Home » রাজনীতি » একটি জটিল-কূটিল ধূর্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি

একটি জটিল-কূটিল ধূর্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-cartoon-51We will stay in power for about two years and hand over power to a political party but obviously not Awami League as Awami League will destroy the Armed Forces’(’৮২ সামরিক অভ্যূত্থানের পরে অফিসারদের উদ্দেশ্যে সেনা সদর দপ্তরে প্রথম বক্তব্যে এরশাদ, সূত্র: স্বৈরশাসনের নয় বছর মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি)

পক্ষী অথবা প্রাণীকূলে কিছু হিংস্র পাখি বা প্রাণী রয়েছে যারা নিরাপদ ও চমৎকার একটি ভোজের জন্য অনেক কালঅনেক সময় অপেক্ষা করে থাকতে পারে। তাদের ধৈর্য্য সীমাহীন। এসব পাখি বা প্রাণীর সঙ্গে সমিল ও তুলনীয় কিছু মানুষ মানবজাতির মধ্যেও রয়েছে। ইতিহাসের কালপঞ্জিকায় তারা ‘মীরজাফর’ নামে কুখ্যাত। সবকালেই এসব মীরজাফরেরা ক্ষমতার লড়াইয়ে ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে। শেক্সপিয়ারিয়ান ট্রাজেডিসহ বিশ্বের সকল ট্রাজিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এসব চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় রয়েছে পাঠকের।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এরকম একটি চরিত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লড়াইয়ে দুই দশক পরে পুনরায় কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। আবার তিনি চালকের আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন। প্রধান দুই দলের ক্ষমতার লড়াইয়ে এই চরিত্রটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের কতিপয় কুশীলবের কাছে আদৃত হয়ে উঠেছেন। ফলে রাজনীতির নোংরা খেলায় তার অবস্থান এখন অনেকটা নিয়ামকের।

বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে সাপের মত খল, শ্বাপদের মত ধূর্ত এই চরিত্রটি ক্ষমতা কাঠামোর মূল কেন্দ্রে অনুপ্রবেশ করে ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি তিনি, ৭১এর আগষ্টে ছুটিতে দেশে এসে আবার পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। পরে ভূট্টো যখন আটকে পড়া বাঙালী অফিসারদের কোর্টমার্শাল করার জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন, তার চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন এই চরিত্রটি। বাংলাদেশে ফিরে এসে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এক সময় রাষ্ট্রীয় শীর্ষ ক্ষমতা দখল করে ফেলেছিলেন। সে অন্য ইতিহাস!

রাষ্ট্রপতি জিয়া ও জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যার অভিযোগেও এই ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করেন অনেকেই। অসংখ্য সামরিকবেসামরিক নাগরিককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দায়ে অভিযুক্ত। বিদেশে অর্থ পাচার, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন, নৈতিক চরিত্রের চরম স্খলনের দায়ে তিনি অভিযুক্ত। তিনি আবার পীর ভক্ত। আটরশির পীর, শর্ষিনার পীর, চরমোনাইর পীর এবং হালে হেফাজতে ইসলামের আল্লামা শফির চরম ভক্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। ৮২ থেকে ৯০, নয় বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান নিয়ে এ চরিত্রটি দেশকে ঠেলে দিয়েছিল সীমাহীন এক অন্ধকার যাত্রায়।

বিষাক্ত এই স্বৈর সরীসৃপের নয় বছরের ছোবল থেকে ৯০এ দেশকে মুক্ত করা হলেও তার বিষদাঁত অবশিষ্ট থেকেই গিয়েছিল। ফলে তথাকথিত গণতান্ত্রিক দল ও ব্যবস্থার ঘাড়ে চড়ে নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আবির্ভাব ঘটে এই চরিত্রটির। বাংলাদেশের দু’টি প্রধান দল এই পূনর্বাসনের জন্য সমানভাবে দায়ী। ক্ষমতার লড়াইয়ে ৯০ দশকের প্রথমভাগে সে সওয়ার হয় আওয়ামী লীগের কাঁধে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগ পায়, একের পর এক ভয়ংকর অভিযোগ থেকে আইনআদালতের মাধ্যমে মুক্ত বাতাসে বিচরন করতে শুরু করে। এরকম অবস্থায় চলতি শতকের শুরুর বছরে জাতি অবাক হয়ে দেখে পিতৃহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এই চরিত্রটির সঙ্গে সাক্ষাত করে মরহুম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। রাজনীতির চরম নোংরামীর আবর্তে চরিত্রটি আবারও হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় খলনায়ক।

২০০৭ সালে ১৪ দলীয় জোটে অনুপ্রবেশ ঘটে এই চরিত্রের। গঠিত হয় মহাজোট। যারা ৯০এর পরে এই চরিত্রটির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিলেন, আশা করেছিলেন অভিযোগ প্রমানিত হলে ফাঁসি হবে, তাদের সঙ্গে চমৎকার সহাবস্থান ঘটে চরিত্রটির। অচিরেই ১/১১ এর কবলে পড়ে দেশজাতি। ২০০৮এর নির্বাচনে আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করে, নানা ছলেবলে। ক্ষমতায় থাকা ও আসার নেশায় ব্যাকুল দুই দলের কাছেই অপরিহার্য হয়ে ওঠে এই চরিত্রটি এবং তার নিজের মত করে খেলতে এবং খেলাতে শুরু করে। কোন কোন আন্তর্জাতিক শক্তি তাকে নেপথ্যে মদত জোগাতে থাকে। ফলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এবং সর্বদলীয় মোড়কে একক নির্বাচন আয়োজনে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ক্ষমতাসীনরা তাকে সুযোগ করে দিয়েছে, নাকি সেই সুযোগ করে নিয়েছে।

গত ১৮ নভেম্বর বিকেলে বঙ্গভবনে সর্বদলীয় মন্ত্রীসভার নামে মূলত: মন্ত্রীসভায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটিকে এখন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মন্ত্রীসভা বলে অভিহিত করা যেতে পারে। মহাজোট ছাড়ি ছাড়ি করতে করতে অবশেষে গতকাল চূড়ান্ত ঘোষণা এসেছে ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে। তিনি একটি নতুন জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং তিনি বিএনপিকেও সর্বদলীয় সরকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে আহবান জানিয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, নির্বাচন না হলে সামরিক শাসন আসবে! বিএনপি অবশ্য সর্বদলীয় সরকারকে তামাশা আখ্যায়িত করে এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে অনড় রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওই ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতাসীন দল একটি একক নির্বাচনের দিকে এগুচ্ছেন। বিএনপিকে বাইরে রেখে। বিএনপি যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহন না করতে পারে সে জন্য নানারকম ভানুমতির খেল্ দেখাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দল। বেগম খালেদা জিয়া ১৯ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সামগ্রিক বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন। এর ফল যাই হোক, তা আগামী নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারবে বলে মনে হয় না। তারপরেও জাতি গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত কি হবে শেষ অবধি!