Home » অর্থনীতি » নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি আর রাজনীতি সব ভরে গেছে বিষে – বিদ্বেষে বিষাক্ত ছোবলে

নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি আর রাজনীতি সব ভরে গেছে বিষে – বিদ্বেষে বিষাক্ত ছোবলে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoon-12রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে রক্তাক্ত ও দিশেহারা জনগণের জন্য ২০১৩ সালের সবচেয়ে নির্দয় কৌতুকটি ছিল রাজধানীর নবান্ন উৎসব। রাজধানী ঢাকায় গড়ে ওঠা কর্পোরেট সংস্কৃতির ধারকবাহক বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠি এই নবান্ন উৎসবটি পালন করেছে। এটি খ্যাতনামা টিভি চ্যানেল ফলাও করে এটির লাইভ সম্প্রচারও করেছে। এটি এমন একটি সময়, যখন বিরোধী দলের হরতালের আগুনে পুড়ে মিন্টু পাল মারা যাচ্ছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে আসাদ গাজীরা মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। সে সময়ই ঢাকার সুশীল নাগরিকরা ঘটা করে পালন করছিলেন নবান্ন উৎসব। গত ক’দিনে দ্রব্যমূল্যের গনগনে আগুনে পুড়ছে নিুবিত্তদরিদ্ররা, মধ্যবিত্তরা অবস্থান ধরে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হরতালের কারনে এসব দিনকাবারী রোজগেরে মানুষদের আয়ইনকাম বন্ধ। অঘ্রানের শুরুতে চালের দাম কেজি প্রতি ৩১০ টাকা পর্যন্ত উর্ধগামী, তখনই নবান্ন উৎসব কৌতুক ছাড়া আর কি হতে পারে।

নবান্ন, কিসের নবান্ন, কার নবান্নকর্পোরেট সংস্কৃতির এই বুঝি ধারা! গনগনে আগুনে ঝলসানো লাশের ওপর উৎসবের নামে ডুগডুগি বাজানো! এই নবান্ন উৎসবটি হতে পারতো একটি প্রতিবাদের প্রতীক। হরতালের নামে নিরীহ মানুষের ঝাঁপিয়ে পড়ার বিরুদ্ধে, আগুন দিয়ে ঝলসিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার বিরুদ্ধে, ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে জনগণকে জিম্মি করার প্রতিবাদে, চালসহ দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির প্রতিবাদ হিসেবে। তাহলে অনিশ্চিত যাত্রার এই বাংলাদেশে যথার্থ অর্থে এরকম উৎসব হয়ে উঠতো নাগরিক ক্ষোভবিক্ষোভের স্বার্থক প্রকাশ।

একটি ছোট্ট্ খবর! গুড়া হলুদে ভয়ংকর বিষসীসার গুড়া মেশানো হচ্ছে। কয়েকটি নমুনায় এটির পরিমান ভয়াবহ রকম। বিএসটিআই’র এক পরীক্ষার প্রাপ্ত ফল এটি। তারা সংবাদ সম্মেলনে এর ভয়ংকর পরিনতির কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলি খুবই হেলাফেলার সঙ্গে খবরটি পরিবেশন করে একরকম দায় এড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে, তা হচ্ছে, সবত্রই বিষ ছড়িয়ে পড়ছে। খাদ্যদ্রব্য, ষধপত্রসহ সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য সকল জিনিষেই এখন বিষআর বিষের ছড়াছড়ি। এর মূল কারণটি হচ্ছে, আমাদের রাজনীতি ভরে গেছে বিদ্বেষবিষে। রাজনীতি যখন বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তখন জনজীবনের প্রতিটি স্তরে তা ছড়িয়ে পড়ে, নাগরিকরা হয়ে পড়ে বিষ জর্জর। রাজনীতির এই বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত আমাদের পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলিও। সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন এইসব প্রতিষ্ঠানগুলির ওপরে নির্বাহী বিভাগের একের পর ছোবলের কারনে তারা অনেকটাই তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হচ্ছে বলে জনগণ বিশ্বাস করে।

হরতালে মানুষ পুড়িয়ে মারার বিষাক্ত রাজনৈতিক কালচার এই দেশে শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালের জুলাই মাসের দিকে। সে সময়ে আওয়ামী লীগের ডাকা এক হরতালের আগের দিন সন্ধ্যায় একটি দোতলা বাসে বিস্ফোরক ছড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় শিশুসহ ৯ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিএনপি’র সকর নেতারা নিশ্চিতভাবে বলছিলেন, এটি আওয়ামী লীগের কাজ। মামলা হয়েছিল, গ্রেফতার করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের অনেককেই। কিন্তু এর আর তদন্ত হয়নি। প্রমান হয়নি কিছুই। মাঝখান থেকে ৯ জন নিরীহ নাগরিকের প্রান গেছে। বছরখানেক ধরে হরতালের নামে এভাবেই মানুষ পুড়িয়ে মারার বিষাক্ত কালচার অব্যাহত রয়েছে। আর সে সময়ের প্রধানমন্ত্রীর মত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করছেন প্রতিপক্ষকে। মামলা হচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে, প্রমান হচ্ছে না কিছুই। ফলে যারা হত্যা করছে মানুষ পুড়িয়ে তারা নিরাপদেই নিয়োজিত থাকছে নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডে।

