Home » শিল্প-সংস্কৃতি » নারীবাদের ভিন্ন ভাষ্যকার – ডোরিস লেসিং

নারীবাদের ভিন্ন ভাষ্যকার – ডোরিস লেসিং

ফ্লোরা সরকার

dorice-lasingবিশ্বায়নের বিশ্বে বাংলাদেশ গোটা বিশ্ব থেকে শুধু দূরে নয় পৃথক, বিচ্ছিন্ন এক অবস্থানে বসবাস করে। অফিস বা বাড়িতে একটা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ এবং সেই সঙ্গে ইন্টারনেটের যোগাযোগ থাকলেই আমরা মনে করি বিশ্বায়নের কারণে অঈীভূত হয়ে আছি। কিন্তু দৃষ্টিটাকে যখন আরো প্রসারিত করতে যাই, অধিকতর স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে নিতে চাই, গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চাই গোটা বিশ্ব পরিস্থিতির বিভিন্ন আঙ্গিনা, দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেই প্রসারণ, স্বচ্ছকরণ আর গভীরতার ঘনীভবন আর হয়ে ওঠে না। ডোরিস লেসিং এর জন্ম ১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর। বিশ্বে তিনি প্রথম নারী এবং নোবেল জয়ীদের মধ্যে দ্বিতীয়জন যিনি সাতাশি বছর বয়সে সাহিত্যে নোবেল পান (ডোরিসের আগে তার বয়সী মার্কিন পদার্থবিদরসায়নবিদ রেমন্ড ডেভিস জুনিয়ার ২০০২ সালে নোবেল পান এবং ডোরিস ২০০৭ সালে)। ডোরিসের সাহিত্য কর্মের যাত্রারম্ভ আমরা ধরে নিতে পারি ১৯৪৯ সাল। কেননা তার প্রথম উপন্যাস, “Singing on the grassপ্রকাশ পায় ১৯৪৯১৯৫০ সালে। এরপর ডরিসের আরো অনেক উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, তার উপন্যাস থেকে ছবি নির্মাণ ইত্যাদি প্রকাশিত হলেও, অপ্রকাশিত থেকে যান আমাদের কাছে এই মহিয়সী ঔপন্যাসিক। “নোবেল পুরস্কার না পাওয়া নিয়ে” শীর্ষক নোবেল বক্তৃতায় ডোরিস লিখেছিলেন, “—-আমার মনে তখন ধুলোর ঝড়ে ঢাকা উত্তর পশ্চিম জিম্বাবুয়ের সেই স্কুল। বই ছাড়া ক্লাস, মানচিত্রও নেই। আমি এই স্কুলের ছাত্রদের (লন্ডনের স্কুলের) জিম্বাবুয়ের সেই স্কুলের কথা বলি, যেখানে ছাত্রশিক্ষক সবাই বই ভিক্ষা চান – ‘দয়া করে আমাদের একটা বই পাঠাবেন’। —-খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, জিম্বাবুয়ে থেকে আমার এক বন্ধু জানিয়েছেন, তিন দিন ধরে খাবার নেই, এমন গ্রামেও মানুষ বলছে বইয়ের কথা, কেমন করে বই পাওয়া যায় সে কথা আলাপ করছে, পড়াশোনার কথা বলছে। বইয়ের জন্যে এই ক্ষুধা কেনিয়া থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ পর্যন্ত সবখানেই। যেসব বাড়িতে বই নেই, সেখান থেকে লেখা এবং লেখক বের হয় না। একটা ফাঁক থেকে যায়”। আমাদের দেশের সঙ্গে এসব ‘বই না পাওয়া দেশগুলো’র সাদৃশ্য অনুধাবন করতে নিশ্চয়ই এখন অসুবিধা হচ্ছেনা। গত ১৭ নভেম্বর, ২০১৩, এই নোবেলজয়ী নারী আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। কিন্তু হারিয়ে যাননি। রেখে গেছেন তার মহামূল্যবান সম্পদ বই। তার মৃত্যুর প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা আর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ডোরিস লেসিং এর