Home » রাজনীতি » এ জাতির দীনতা-হীনতা এবং সংকীর্ণচিত্ততা

এ জাতির দীনতা-হীনতা এবং সংকীর্ণচিত্ততা

ফ্লোরা সরকার

bhasani 7ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ প্রতিটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং পরবর্তীতেও জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের বিভিন্ন অভিধায় অভিহিত হতে দেখি, যেমন মহাত্মা, কায়েদে আযম, শেরেবাংলা, বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী, দেশনেত্রী ইত্যাদি। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী একমাত্র ব্যতিক্রম জাতীয় নেতা যাকে আমরা ‘মজলুম নেতা’ নামে অভিহিত করে থাকি। মজলুম অর্থ মজুর, শ্রমিক, খেটেখাওয়া মানুষ, অতিশয় দরিদ্র বা সমাজের প্রান্তিক মানুষ। মওলানা ভাসানী সারাজীবন একটি শ্রেণীর রাজনীতি করেন আর তা হলো নির্যাতিত এই খেটে খাওয়া মানুষদের রাজনীতি। ১৮৮৫ সালে জন্মগ্রহণ করা এই মহান নেতার রাজনৈতিক জীবন আসামে শুরু হলেও ১৯৪৭ সালে, ভারতপাকিস্তান স্বাধীন হলে, একই বছরের নভেম্বর মাসে পাকাপোক্তভাবে পূর্ববাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন। আসামে অবস্থান কালে ১৯২৪ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ভাসান চরে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত কৃষকদের নিয়ে তিনি একটি সম্মেলন করেন। ভাসান চরের মওলানা হিসেবেই ভক্তদের দ্বারা ‘ভাসানী’ নামে পরিচিত হন, যে নামটি শেষ পর্যন্ত তার নামের অচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে এক পর্যায়ে মূল নামকে ছাড়িয়ে যায়। ভাসান চরের সেই ভাসানী যে কৃষককূলকে নিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত্ত পর্যন্ত সেই নির্যাতিত শ্রেণীর রাজনীতিতে অটল বিশ্বাস রেখেছিলেন। আমাদের জাতীয় পর্যায়ে এই রকম নেতা সত্যি বিরল। অথচ স্বাধীনতার একচল্লিশ বছরেও আমরা এই মহান নেতাকে নিয়ে কোন প্রামাণ্য চিত্র পর্যন্ত নির্মাণ করতে পারিনি। এটা একটা জাতীর জন্যে কতটা অবমাননাকর তা বলাইবাহুল্য। আমরা আমাদের জাতীয় পর্যায়ের নেতানেত্রীদের শুধু অসম্মানই করি না, বিস্মৃতও হয়ে যাই। একজন মওলানা ভাসানীকে নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র শুধু নিছক একটি প্রামাণ্য চিত্রই নির্মাণ নয়, সেই সঙ্গে একটি ইতিহাস নির্মাণ।

