Home » আন্তর্জাতিক » নতুন মাত্রায় রুশ-ভারত সামরিক সম্পর্ক

নতুন মাত্রায় রুশ-ভারত সামরিক সম্পর্ক

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

india-russiaদৈত্যাকার বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রমাদিত্য হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক সম্পর্ক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করল। তবে তা কেবল ভারত রুশ গাঁটছড়ায় সীমিত থাকবে না, ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে আনাচেকানাচে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আর্কটিক বন্দর সেভোরোদভিনস্কে বিক্রমাদিত্যের হস্তান্তর অনুষ্ঠান হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি ও রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি রোগোজিন। এসময় অ্যান্টনি বলেন, এটা ‘ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।’

কিংবদন্তির রাজার নামে নামকরণ করা রণতরীটি আগামী বছরের প্রথম দিকে ভারতীয় নৌবাহিনীর হয়ে কাজ করা শুরু করবে। এই রণতরীটি সংগ্রহের ফলে ভারত এখন কেবল ভারত মহাসাগর নয়, প্রশান্ত মহাসাগরেও (চীন একে নিজের আঙিনা মনে করে) খবরদারি করতে পারবে।

ভারত পঞ্চম দেশ হিসেবে এ ধরনের রণতরীর অধিকারী হলো। এর আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের এ ধরনের রণতরী ছিল। এশিয়ায় ভারতই এখন দুটি বিমানবাহী রণতরীর অধিকারী (অপরটি যুক্তরাজ্যনির্মিত আইএনএস ভিরত। ১৯৮৭ সালে সংগ্রহ করা হয়েছিল)। এ দিক থেকে তারা চীনকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। চীনের বিমানবাহী রণতরী আছে মোটে একটি।

চুক্তি করার ১৩ বছর পর ভারত বিক্রমাদিত্য হাতে পেল। এ নিয়ে ২০০৪ সালের এপ্রিলে দুই দেশের মধ্যে প্রথম চুক্তি হয়েছিল। তখন এর দাম ধরা হয়েছিল ৭৭৫ মিলিয়ন ডলার (৪৮.৮২ বিলিয়ন রুপি)। এর আট বছর আগেই রাশিয়া এটি ডিকমিশনিং করেছিল। এখন বিক্রমাদিত্যের দাম পড়েছে ২.৩ বিলিয়ন ডলার (১৪ হাজার কোটি রুপি)। নৌবাহিনী সূত্রে জানা যায়, পুরো জাহাজের ক্যাবল, হালের বিরাট অংশ এবং এর মোটর, বয়লার, টারবাইনগুলো বদলানো হয়। এতে একদিকে খরচ যেমন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে, হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হতেও সময় লাগে অনেক বেশি।

রণতরীটিতে মিগ২৯কে ও ক্যামভ৩১ হেলিকপ্টার ব্যবহার করার জন্য দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে বোঝা যায়, অদূর ভবিষ্যতে ভারত এসব যান কেনার জন্য আরো কোটি কোটি ডলার ব্যয় করবে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে এটা ‘ভারতের এ যাবৎকালের বৃহত্তম রণতরী’ এবং ‘এ পর্যন্ত কেনা সবচেয়ে ব্যয়বহুল একক বৃহত্তম সামরিক প্লাটফরম।’

এতে ৩০টি রাশিয়ানির্মিত মিগ২৯কে এবং যুক্তরাজ্যের নির্মিত সি হ্যারিয়ার জঙ্গিবিমান এবং ক্যামভ, সি কিং, ধ্রুব, চেটাক হেলিকপ্টার বহন করা যাবে। এতে থাকা রাডারের মাধ্যমে রণতরীটির চারদিকের ৫০০ কিলোমিটার এলাকার ওপর নজরদারি করা সম্ভব হবে।

ভারতীয় নৌবাহিনী বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, দেশটির নৌবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৫৮ হাজার। এতে এখন দুটি বিমানবাহী রণতরী, একটি উভয়চর পরিবহন ডক, আটাটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রোয়ার, ১৫টি ফ্রিগেট, একটি পারমাণবিক সাবমেরিন, ১৩টি সাধারণ সাবমেরিন, ১৫টি করভেট, ৩০টি টহল নৌযান, সাতটি মাইন বিধবংসী নৌযান এবং বেশ কিছু সহায়ক জাহাজ রয়েছে।