প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা জানানোর জন্যে যখন লিখতে বসলাম, দেখলাম জিম্বাবুয়ের সেই স্কুলের মতো এখানে তার কোন বই বাজারে নেই। একজন কবি বা গল্পকার বা ঔপনাস্যিকের ওপর কিছু লেখার অর্থই হলো তার সাহিত্যকর্মের পর্যালোচনা করা। যদিও আমাদের দেশে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কবির কর্মজীবন রেখে ব্যক্তিজীবন নিয়ে অধিকতর আলোচনায় মত্ত হতে দেখা যায় এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার ওপর যেসব লেখা পেলাম সেসবও তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে লেখা। মাত্র তিনটা ছোট গল্প অনুবাদ আকারে বিভিন্ন পত্রিকায় পেলাম। তবে অনলাইনে প্রচুর সাক্ষাৎকার পাওয়া গেলো, যেসব সাক্ষাৎকার তার সাহিত্যকর্ম নিয়েই আলোচিত, সেসব সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে লেসিং এর একটা সংক্ষিপ্ত কর্মপরিধি খুঁজে পাবার চেষ্টা করলাম। লেসিং এর সাহিত্যিক পরিধি প্রধানত ঔপনিবেশিক বর্ণবাদী শোষণ ও নিপীড়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহাযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র, স্বৈরাচারী শাসন, সায়েন্স ফিকশান, সুফিবাদ থেকে মহাঘাতক এইডস কোনটাই বাদ পড়েনি। কিন্তু ১৯৬২ সালের দিকে যখন তার “The Golden Notebookপ্রকাশিত হয়, তখন তাকে নিয়ে একটি খবর বেশ আলোচিত হতে দেখা যায়। উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর তাকে ভার্জিনিয়া উলফের সঙ্গে তুলনা করে নারীবাদি লেখক হিসেবে তকমা এটে দেয়া হয়। বিশেষত সত্তরের দশকে যখন নারীবাদ তত্ত্ব ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে কয়েকটা সাক্ষাৎকারে লক্ষ্য করলাম, লেসিং আমাদের জানাজগতের চিরাচরিত নারীবাদের সংজ্ঞার ধার দিয়ে যাননি। একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে নারীবাদ, নারীস্বাধীনতা,সমানাধিকার ইত্যাদি দেখেছেন। সেসব সাক্ষাৎকারের আলোকে তার ভিন্ন ভাষা বা মাত্রার নারীবাদি দৃষ্টিভঙ্গী এই আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তবে তার আগে একটি কথা আমাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন, আমরা একটি উন্নত বিশ্বের একজন ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিকোন থেকে নারীবাদের ভিন্ন ভাষ্য অবোলকন করছি, যে বিশ্ব ইতিমধ্যে নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অনেক প্রাগসর ভূমিকায় অবস্থান করছে।

২০০১ সালে এডিনবার্গ বই মেলায় ডরিস লেসিং ১৪ আগস্ট এবং ৯ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য অবজারভারে দুটো সাক্ষাৎকার দেন। অবজারভারের প্রথম শিরোনামটি ছিলো – “নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই। কেননা, নারী এখনো পুরুষকে তাদের (নারীদের) আনন্দ বা বিনোদনের দৃষ্টিতে দেখতে শেখেনি ডরিস লেসিং”। বারবারা এলেন, যিনি ডরিসের সাক্ষাৎকার নেন, প্রথমেই বলছেন – “এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে