Home » রাজনীতি » রাজনীতিতে চূড়ান্ত জুয়া খেলা :: ঘুড়ি এখানে নাটাইটা বাইরে

রাজনীতিতে চূড়ান্ত জুয়া খেলা :: ঘুড়ি এখানে নাটাইটা বাইরে

পীর হাবিবুর রহমান

gamblingসকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের দেশিবিদেশি দাবিকে উপেক্ষা করে একটি একতরফা নির্বাচনের পথে চুড়ান্ত হাটা দিল সরকার। আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনও সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিতে সংসদ নির্বাচন ঘিরে রীতিমত জুয়া খেলার চুড়ান্ত পর্ব চলছে। সরকার ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র মধ্যে সমঝোতা না হলে এবং সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দুয়ার না খুললে এই জুয়া খেলার পরিণতি শুধুমাত্র জনগণকেই নয়, রাজনৈতিক শক্তিকেও দিতে হতে পারে। সর্বশেষ মার্কিন সহকারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিশা দেশাই ঢাকা সফরকালে বলে গেছেন সকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা। এর আগে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনার পঙ্কজ শরেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদেরও আলাপআলোচনা চলছে। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনার বাসভবনে সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের বৈঠক কিংবা তার দিল্লী থেকে ওয়াশিংটন সফর বাসি খবর হলেও তার তাৎপর্য রয়েছে। এমনকি এদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে চীনের রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য কিংবা পশ্চিমাদের দৌড়ঝাপ কোনটাই গুরুত্বহীন নয়। দেশের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির পর্দার অন্তরালের খবর যারা রাখছেন তাদের অনেকেই মনে করেন ঘুড়ি এখানে উড়লেও নাটাইটা দেশের সীমানার বাইরে রয়ে গেছে।

মহাজোট সরকারের প্রধান অংশীদার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ শেষ বয়সে দালাল হয়ে মরতে চান না, সকল দল না এলে নির্বাচনে যাবেন না বলে চুড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার সপ্তাহ পার হতে না হতেই দেখা গেল অবস্থান বদলে যেতে। সরকার শুরু থেকে বলে আসছিল সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হবে জাতীয় নির্বাচন। সেখানে বিএনপি’র সঙ্গে আলোচনাসমঝোতা না করেই শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদকেই টান দিয়েছে সরকার। মাঝখানে সর্বদলীয় সরকারের নামে নির্বাচনকালীন মহাজোট সরকারে এরশাদের জাতীয় পার্টি হাতিয়ে নিল তিনটি ফুল ও দুইটি হাফ মন্ত্রী। সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা। জিএম কাদেরতো বহাল আছেনই। সারাদেশে কথার বরখেলাপ করায় সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন আবার এরশাদ। আর শেষ মূহুর্তে তার মন্ত্রীত্বের আনন্দে বিভোর দলের এইসব নেতারা মিষ্টি বিতরণ করছেন। পাঁচ বছর অবহেলায় থাকলেও শেষবেলায় মন্ত্রীত্বের ভাগাভাগিতে জাতীয় পার্টির জয়জয়কার। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরে একাংশ যারা জনমতের দিকে তাকিয়ে এরশাদকে সরকার বিরোধী অবস্থানে দেখতে চেয়েছিলেন তারা হতাশ, ক্ষুব্ধ। জাপা’র নাটকের শেষ দৃশ্য দেখার এখনো অনেক বাকি। এদিকে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন ও আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রশংসিত হয়েছিলেন। শেষবেলায় গ্রহণ করে মানুষকে বিষ্মিত করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতা আমির হোসেন আমুরও মন্ত্রীত্ব লাভ নেতাকর্মীদের স্বরণ করিয়ে দিচ্ছে দলের মরহুম দুই সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ও আবদুল জলিলের কথা। বেঁচে থাকলে তারাও মন্ত্রীত্বের এই শপথ অনুষ্ঠানে মঞ্চে শোভিত হতেন। শেষ পর্যন্ত নামে সর্বদলীয় সরকার হলেও কাজে মহাজোট সরকারই পুনর্গঠিত হল যেখানে জাতীয় পার্টির হিস্যা বাড়ল। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যা বাহান্ন তাই তেপ্পান্ন। এতে জাপা নেতারা লাভবান হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে জাতীয় পার্টির লোকসানের পাল্লাই ভারী হল। সকালে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা, বিকালে শপথ গ্রহণ এরশাদের দ্বৈত নীতি সামনের জাতীয় নির্বাচনে তার পার্টিকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিল। বিএনপি নির্বাচনে চলে এলে এরশাদ কোথায় যাবেন? আর বিএনপি একতরফা নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিলে ময়দানে এরশাদের পার্টির প্রার্থীদের ঝড়ো হাওয়ার মুখে পতিত হতে পারে। সব মিলিয়ে সমস্যা সংকট কমছে না, বাড়ছে।

বিএনপিজামায়াত শাসনামল থেকে আওয়ামী লীগ জোটের রাজনীতির তুরুপের তাস ছিলেন বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া পুত্র নির্বাসিত তারেক রহমান। দুর্নীতির বরপুত্র বলে তাকে সমালোচনায় আর অভিযোগে বার বার আওয়ামী লীগ জোটের টপ টু বটম ক্ষত বিক্ষত করে আসছিলেন। দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিল ওয়ানইলেভেন আমলে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের হয় এই সরকারের আমলে। এফবিআই’র লোকজন এসে সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন অর্থ পাচার মামলায়। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও বার বার মুখ খুলেছেন। কিন্তু, শেষ মূহুর্তে বিএনপি ও তার আইনজীবীদের পর্যন্ত চমকে দিয়ে আদালত তারেক রহমানকে নির্দোষ প্রমান করে দিয়েছে। সরকারপক্ষ এই রহস্যের কিনারা পাচ্ছেন না। বিএনপিও তাজ্জব বনে গেছে। ভোটের রাজনীতিতে যে তাস ছিল আওয়ামী লীগ জোটের হাতে সেই তাস এখন বিএনপি জোটের হাতে। বিএনপি এবার সেই তারেক রহমানের এই ইস্যু নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা ও অপপ্রচারের এমনকি মানহানির অভিযোগ এনে জনতার দুয়ারে যাবার সুযোগ পেল। এর বাইরে ইস্যু অনেক রয়ে গেছে বিরোধী দলের হাতে। দেশের নয়টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিশেষ করে সর্বশেষ পাঁচটির ফলাফল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলকে জানিয়ে দিয়েছে সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে। উন্নয়নের চিত্র যাই হোক জনমত এখন বিএনপি’র দিকে। যারা বলছেন সরকারের পক্ষে জনমত ফিরছে তারা প্রমাণ দিতে পারছেন না, কারন গাজীপুরের পর আর কোন এসিড টেস্ট হয়নি। সেই এসিড টেস্ট হবে জাতীয় নির্বাচনে। সেখানেই বিএনপি খুঁজছে লেভেল প্লেইং ফিল্ড। আর সরকার খুজছে বিএনপিকে বাইরে রাখার পথ। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করা যেমন কঠিন তেমনি সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করাও সহজ নয়। কারণ, কেউ পরাজিত হতে রাজি নন। এমনি পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতির জুয়া খেলার শেষ পরিণতি কোথায় দাড়ায় তা দেখতে নভেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহে ঘোষিত নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ি ১০ জানুয়ারির মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের সময়কালীন কী ঘটতে যাচ্ছে তার অপেক্ষায় সবাই।।