মহান এই রাজনীতিক নেতার সুবিশাল কর্মময় জীবনের আলোচনা এই স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব না হলেও, তার জীবনের বিশেষ কিছু উল্লেখযোগ্য দিকগুলো আমরা লক্ষ্য করলে তার রাজনৈতিকদর্শন, জীবনাদর্শনের কিছুটা আঁচ হয়তো করতে পারবো। যেসব দিকগুলো আমাদের অনুপ্রেরণা দিতে পারে তার সম্পর্কে আরো গভীর ভাবে জানার, দেখার, উপলব্ধি করার, যে উপলব্ধি ভবিষ্যতে তার জীবনদর্শন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করবে। ভাসানীর রাজনীতির মূল প্রত্যয় নির্যাতিত মানুষের সঙ্গে একাত্মতা এবং পদ্ধতি আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায় করা। নির্বাচিত একজন সাংসদ হিসেবে ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের অধিবেশনে তিনি বলেন – “— জমিদার স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যে হাওয়া খাইতে মজবুত, কিন্তু প্রজার জন্যে মোটেই চিন্তা করেন না। তাই বলিতেছি, প্রজাকে সম্পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে। প্রজা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটিয়া জমির উন্নতি করিয়াছে। প্রজাই প্রকৃত মালিক। জমির উপর তাহাদের সম্পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত” (সৈয়দ আবুল মকসুদ, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৪, পৃ : ৪৩)। মুসলিম লীগের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ভাসানীকে সভাপতি করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে (পরবর্তীতে ‘মুসলিম’ শব্দটি কেটে, শুধু ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়)। সরকারবিরোধী আন্দোলন করার ফলে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিরোধী দলের প্রধান দাবি ছিলো নির্বাচনের জন্যে। দাবির চাপে ১৯৫৪ সালের মার্চে নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলে ফজলুল হক, ভাসানী, শহীদ সোহরায়ার্দী এবং আরো কয়েকজন নেতা সহ যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। নির্বাচনে বিপুল ভোটে ফ্রন্ট জয়ী হয়। একই বছর নভেম্বরে সুইডেনের স্টকহোমে শান্তি সম্মেলনে ভাসানী আমন্ত্রিত হয়ে যান। এই দেশের তিনিই প্রথম নেতা যিনি আন্তর্জাতিক কোন সম্মেলনে বাংলা ভাষায় বক্তব্য রাখেন। শুধু তাই নয়, সেখানে তিনি বলেন – “সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস কপটতার ইতিহাস। সকল মানুষকে সকল কালের জন্যে সে ইতিহাস প্রবঞ্চিত করতে পারেনা বটে কিন্তু সাময়িকভাবে হলেও সাম্রাজ্যবাদ বিভিন্ন দেশে কতিপয় ভাড়াটে সমর্থক যোগাড় করতে সমর্থ হয়। তাদের সে সমর্থন যোগায় শাসকমহল, স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল। —- ইসলাম আমার ধর্ম। ইসলাম আমার দর্শন। ইসলাম আমার সাধনা। আর সে ইসলামের উৎপত্তি আরবী শব্দ ‘সলম’ থেকে, যার অর্থ শান্তি।” ভাসানী জানতেন কীভাবে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়। আর তাই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী একটি অংশ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ পরিচালিত যুদ্ধজোটগুলিতে অংশগ্রহণ করলে ১৯৫৭ সালের ২৫২৬ জুলাই ‘নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মীসম্মেলন’ থেকে গঠন করেন ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (সংক্ষেপে ন্যাপ)। ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ এর শ্লোগানের মতো ভাসানীর শ্লোগান ছিলো – ‘জাল যার জলা তার’। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান, যে অভ্যূত্থান পাকিস্তান সরকারকে স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে নিতে বাধ্য করেছিল সেই গণঅভ্যূত্থানের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন মওলানা ভাসানী। যে অভ্যূত্থানের শেষ ফলাফল ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দুটো স্বাধীনতার সময়ে অর্থাৎ ১৯৪৭ এর পাকিস্তানের স্বাধীনতা এবং ১৯৭১ এর বাংলাদেশ স্বাধীনতা এই দুই সমেয়ই তাকে আমরা অন্তরীণ অবস্থায় পাই। পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময়ে তিনি ছিলেন আসামের জেলে, সেই বছর নভেম্বর মাসে মুক্তি পেয়ে পূর্ববাংলায় চলে আসেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ এর ২২ জানুয়ারী ভারতের মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে স্বাধীন দেশে পদার্পণ করেন।