প্রশ্নটি বারবার আসছে। কারা করছে খুনগুম, সন্ত্রাস, ঝলসে দিচ্ছে আগুনে? প্রতিটি খুনের ঘটনার পরে বিস্তর চিৎকার হয়, টিভি ক্যামেরার সামনে নিহতের আত্মীয়স্বজনদের করুন আহাজারি দেখা যায়। তারপর একসময় সব নিরবনিথর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অপরাধী ধরা, সনাক্ত করা, বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করাএটি অনেকটা সূদুর পরাহত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের পোষাক বদলেছে। র‌্যাব গঠনের পরে এই এলিট ফোর্সের জন্য দামী গাড়ি, প্রয়োজনীয় লজিষ্টিকস, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, প্রশিক্ষিত কুকুর বাহিনী মায় হেলিকপ্টার পর্যন্ত কেনা হয়েছে। তারপরেও এদের হেফাজতে দুর্ঘটনাবশত: নিহত হচ্ছে একের পর এক, যাদের অনেকের কাছ থেকে তথ্যপ্রমানসহ অপরাধের শেকড় উৎপাটিত করা সম্ভব ছিল।

ধারনা করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলি হরতাল, অবরোধ, বোমাবাজি, নাশকতা আর বহুদলীয় সরকারের আদলে একদলীয় নির্বাচন আয়োজন গোটা দেশের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ, আরো বিপন্ন অসহায় করে তুলবে। ইতিমধ্যেই তার আলামত মিলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কথিত প্রানভোমরা এরশাদ ভানুমতির খেল দেখাচ্ছেন তার শেষ পর্বে এসে। ফলে এ আশংকা সম্ভবত: বাস্তবে ফলতে যাচ্ছে যে, আগামী নির্বাচন বিএনপিকে বাদ দিয়েই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মহাজোটের শরীক দলগুলোকে কথিত সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন মন্ত্রীসভাটি গঠিত হতে যাচ্ছে। এরশাদ ইতিমধ্যেই জোট ত্যাগ করেছেন, নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, হেফাজতের আল্লামা শফির কাছ থেকে দোয়া নিয়েছেন, আবার সর্বদলীয় মন্ত্রীসভায় স্ত্রীসহ ৫ জনকে পাঠিয়েছে। এছাড়া মন্ত্রীর পদমর্যাদায় একজন উপদেষ্টাও পেয়েছে ওই দল। ইতোমধ্যে জি এম কাদের তো মন্ত্রীসভায় রয়েছেই। বিএনপি ইতিমধ্যেই সর্বদলীয় মন্ত্রীসভায় যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে নাএটি জানিয়ে দিয়েছে।

আমাদের সবকিছু বিষাক্ত হয়ে ওঠার মধ্যে এখন যে প্রশ্নটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কার্যকর নাকি অকার্যকর। আমরা রাষ্ট্র কাকে বলবো? কার্যকরীতা বা স্বার্থকতা কাকে বলে? ব্যর্থতা বা অকার্যকারীতাই বা কাকে বলে? এই বিতর্কের উত্তর কি সবার এক হবে। রাষ্ট্র কখন, কোথায় সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়? রাষ্ট্র কখনও প্রবল মুসলমান, আবার কখনও ধর্মনিরপেক্ষ নিরাকার পুঁজি? রাষ্ট্র আবার কখনও জাতীয়তাবাদী হিসেবে চড়াও হয় আবার কখনও বিষ্মায়নের মহিমায় সামাজ্র্যবাদের উন্নয়ন বাহিনীর কাছে উন্মুক্ত? রাষ্ট্র কোথায় কার্যকর আর কোথায় অকার্যকর?

আগামীতে কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত: নেপথ্যের কুশীলবরা দিতে পারবেন। কিন্তু এই মূহুর্তে অপরাজনীতির বিষাক্ত থাবায় বোমা, হত্যা, সন্ত্রাসের ভয়াল আশংকা জনগণের সকল স্নায়ু দখল করে রেখেছে। বাংলাদেশের জনগণ খুনি, দখলদার, দুর্বৃত্তদের বিজয় দেখতে দেখতে এখন এতো অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, এদের বিজয় স্বাভাবিক মনে হয়, জনগণের পরাজয় অবধারিত মনে হয়। এরকম পরাজয় বা পশ্চাদাপসারন খুব কম মানুষের মধ্যেই বেদনা, ক্ষোভ, ঘৃনা, অস্থিরতা আনতে পারে। রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে জর্জরিত মানুষের এই সহনশীলতার এক ভয়ংকর কালপর্ব চলছে এখন গোটা বাংলাদেশ জুড়ে।।