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এই ঘটনা পুরো আন্দোলন পরিস্থিতিকে প্রবলভাবে বেগবান করে। শামসুর রাহমান লেখেন ‘আসাদের শার্ট’। ২৪ জানুয়ারী ঢাকায় একটি বিশাল মিছিল হয়। সচিবালয়ের সামনে মিছিলে গুলিবর্ষণ করে সেনাবাহিনী। শহীদ হন রুস্তম আলী ও স্কুলের ছাত্র মতিউর। গণজোয়ার অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে তা থামানোর জন্য ১৮ ফেব্রুয়ারী থেকে কার্ফু বা সান্ধ্য আইন জারী করা হয়। কিন্তু তাতে মানুষের জোয়ার থামেনি। কোন ঘোষণা ছাড়াই সারা ঢাকার বস্তি, শিল্পাঞ্চলসহ সকল এলাকা থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে মানুষ বেরিয়ে এসে সান্ধ্য আইন অস্বীকার করে। এই অবস্থার পর সরকারের আর টিকে থাকার অবস্থা ছিল না। এর মধ্যে জেলের মধ্যে নিহত হন আগরতলা মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুজ্জোহা শহীদ হন ক্যাম্পাসেই। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে পদত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ থেকে ইয়াহিয়া খান পুনরায় সামরিক আইন জারি করেন সারাদেশে। দুবছর পর এই দিনেই ইয়াহিয়া খান চক্র ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ শুরু করে গণহত্যা এবং নির্যাতনের বর্বর পর্ব যা পাকিস্তানের পতন না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।।

(চলবে…)