ডরিস লেসিং একজন নারীবাদি নন, কিন্তু তার চাইতেও বিস্ময় হলো কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি নিজেকে একজন অনারীবাদি বলে আখ্যায়িত করেন”। ডরিস এটাও মেনে নিতে অস্বীকার করেন যে আধুনিক নারী আত্মতৃপ্ত, ন্যায়পরায়ন এবং পুরুষ শ্রেণীকে খুব সহজে কলঙ্কিত করেন। প্রচলিত নারীবাদে পুরুষকে ‘কাপুরুষ এবং অর্থহীন বা আবর্জনারূপ প্রাণী’ হিসেবে যেভাবে আখ্যায়িত করা হয়, তার বিরুদ্ধেও লেসিংএর আপত্তি। যে অর্থহীন পুরুষতত্ত্ব জ্যাডি স্মিতের ( ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক এবং গল্পকার) বয়ানে পাওয়া যায়। বারবারা এলেন যখন প্রশ্ন করলেন, পুরুষকে এভাবে স্থুলভাবে কি নারীবাদে সত্যি দেখা যায়। উত্তরে লেসিং জানান, “অবশ্যই। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এটা ঘটে। এটা অনেকটা তর্কাতীত জেহাদের মতো। যেকোন নারীকে প্রশ্ন করা হলে, মাত্র দশমিনিটের মাথায় সেই নারী ‘পুরুষতন্ত্র নিপাত যাক’ বলে শ্লোগানে মেতে উঠবে। এটা এখন আমাদের সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে গেছে। সমাজে একটি অচেতন পক্ষপাতিত্ব কাজ করে আর তা হলো মেয়েরা খুব সুন্দর, ছেলেরা হিংস্র। একজন বালক যখন বড় হতে থাকে, তখন তাকে এসব শুনে বড় হতে হয়, যা তার জন্যে খুবই বেদনাদায়ক। সমাজে আরোপিত বা স্থিরকৃত কোন সিদ্ধান্ত পুরুষ বা অন্য কাউকে সে যে সেই আরোপিত সিদ্ধান্তেরই অনুরূপ তার কোন নিশ্চয়তা কেউ কি দিতে পারে? না। এমনকি নারীর ক্ষেত্রেও সেই নিশ্চয়তা প্রদান করা যায় না। আমার মনে হয়, যে কোন শিশু সেভাবেই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যা তার কাছ থেকে প্রত্যাশা (অর্থাৎ তার সম্পর্কে যে আরোপিত সিদ্ধান্তগুলো সমাজ দিয়েছে) করা হয়। এবং পুরুষ, ছেলে বা যেই হোক সেক্ষেত্রেও এই প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়।” অর্থাৎ লেসিং বোঝাতে চাইছেন, সমাজে প্রচলিত বা স্থিরকৃত সিদ্ধান্তগুলোই নারীপুরুষকে সেভাবে চালিত করে। ১৯৯৪ সালেই লেসিং জানিয়েছিলেন, “প্রচলিত নারীবাদের সঙ্গে আমি মোটেও একমত হতে পারিনা তার অনড়তার কারণে। সেখানে এমন কিছু পাওয়া যায়না যেখানে দেখা যায় একজন নারী তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে কোন পুরুষকে পছন্দ করতে পারে, আনন্দের বস্তু মনে করতে পারে। এর কারণ হলো, একজন নারী তখনই পুরুষকে অপছন্দ করা শুরু করে যখন সে সেই পুরুষ দ্বারা নির্যাতিত হতে শুরু করে। কোন পুরুষ যদি ভালো ব্যবহার করে, নারী মনে করে তার কারণে সেই পুরুষটি ভালো ব্যবহার করছে (পুরুষের নিজস্ব কারণে নয়)তোমরা (নারী জাতি) একটা দুর্গে বসবাস করছো এবং তুমি সেটা জানো। তোমরা যা বলো ( প্রচলিত নারীবাদ) তা হলো আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, পুরুষকে প্রতিহত করতে অর্থাৎ এসব চতুর প্রাণীকে।” সঙ্গে সঙ্গে বারবারা বলে ওঠেন – “না তারা চতুর নয়, তারা মনে করে তারা চতুর।” মৃদু হেসে লেসিং উত্তর দেন, “বদলাবে না। কখনোই বদলাবেনা”। অর্থাৎ সমাজ পরিবর্তন ছাড়া পুরুষতন্ত্রের পরিবর্তন সম্ভব নয়।

