Home » রাজনীতি » যেই লাউ সেই কদু :: মহাজোটের সর্বদলীয় সরকার

যেই লাউ সেই কদু :: মহাজোটের সর্বদলীয় সরকার

আবীর হাসান

ershad-hasina-3সময় আর গণতন্ত্র পরস্পরের নির্ভরতায় পথ চলে। কোন কোন সময়ে নয় সব সময়ে। তবে কোন কোন সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সময় মতো গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়গুলো। বাংলাদেশের এখন সময় হাতুড়ি পেটাচ্ছে গণতন্ত্রের ঘাড়ে বলছে, ‘হয় থাকো না হয় ভাগো।’ এদেশে গণতন্ত্রের যারা কুশীলব তারা যদি তাদের জ্ঞানে এই মেসেজ না পেয়ে থাকেন তাহলে বলতে হবে আবার স্বৈরাচারী শাসকের হাতে নিয়েই ফেলবেন তারা দেশের মানুষকে যার থেকে পরিত্রাণ পেতে আগামীতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।

কথা হচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য ‘টাইম ফ্রেমের’ বিষয়টা নিয়ে, সময় আসলে যে কাজগুলো করতে হবে তা বলা না বলা, সংবিধানে লেখা না লেখার তোয়াক্কা করে না। সংবিধানে যা লেখা থাকে তার বাইরেও করতে হয় অনেক কিছু যাকে বলা হয় ‘জেন্টেলমেন এ্যাক্ট।’ যেমন নির্বাচন সামনে এলে সংসদসরকার ভেঙে দিতে হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি নাও গঠন করেন তাহলেও ভেঙে দিতে হয় এবং তা ৯০ দিন আগে, তারপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে সংবিধানের ১২৩এর ৩ অনুচ্ছেদে এমনটিই উল্লেখ ছিল। কিন্তু সবকিছু ওলোটপালোট করে দিয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনী এবং এটি করাও হয়েছে ওই ওলোটপালোটটাকে বৈধতা দেয়ার জন্য। এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানে এখন লেখা নেই বলে যা বলা হচ্ছে তা আসলে অগণতান্ত্রিক। টাইম ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যাওয়াতেই ঘটছে এটা। এখন সংবিধান পড়ার নসিহত করলেও দেশের মানুষ বুঝে গেছে একটা অবৈধতার তকমা ঝুলিয়ে ফেলেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং যে প্রক্রিয়ায় ‘ছোট সরকার’ গঠিত হয়েছে তাও হয়ে গেছে প্রশ্ন সাপেক্ষ। আরো লক্ষণীয় আকলমন্দ যে সব মন্ত্রী এবং আমলা রয়েছে তারা সবাই বলছেন এই মন্ত্রিসভায় পরেরটায় তাদের দায়িত্ব পালন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। যে মন্ত্রীরা মন্ত্রিসভায় নেই তাও হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। যে মন্ত্রীসভা গঠিত হয়েছে তাও হবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। এই মন্ত্রীসভা সর্বদলীয় না দলীয় হবে, তাও হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। এবং আরও বড় ব্যাপার যে সময়ে তা হয়েছে এবং তার মেয়াদ কতদিন হবে তারা বৈঠক করবেন কি করবেন না তাও হবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। আরও কিছু প্রশ্ন তাহলে চলে আসে ওই মন্ত্রীসভা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করবে কিনা কিংবা শুধু নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করবে কিনা সেটাও প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় হবে নাকি নিয়মানুযায়ী হবে? এখানেও সময়ের প্রশ্ন আছে। আছে নৈতিকতার প্রশ্নও। তার ওপর বলা হচ্ছে ওটা নাকি হয়েছে সর্বদলীয় মন্ত্রীসভা। কিন্তু জটিলতা হল সর্বদলীয় হলেও তা হওয়ার কথা ছিল সব দলকে নিয়েই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, যেই লাউ সেই কদু। অর্থাৎ যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটা কোনক্রমেই সর্বদলীয় নয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সরকার।

এখন প্রশ্ন তাহলে এত নির্বাচিত সদস্য পাওয়া নিয়ে। উপরন্তু আওয়ামী লীগের হোক বা অন্য দলের হোক সবারই তো মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যুক্তির কথায় আসলে তারা আর নির্বাচিত থাকেন না। সময় পার হয়ে গেলেও সংসদ ভেঙে দেয়া হয়নি, সেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মারপ্যাচেই। তাদের গায়ের জোরের যুক্তি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সংসদের মেয়াদ শেষ, গণতন্ত্রের নিয়ম বলছে, ওটা অকার্যকর মেয়াদোর্ত্তীন। তাহলে মহাজোটের মন্ত্রীসভাটি গঠন করে সমঝোতার যে সামান্য পথটুকু খোলা ছিল তাও আটকে দেয়া হলো কেন? অনেকে বলছেন, যদি সংসদ তার মেয়াদ শেষ করে নির্বাচনের আগে কোনো মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, তাতো হতে হবে নির্বাচনকে সামনে রেখে। তাদের কর্তৃত্বও থাকবে ততটুকু। কিন্তু বাস্তবে তা তো দেখা যাচ্ছে না।

আরও অনেক বড় বড় প্রশ্নও এখন তাহলে উঠবে। এই মন্ত্রীসভা বা সরকারকে পেছন থেকে সাপোর্ট দিচ্ছে কে বা কারা? তারা কতদিন ক্ষমতায় থাকবে? তারা কবে নির্বাচন করবে? কেমন হবে নির্বাচন তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হল গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে কবে হবে নির্বাচন?

যে সময়ের কথা বলা হয়েছিল অর্থাৎ জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে সেই সময়ে কি নির্বাচন হওয়ানো যাবে? ওই সময়ে নির্বাচন করলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। সেই নির্বাচনটাই বা কবে হবে? প্রধানমন্ত্রী কবে ইচ্ছা করবেন? নাকি নতুন তারিখে হবে? আপাতত প্রধানমন্ত্রীর সামনে দেখা যাচ্ছে একটাই সমস্যা তার ইচ্ছার নির্বাচন করা। এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্যতার কথা চিন্তা করছেন বলেই দেরি করছেন বা টাইমফ্রেম মানছেন না তিনি এটা ধরেই নেয়া যায়। আর এসব ব্যাপারে অন্য কেউ মাথা ঘামাচ্ছেন বলেও মনে হয় না। কারণ সবার সব চিন্তা ঝেড়ে তারিখহীন পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর দিকেই সমস্ত দায়দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। আর তাই একলাই চলতে হবে এখন প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্তও তাকেই নিতে হবে। মন্ত্রীসভায় সর্বদলীয় লোক যে পায়নি তা দেখাই যাচ্ছে। পুরোটা তার ইচ্ছামাফিক হয়নি। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিএনপি বাদ দিয়ে যে নির্বাচন হবে সেটাই বা কবে হবে এক্ষেত্রেও কি টাইমফ্রেম ভাঙবেন?