Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশের গার্মেন্টসের দুঃসময় :: সুসময় যাচ্ছে ভারতের

বাংলাদেশের গার্মেন্টসের দুঃসময় :: সুসময় যাচ্ছে ভারতের

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-cartoon-6বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রফতানির ক্রয় আদেশ কমে গেছে। আগামী বসন্তকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোতে রফতানির ভরা মৌসুম চলছে। তারপরও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রফতানির আদেশ কমছে। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে আগের বছরের অক্টোবরের তুলনায় এ খাতে রফতানি আদেশ ৩০ শতাংশ কমেছে বলে জানা যাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে রফতানি আদেশ এভাবে কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে সংশ্লিষ্ট খাতের রফতানিকারকরা বলছেন, ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দরপতন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ক্রমাগত শ্রমিক অস্থিরতা, শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা, রাজনৈতিক সহিংসতা প্রভৃতি কারণে রফতানি আদেশ কমে যাচ্ছে। রফতানিকারকরা বলছেন, বিদেশী ক্রেতারা ধরে নিয়েছেন আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এ বছর আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার উন্নতি হবে না। এ কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ না পাওয়ার আশঙ্কায় তারা অন্য দেশের দিকে ঝুকে পড়ছেন। এছাড়া পোশাক খাতে ক্রমাগত শ্রমিক অস্থিরতায় তারা বাংলাদেশের প্রতি নিরাশও হয়ে পড়ছেন। ফলে ক্রেতারা বাংলাদেশ ত্যাগ করে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশ নিট গার্মেন্টস উৎপাদন ও রফতানিকারক সংগঠনবিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশী ক্রেতারা ধরে নিয়েছেন এ বছর আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। এ কারণে অনেক ক্রেতা বাংলাদেশে তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমদানি করা কাঁচামাল বন্দর থেকে কারখানায় সরবরাহ করা থেকে শুরু করে তৈরি পণ্য জাহাজীকরণ পর্যন্ত অন্তত ৪২টি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এর কোন একটি চেইন অচল থাকলে বা সমস্যা থাকলে পণ্য যথাসময়ে রফতানি করা সম্ভব হয় না। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রাথমিক হিসাবমতে আমাদের কারখানাগুলোতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ রফতানি আদেশ অন্য দেশে চলে গেছে। তিনি বলেন, আমার নিজের কারখানাও একই অবস্থার শিকার। তিনি জানান, গত বছর চীন ১৭০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। এ বছর চীনের ১০ শতাংশের বেশি রফতানি কমে গেছে। চীনের রফতানি ১০ শতাংশ কমে গেলেও সেটা বাংলাদেশে আসেনি। এ রফতানি আদেশ ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে গেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পোশাক পণ্যের রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ২৫৩০ শতাংশ। পোশাক খাতে ভারতের মূলধনী যন্ত্রের আমদানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। বার্তা সংস্থাটি জানায়, ভারত খুব শিগগিরই পোশাক রফতানিতে বড় ধরনের সাফল্য দেখাতে সক্ষম হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সাম্প্রতিকালে পোশাক খাতে রফতানি আয় কমেছে। এ খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ অনেক হ্রাস পেয়েছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে বস্ত্র ও পোশাক রফতানিতে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছিল ভারত। তবে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে আবারো তৃতীয় অবস্থান নিশ্চিত করেছে দেশটি। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের। মার্কিন বাণিজ্য দফতরের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) দেয়া তথ্যানুযায়ী, দুর্বল রুপি ও চাহিদা বাড়ার কারণে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকের রফতানি ৩৭৩ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এক নম্বর অবস্থানে চীন। এর পরই ভিয়েতনাম।

জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাক আমদানি বেড়েছে ৩ শতাংশ। ডলারের হিসাবে, এ সময় সেখানে ভারতের রফতানি বেড়েছে ৪ শতাংশ। রফতানি প্রবৃদ্ধিতে তৃতীয় অবস্থানে আছে দেশটি। ভারতের মোট ৩৭৩ কোটি ডলারের পণ্যের রফতানির মধ্যে তৈরি পোশাক ২০০ কোটি ডলারের। বাকি ১৭৩ কোটি ডলার বিভিন্ন হোম টেক্সটাইল ও বস্ত্রের। এ সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