গার্ডিয়ানে দেয়া সাক্ষাৎকারটি আরো উদ্দীপকপূর্ণ। শিরোনামেই আমরা দেখি – “ঔপনাস্যিক ডরিস লেসিং গতকাল দৃঢ়ভাবে দাবি করলেন আধুনিক যৌন যুদ্ধে পুরুষ হচ্ছে নব্য নৈঃশব্দের বলি বা শিকার, প্রতিবাদহীন ভাষায় ক্রমাগত নারী কর্তৃক হীন আর অপমানিত হচ্ছেন”। লেসিং এর দাবি হলো, প্রচলিত নারীবাদ গাছের গোড়ায় পানি দেবার পরিবর্তে আগায় পানি ঢালছে। এডিনবার্গ বইমেলায় লেসিং বলেন “যেকোন যৌন অপরাধের দায় যুবক সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এই দায় চাপানোর ক্ষেত্রে যে পরিশ্রম ব্যয় করা হয় সে পরিমাণ পরিশ্রম যদি শিশুর গড়ে ওঠার প্রাক্কালে দেয়া হতো তাহলে পুরুষজাতিকে এই অনর্থক অবমানিত বা হীন হতে হতো না। নারীবাদ অনেক বড় বড় অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যেমন নারীরা এখন পুরুষের সমপরিমাণ উপর্জন করতে পারছে, কিন্তু শিশুপরিচর্যার ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই অবহেলা করা হচ্ছে, যে অবহেলা অতিক্রম করতে পারলে সত্যিকার অর্থেই নারী স্বাধীন হতে পারতেন। আমরা চারিদিকে অনেক সুন্দর, বুদ্ধিমতী, শক্তিশালী নারীবিচরণ দেখি, কিন্তু তাতে করে পুরষদের কি হচ্ছে ? শুধু পুরুষের কারণে নারীকে এই অবস্থানে আসতে হবে কেনো ? —এসব (পুরুষ শক্তিশালী, নারী দুর্বল) যেন একটা ধর্মীয় পর্যায়ে চলে গেছে, কোন সমালোচনা করা যাবেনা, করলে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিগণিত করা হবে, যা আমি নই। সময় এসেছে প্রশ্ন করার, কোন্ নারীরা পুরুষকে ক্রমাগত আবর্জনা বা অর্থহীন মনে করে। সব থেকে স্থুলো, অশিক্ষিত এবং নোংরা নারীরা এসব সুন্দর, দয়ালু আর বুদ্ধিমান পুরুষদের আবর্জনা মনে করে এবং তার কোন প্রতিবাদ হয়না।” লেসিং আরো দাবি জানান – “আমরা যখন আইন পরিবর্তনের জন্যে লড়ে যাচ্ছি ঠিক তখনই নারীবাদের এসব অক্লান্ত পরিশ্রম কর্পুরের মতো উড়ে যাচ্ছে। নারীপুরুষের সমানাধিকার শুধু তখনই সম্ভব যখন শিশুদের সুস্থ পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের গড়ে তুলতে পারবো।” অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, ডরিস লেসিং এর নারীবাদি দৃষ্টিভঙ্গী প্রচলিত নারীবাদি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

আমারা তার মতের সঙ্গে সহমত নাও হতে পারি। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গী অবশ্যই একটি ভিন্ন মাত্রা থেকে আমাদের নারীবাদ বিষয়ক চিন্তার জানালা খুলে দিতে পারে। পুরুষজাতিকে খাটো না করেও যে নারী তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে লেসিং তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার পুরুষের কারণেই যে নারীকে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে হবে তারও সমালোচনা করেছেন। নারী তার আপন মহিমায় বেড়ে উঠবে, কারো প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নয়। লেসিং