ভারত ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে জোরদার হওয়ার একটি মাইলফলক ছিল এই রণতরী। আকার কিংবা লক্ষ্যবিন্দুর দিক থেকে মস্কোর অস্ত্র রফতানি এবং ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নজিরবিহীন। গত ১০ বছরে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প ভারতে ২১.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামগ্রী রফতানি করেছে (পরিমাণটি রাশিয়ার মোট প্রতিরক্ষা রফতানির ৩১ শতাংশ)। এর কাছাকাছি রয়েছে কেবল চীন (রফতানির পরিমাণ ১৯.৮ বিলিয়ন, ২৯ শতাংশ)। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনে রফতানি অনেকাংশে কমে গেছে, আর ভারতের বেড়েছে। ভারতের মোট প্রতিরক্ষা আমদানির ৭৫ শতাংশই হয় রাশিয়া থেকে। ভারতের ভারী অস্ত্রের ৫০ ভাগই আসে এই দেশটি থেকে।

রাশিয়া চলতি বছর ভারতের কাছে বিক্রমাদিত্য রণতরী ছাড়াও ভারত চলতি বছর ত্রিকান্ত ফ্রিগেড, ষষ্ট স্টিলথ ফ্রিগেড হস্তান্তর করেছে। দুই পক্ষ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং বহুমুখী পরিবহন বিমান নির্মাণেও লক্ষণীয় অগ্রগতি হাসিল করেছে।

দি হিন্দু পত্রিকায় ২১ অক্টোবর লেখা হয়ভারত একমাত্র দেশ, যাকে রাশিয়া গ্লোনেসে (মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম) প্রবেশ করার সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে।

ভারত ও রাশিয়া তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশিদারিত্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান’ হিসেবে অভিহিত করে রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সংকল্প ব্যক্ত করেছে।

অক্টোবরে মনমোহনের রাশিয়া সফরের সময়ও দুই দেশ এ ব্যাপারে কোনো রাখঢাক ছাড়াই কথা বলে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলাপের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, ইন্দোরুশ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ‘অন্য কোনো সম্পর্কের সঙ্গে তুলনাহীন’ এবং রাশিয়া ‘আমরা প্রধান প্রধান প্রতিরক্ষা প্লাটফর্মের যৌথ ডিজাইন, উন্নয়ন ও উৎপাদনের পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ায় ভারতের প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে রাশিয়া বহাল থাকবে।’

এছাড়া ১৪তম ইন্দোরুশ শীর্ষ সম্মেলন শেষে যৌথ বিবৃতিতে উভয় পক্ষ ‘রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ প্রযুক্তি এবং অস্ত্রব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর’ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে।

এই শীর্ষ সম্মেলনের আগে ভারত ও রাশিয়া ব্রহ্ম সুপারসনিক জাহাজবিধবংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং আরো কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবনে ১৫ বছর মেয়াদি অংশিদারি চুক্তিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে রাজি হয়।

সোভিয়েত আমল থেকেই রাশিয়াভারত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার হতে থাকে। ভারত মনে করে, রাশিয়া তার ‘পররাষ্ট্রনীতির প্রধান স্তম্ভ’। দুই দেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক ইস্যুতেই অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।

এর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরব বসন্ত এবং সিরিয়া। এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। কুশলী কূটনীতিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং নিজের অবস্থানে অনড় থেকে রাশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবার প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তি হ্রাস পাওয়ায় এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতার ফলে রাশিয়ার জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বেশ দক্ষতার সাথেই সুযোগটি গ্রহণ করছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত মহাসাগর রণভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ভারতের নতুন রণতরী সংগ্রহের ফলে অন্যান্য দেশও শঙ্কিত হবে। বিশেষ করে চীন। চীন অবশ্য তার নৌবাহিনী আধুনিকায়নের কাজে হাত দিয়েছে একটু বিলম্বে। গত বছর চীন তার প্রথম বিমানবাহী রণতরী সংগ্রহ করে ইউক্রেন থেকে। খবর পাওয়া গেছে, চীন আরো দুটি বিমানবাহী রণতরী সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে কবে নাগাদ সেগুলো হাতে পাবে, তা জানা যায়নি।

প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সীমিত ছিল। এখন তাতে ভারতও সামিল হলো। আর রাশিয়া তো আছেই।