ভারতের বস্ত্র ও পোশাক রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ)। পাঁচ বছর ধরে এ বাজার দুটোয় তাদের রফতানি প্রবৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রাখছে হোম টেক্সটাইল। চলতি বছরে মূল্য সংযোজিত তৈরি পোশাকের রফতানি বাড়ার বিষয়টি ইতিবাচক লক্ষণ বলে মনে করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা। ২০১২ সালের প্রথম নয় মাসে মার্কিন বাজারে ভারতের রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমে ৪৫৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ দশ রফতানিকারকের মধ্যে ভারতই সবচেয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। প্রতিযোগী বাংলাদেশের রফতানিও কমে গিয়েছিল। তবে ভারতের তুলনায় কম। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনামের রফতানির পরিমাণ ছিল ৫৭৪ কোটি ডলার। পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০১২ সালের প্রথম নয় মাসে তাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

একই সময় চীনের রফতানি শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৫৩ কোটি ডলারে স্থির ছিল। এখনো প্রবৃদ্ধি খুব না বাড়লেও শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে চীন। এদিকে ইউরোপের বাজারে রফতানিতে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে আছে ভারত। অবশ্য দুটি দেশই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে কমবেশি শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে।

প্রতিযোগিতার সক্ষমতার জোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে ভিয়েতনাম ও চীন। চীনের রফতানি প্রবৃদ্ধি তেমন না হলেও প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের রফতানি ৫১০ গুণ বেশি। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ এখনো তাদের বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা করে যাচ্ছে কমবেশি সফলতার সঙ্গে। সার্বিকভাবে বস্ত্র ও পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধিতে দেশ দুটির তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও হোম টেক্সটাইল ভারতের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়েছে।

তৈরি পোশাক রফতানির বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। আগেরবার পঞ্চম স্থানে থাকা তুরস্ক ভারতকে হটিয়ে উঠে এসেছে চতুর্থ স্থানে। দেশটির রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪২৮ কোটি ডলার। গত বছর পোশাক রফতানির শীর্ষ তালিকায় ভারত দুই ধাপ পিছিয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রফতানিকারক শীর্ষ ১৫টি দেশের হিস্যা এখন ৮৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে গত বছরটি বেশির ভাগ রফতানিকারকের জন্য সুবিধাজনক হয়নি। বিশেষ করে আগের দুই বছর যেখানে এই বেশির ভাগ দেশই তৈরি পোশাক রফতানিতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, সেখানে ২০১২ সালে এসে আটটি দেশেরই প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেতিবাচক। আবার যারা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় আছে, তাদের কেউই দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। কম্বোডিয়া ৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে। বাংলাদেশ ও চীনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশ হারে। আর তুরস্কের ২ শতাংশ।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অংশ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ২০১২ সালে বিশ্বে মোট পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর ২০১৩ সালে তা সামান্য কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস২০১৩’ দলিল থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ২০১২ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে তৈরি পোশাক রফতানি বাজারের পরিসংখ্যানও আছে। অবশ্য রফতানিকারক হিসেবে তালিকায় তৃতীয় স্থানটি অটুট রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি দেখানো হয়েছে এক হাজার ৯৯৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগেরবারও প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারের রফতানি ছিল।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে বিশ্ব রফতানি বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের হিস্যা ছিল ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ২৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ। এর ফলে ২০০৯ সালের পঞ্চম অবস্থান থেকে ২০১০ সালে বাংলাদেশ উঠে আসে তৃতীয় স্থানে। আর ২০১১ সালে ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্ববাজারে অংশীদারি বেড়ে হয়েছিল ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ২৭ দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) দেখানো হয়েছে ডব্লিউটিওর পরিসংখ্যানে। ইইউর হিস্যা অবশ্য বেশ কমে গেছে। ২০১১ সালের ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে ২০১২ সালে নেমে এসেছে ২৫ দশমিক ৮০ শতাংশে। আগেরবারের ষষ্ঠ স্থানে থাকা ভিয়েতনাম ভারতকে পেছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। ২০১২ সালে ভিয়েতনামের পোশাক রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলার। আর ভারতের রফতানি এক হাজার ৩৮০ কোটি ডলার। বলা যায়, গত বছর পোশাক রফতানির শীর্ষ তালিকায় ভারত দুই ধাপ পিছিয়ে গেছে। আগেরবারের ৩১ শতাংশ হারে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি থেকে ২০১২ সালে তা নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে এসেছে। রফতানি কমেছে ৬ শতাংশ। বিশ্ববাজারে হিস্যাও আগেরবারের ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।

সদ্যপ্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গেল বছরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানিতে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ। এ সময়ে ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি ১৭ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তারা চতুর্থ বৃহৎ তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশ হয়েছে। চীন এখনো শীর্ষে অবস্থান করছে। এতে বাংলাদেশের রফতানির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সাভারের রানা প্লাজা ধসসহ শ্রমিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এটি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।।