যথার্থই ধরতে পেরেছেন, পুরুষের নিন্দা করে সমানাধিকার অর্জন সম্ভব নয়। নিন্দা বা প্রশংসা নয়, শিশু অবস্থাতেই নারীপুরুষের ভেদ তুলে দিতে হবে। শিশুবয়সেই নারী বিদ্বেষ বা বিভেদের বীজ রোপণ করা হলে তা বৃক্ষে পরিণত হবার পর স্বাভাবিকভাবেই সেটা দানবাকারের রূপ নেবে। কোন মেয়ে যেমন ছেলেদের শক্তিশালী মনে করে বড় না হতে পারে, আবার ঠিক তেমনি কোন পুরুষও যেন নারীকে দুর্বল মনে করে বড় না হয়। সমাজে যখন দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমাজ তৈরি হয়, তখন তা শুধু ভাবনার জগতে প্রতিষ্ঠা পায়না, সেইসঙ্গে দ্বিস্তর বিশিষ্ট সমাজের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রতিপক্ষ জ্ঞান করে। আসলে ‘নারীবাদ’ শব্দটার ভেতরেই একটা দূরত্বের ইঙ্গিত বহন করে। নারীবাদ কোন ‘বাদ’, ‘ইজম’ বা ‘তত্ত্ব’ হওয়া উচিত নয়, বরং তা হওয়া উচিত একটি ভাষা। ভাষা হচ্ছে সেই জ্ঞান যার মাধ্যমে পরস্পরকে জানা, বোঝা এবং উপলব্ধি করা যায়। এই ভাষা বুঝতে হলে নারী এবং পুরুষ উভয় পক্ষের ভাষা দিয়েই বুঝতে হবে। কারোর একক ভাষা দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এবং অবশ্যই এই ভাষা কারোর একক সম্পত্তি হতে পারেনা। নারীর যেমন বলার, চিন্তা করার স্বাধীনতা আছে, একই ভাবে আছে পুরুষেরও। যখনই আমরা যেকোন একটাকে বাতিল বা কম গুরুত্বপূর্ণ করে ফেলবো তখনই অসাম্যের সৃষ্টি হবে, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলবে। তাই ডরিস লেসিং পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যে সমাজের ভিত্তি পরিবার, যে পরিবারের ভিত্তি শুধু স্বামীস্ত্রী নয়, সেই সঙ্গে সন্তান। যে সন্তানকে একমাত্র সুস্থ, সুন্দর, সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে নারীপুরুষের বিভেদ ঘোচানো সম্ভব, অন্যথায় নয়। তাছাড়া নারী স্বাধীনতা বা সমানাধিকারের বিভিন্ন বিভাগ বা বর্গ নিয়েও ভাবার একটি দিক আছে। উন্নত বনাম অনুন্নত দেশ, ধনী বনাম দরিদ্র, শহর বনাম গ্রাম, শিক্ষিত বনাম অশিক্ষিত এভাবে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে নারীর আপন আপন অধিকার আপন আপন পথেই খুঁজে নিতে হবে। নিজেদের পথ নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে। নারীবাদের মাধ্যমে নারীমুক্তি আন্দোলন যে প্রেক্ষাপট থেকে ১৮৭২ সালে ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ড থেকে শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে তার যে বিভিন্ন রূপ আমরা দেখতে পাই, বর্তমান সময়ের ও প্রেক্ষাপটের আলোকেই নারীমুক্তি বা স্বাধীনতার বিষয়সমূহ দেখতে হবে। কোন আরোপিত তত্ত্ব বা দর্শন নয়, নিজেদের বাস্তবতার তথা সমাজবাস্তবতার আলোকে, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তার অনুসন্ধান করতে হবে। তাহলেই যথার্থরূপে যার যার দেশে বা সমাজে নারী তার স্বাধীনতার, সমানাধিকারের সম্মান অর্জন করতে পারবে।।

১টি মন্তব্য

  1. ami apnar ei tribute ke salut dei