Home » রাজনীতি » এক কৃষ্ণ গহবরে দেশ

এক কৃষ্ণ গহবরে দেশ

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-27গত সোমবার রাতে রেডিওটেলিভিশন ভাষণে সিইসি’র নির্বাচনী তফসিল ঘোষনা আকষ্মিক না হলেও প্রত্যাশিত ছিল না। কারন, রোববার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে দু’দলের সমঝোতার ব্যাপারে তিনি সামান্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। আশা করা গিয়েছিল, একটি সমঝোতার পরে তফসিল ঘোষিত হতে পারে। কিন্তু তফসিল ঘোষণার জন্য তার ওপরে চাপ প্রবলতর হচ্ছিল। তাই কি তড়িঘড়ি করে একদিন পরেই তফসিল ঘোষণা করে দেশকে কৃষ্ণ গহবরে ঠেলে দেয়া হলো? এখানে আমরা বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশীদের একটি ঐতিহাসিক রায়ের কথা আমরা স্মরন করতে পারি। রায়টি এখনো কার্যকর রয়েছে। সংবিধান মতে, ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সিইসি যে পরিমান গুরুত্ব আরোপ করেছেন তা ঐ রায় সমর্থন করে না। সমঝোতামূলক বা সকল দলের অংশগ্রহনমূলক সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উল্লেখিত রায়ে ৯০ দিনের সীমা পেরোনোর অনুমোদনটি রয়েছে। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা থাকলে দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থে সিইসি এটি অনুসরন করতে পারতেন। কিন্তু দৃশ্যত: তিনি তার পূর্বসুরী বিচারপতি কে এম সাদেক ও বিচারপতি এম এ আজিজের পথই অনুসরন করলেন।

২০০৭ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছিলেন, সেদিনটিও ছিল সোমবার। দিনটি কালো সোমবার হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছে। বর্তমান সিইসিও আরেকটি কালো সোমবারের সূচনা করলেন। এর মধ্য দিয়ে গোটা দেশ চূড়ান্ত অরাজকতার দিকে ধাবিত হতে পারে, এরকম কোন বিষয় তার কাছে আদৌ গুরুত্ব পায়নি। বনানী বৈঠকের বিষয়টি মির্জা ফখরুল অস্বীকার করায় সিইসি’র জন্য একটি সুযোগ তৈরী হয়ে গেল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর আগে সমঝোতা প্রশ্নে তিনি ২৪ জানুয়ারি’র পরেও নির্বাচন করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে কি রহস্যের কারনে তিনি ২৪ ঘন্টার মধ্যেই তফসিল ঘোষণা করলেন সেটি আগামীতে হয়তো জানা যাবে। কিন্তু জনগন বিশ্বাস করে, ক্ষমতাসীনদের চাপে, স্পষ্টত: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি এই তফসিল ঘোষণা করলেন! এটি ধীরে ধীরে পাবলিক পারসেপশনে পরিনত হতে যাচ্ছে।

এতদিন জনগন যেটি সন্দেহ করেছে, তাই এখন বিশ্বাসে পরিনত হতে চলেছে। অনেকেই সন্দেহ করেছিল ক্ষমতাকে স্থায়ী করা বা আগামী আরো একটি টার্ম ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ সকলের মতামত প্রায়ই উপেক্ষা করে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করেছিল। চরম অগোছালো এবং হতোদ্যম বিএনপি এর বিরুদ্ধে কোন ভূমিকা নেয়া তো দুরের কথা, রাজপথে জনগনকে সংগঠিত করে কখনই কোন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। সেই সময় থেকেই আওয়ামী লীগের ক্ষমতার পার্টনার জাতীয় পার্টির সঙ্গে মিলে বিএনপিকে বাদ দিয়ে একক নির্বাচনের একটি নীল নকশা প্রণীত হয়েছিল। পরবর্তীকালের ঘটনা পরম্পরা ও ধারাবাহিকতা এর স্বপক্ষে প্রমান দেয়। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি’র সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, এর পাশাপাশি সমান্তরাল কোন রাজনৈতিক কৌশল কিংবা জনগনকে সংগঠিত করে সরকারের জন্য কোন চাপ সৃষ্টি করতে না পারা। ফলে এই মূহুর্তে বাংলাদেশে ১৯৯৫১৯৯৬ সালের শেষের ও শুরুর মাসগুলো এবং ২০০৬২০০৭ সালের ভয়াবহ ও বিধ্বংসী সময়ের পুনরাবৃত্তি ঘটনো ছাড়া বিএনপির কোন বিকল্প থাকলো না।

এটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে বিধ্বস্ত হবার পরে আওয়ামী লীগ বিএনপির জন্য আর কোন সুযোগ রাখবে না। এরপরে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনপূর্বক যতগুলি জরিপ হাতে পেয়েছিলেন তাতে সম্ভবত: তিনি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন, নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে জিতে যাবে। প্রশাসন ন্যূনতম নিরপেক্ষ থাকলে, নির্বাচন কমিশন মোটামুটি নিরপেক্ষ থাকলে এবং সশস্ত্রবাহিনী নিয়োগ করা হলে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় অবধারিত। এক্ষেত্রেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে। ২০০৬ সালেও খালেদা জিয়া তার পরাজয়ের আগাম আভাস পাওয়ার কারনে নির্বাচন নিয়ে যেরকম মনোভাব পোষণ করতেন, শেখ হাসিনাও এক্ষেত্রে তার পূর্বসুরীর চেয়ে আরো কঠিন পথের অনুসারী হচ্ছেন বলে সকলেই মনে করছে।

২০০১ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহন করে শোচনীয় পরাজয় বরন করে। এরকম কোন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে আওয়ামী লীগ মোটেই প্রস্তুত নয়। সেজন্যই সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে একটি একক নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতা তারা নিশ্চিত করতে চাইছেন। তাতে দেশবাসীর কপালে যাই থাকুক না কেন, তার কোন তোয়াক্কা যে তারা করবেন না, সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, বিএনপিও ক্ষমতায় আসার বাসনায় আগামী দিনগুলিতে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির দিকে এগিয়ে যাবে, এটিও স্পষ্ট। ফলে, দেশ একটি একক নির্বাচনের দিকে যতই এগুবে ততই রক্তপাত, ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তেই থাকবে। জনগন অবশ্য এ আশংকাও পোষণ করে যে, যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হয়, তাহলে ক্ষমতাসীনরা তাদের দ্বিতীয় অপশনটিও কাজে লাগাবেসেই ওপেন সিক্রেটটিও সকলের জানা হয়ে গেছে পূর্বাপর অভিজ্ঞতায়।।