চীনের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক এখন ভালো হলেও বেইজিংয়ের উত্থানে মস্কোও শঙ্কিত। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্ক জোরদার হওয়াকে রাশিয়া ভালো চোখে দেখছে না। চীনকে আয়ত্তে রাখতে রাশিয়া নিঃসন্দেহে চাইবে। আর এক্ষেত্রে রাশিয়া ও ভারতের চাওয়া একবিন্দুতে মিলে যায়। আবার আফগানিস্তানের ঘটনাবলীতেও ইন্দোরুশ স্বার্থ একইরকম মনে হয়। এই রঙ্গমঞ্চে ভারত কখনো রাশিয়ার সঙ্গে আবার কখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আছে।

বিক্রমাদিত্যকে ঘিরে কিছু তথ্য

কর্মকর্তারা আইএনএস বিক্রমাদিত্য থেকে রাশিয়ার পতাকা নামিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর পতাকা উত্তোলন করেন। হস্তান্তর অনুষ্ঠানকালে রণতরীটির নতুন ক্যাপ্টেন সুরাজ বেরির স্ত্রী হিন্দু শাস্ত্র অনুসরণ করে একটি নারকেল ভাঙেন।

এই রণতরীটি নির্মিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলে। তখন এর নাম ছিল অ্যাডমিরাল গরশকভ। ভারতের কাছে হস্তান্তর করার জন্য একে নতুন করে সাজানো হয়। এর ওজন ৪০ হাজার টন। এটি এখন ভারতীয় নৌবাহিনীর বৃহত্তম ও সবচেয়ে ভারী রণতরী।

এটি গ্রহণের মাধ্যমে ভারত এখন এ ধরনের রণতরীর অধিকারী পাঁচটি দেশের একটি হলো। তাছাড়া ভারত মহাসাগরে একমাত্র ভারতই এখন একইসঙ্গে দুটি বিমানবাহী রণতরী চালানোর সামর্থ্য অর্জন করল। ভারত এর আগে পর্যন্ত কেবল একটি বিমানবাহী রণতরী (আইএনএস বিরাট) চালাত।

ভারত মহাসাগর অত্যন্ত সামরিকৃত জোনে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নৌবাহিনীতে রণতরীটি যোগ দিল। ভারতীয় নৌবাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের কমান্ডার অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা বলেন, ‘দ্বিতীয় জাহাজটির ফলে ভারতের শক্তি অনেকগুণ বেড়ে গেল। এখন ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সমুদ্র এলাকায় একটি করে বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করতে পারছি।’

এর আগে পর্যন্ত ভারত কেবল আইএনএস বিরাটের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মালাক্কা উপসাগর থেকে উত্তরে ইডেন উপসাগর পর্যন্ত টহল দিতে পারত। এখন বিক্রমাদিত্য যোগ দেওয়ায় অবস্থা পুরোপুরি পাল্টে গেল।

ভারত ২০০৪ সালে বিক্রমাদিত্যকে কিনতে রাজি হয়েছিল। তখন দাম ধরা হয়েছিল ৯৭৪ মিলিয়ন ডলার।

একটি যুদ্ধজাহাজ বহর বিক্রমাদিত্যকে পাহারা দিয়ে রাশিয়া থেকে ভারতের কোচিন নৌঘাঁটিতে নিয়ে আসে। ভারতে পৌঁছার পর এক ইসরাইলি বারাক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত করা হয়।

আইএনএস বিক্রমাদিত্য ২৮৪ মিটার লম্বা এবং ৬০ মিটার উঁচু। এটা ২০ তলা ভবনের সমান উঁচু। এটা একইসঙ্গে ২৪টি মিগ২৯ যুদ্ধবিমান ও ১০টি হেলিকপ্টার বহন করতে পারে। এটা দিনে প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার চলতে পারে।

নতুন কিছু সংগ্রহ ছাড়াই যুদ্ধজাহাজটি টানা ৪৫ দিন চলতে পারে। এতে অবস্থান করতে পারে প্রায় ১৬ শ’ লোক। প্রতি মাসে এর ক্রুদের জন্য প্রয়োজন হয় এক লাখ ডিম, দুই লাখ লিটার দুধ ও ১৬ টন চাল।

ভারত এখন নিজেই বিমানবাহী রণতরী বানাচ্ছে। তার নিজের বানানো প্রথম রণতরীটির নাম হবে আইএনএস বিক্রান্ত। এটি ২০১৮২০১৯ সালে নৌবাহিনীতে যোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।।