স্বাধীনতার পর তার প্রকাশিত “হক কথা’ সাপ্তাহিক পত্রিকাটি ভীষণ ভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘হক কথা’র প্রথম সংখ্যাটিতেই (২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২) আমরা দেখি, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনচেতা সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি?’ বড় শিরনামে একটি লেখা। সেখানে বলা হয় “স্বাধীনচেতা সরকারের বৈশিষ্ট্য হয় তিনটি প্রথমত: সরকারের প্রতিটি সদস্য হয় চরিত্রবান। কোন প্রকার দুর্নীতি তাদের পেয়ে বসে না। নীতির জন্যে তারা যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। —-দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য নির্ভেজাল জাতীয়তাবোধ। নির্ভেজাল বলতে হয় এইজন্যে অধিকাংশ জাতীয়বাদী সরকার জনগণকে ধোকা দিয়ে থাকে। জাতীয়তাবোধের আফিমে জনগণ সরকারের উপর মাত্রাতিরিক্ত আস্থাবান হয়। সরকার এর সুযোগ গ্রহণ করে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। তৃতীয়ত : স্বাধীনচেতা সরকার দেশ ও জাতিকে গতিশীল মত ও পথের সন্ধান দিয়ে থাকেন। সেই সরকার জাতির গতিকে অস্বীকার করে সঙ্কীর্ণতা ও কুপমন্ডুকতায় মজে যেতে পারেনা। জনগণ স্বতস্ফূর্ততার সাথে যা চায় সেই সরকার তাই মেনে নেন”। কতটা দূরদর্শী নেতা হলে পরে স্বাধীনতার অব্যবহতি পরেই এই দেশের ভবিষ্যত দেখতে পেয়েছিলেন, তা তার প্রকশিত হক কথার প্রথম সংখ্যা থেকেই আমরা তা অনুমান করে নিতে পারি। শুধু তাই নয়, ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি যেমন ভবিষ্যত দেখেছিলেন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ এর, যে সম্মেলনে পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ উক্তিটি ইতিহাস খ্যাত হয়ে আছে আজো, যে সম্মেলনে তিনি সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন – “ইতিহাস সাক্ষী, কোন দেশের জনসাধারণ কোন কালেই ভুল করেনি” ঠিক তেমনি স্বাধীনতা উত্তরকালে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন আজকের অর্থাৎ ২০১৩ সালের দুর্নীতিগ্রস্ত, নীতিবর্জিত, ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির বাংলাদেশকে। ‘হক কথা’র ১৭ মার্চ, ১৯৭২ সংখ্যায় আমরা দেখি সাম্প্রদায়িকতার নতুন এক বাস্তব সংজ্ঞা – “—পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মের আগে একজন বাঙালি দরিদ্র মুসলমান অত্যাচারী হিন্দু জমিদারের হাতে নিগৃহিত হতো, তখন সে জমিদারকে শুধু হিন্দু হিসেবেই দেখেছে, প্রত্যেক জমিদারই যে অত্যাচারী এই শিক্ষা সে পায়নি। সে নিজের দুর্দশার জন্য জমিদার শ্রেণীকে দায়ী না করে, দায়ী করেছে হিন্দু ধর্ম ও সম্প্রদায়কে। পাকিস্তান হাসিলের পর হিন্দুর বদলে যখন মুসলমান জোতদার, ব্যবসায়ী কারখানার মালিকের স্থান দখল করলো তখনও জনগণের দৃষ্টি ঘোলা করে রাখা হলো। বলা হলো, পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যবসায়ী, কারখানা মালিক ও আমলারা শোষণ করছে বাঙালিদের। আসলে সকল জমিদার জোতদার ব্যবসায়ী শ্রেণী এক সে হিন্দুই হোক, পশ্চিম পাকিস্তানি হোক আর বাঙালি হোক, এই সত্য কথাটা সত্য করে বলা হয়না। তাহলে বাঙালি আর বাঙালিকে শোষণ করতে পারবে না। গরীব বাঙালি, ধনী বাঙালির ভাওতাবাজিতে আর ভুলবে না”। সমাজের শোষণ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যেই যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছলছুতোর মোড়কে একই শোষক শ্রেণীর উপস্থিতি থাকে, সেসব সম্পর্কে ভাসানী আমাদের দৃষ্টি স্বচ্ছ করেন। এভাবে ‘হক কথা’র মাধ্যমে যখন জনগণের দৃষ্টি খুলে যাচ্ছিলো ঠিক তখন একই বছর ২২ সেপ্টেম্বরের পরে পত্রিকাটি অকস্মাৎ বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালে আবার বের হলেও ভাসানীর মৃত্যুর পর খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি।

ফারাক্কার প্রভাব কতটা সর্বগ্রাসী হতে পারে অনুমান করে ৯৬ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে তিনি ফারক্কা অভিমুখে লং মার্চ করেছিলেন। একই বছর ১৭ নভেম্বর এই মহান নেতা আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যান। কিন্তু রেখে যান তার নির্দেশিত ও প্রদর্শিত পথ। যে পথের সন্ধান তার মতো বড় মাপের খুব কম নেতাই পেয়েছিলেন।

১৭ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। যে সময়টি অবিভক্ত ভারতসহ, স্বাধীন পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের এক দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের চিত্র আঁকা আছে। যে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আজকের বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানকে অনেক লড়াই, অনেক রক্ত ঝরিয়ে আসতে হয়েছে। তাই লেখার শুরুতে বলেছিলাম, মওলানা ভাসানীর উপর প্রামান্যচিত্র নির্মাণ নিছকই একটি প্রামাণ্যচিত্র নয়, তা নির্মিত হলে তা হবে এই দেশের, এই মাটির ইতিহাস নির্মাণ। আর সেই কাজটি যদি আমরা এখনো না পারি তাহলে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের ভাষায় বলতে হবে – “এ দেশে বীর নেই, শহীদ রয়েছে শুধু”।।