Home » আন্তর্জাতিক » ফুকুশিমা : নজিরবিহীন বৈশ্বিক হুমকি – দ্বিতীয় পর্ব

ফুকুশিমা : নজিরবিহীন বৈশ্বিক হুমকি – দ্বিতীয় পর্ব

কেভিন জেসি এবং মার্গারেট ফ্লাওয়ার্স

সূত্র: জেড নেট

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

fukoshimaফুকুশিমা থেকে নির্গত তেজষ্ক্রিয় পানি প্রশান্ত মহাসাগরে কতদূর বিস্তৃত হয়েছে, তার কোনো পরিসীমা নেই। হার্ভে ওয়াসারম্যানের কাছেও এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই যে ফুকুশিমার তেজষ্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার পর কত বছর পর প্রশান্ত মহাসাগরের মাছ খাওয়া যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) যদিও জানিয়েছে, তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা কম থাকায় মানব স্বাস্থ্যের জন্য এখানকার মাছ খুব একটা ক্ষতিকর হবে না, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই অভিমতের ব্যাপারে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে।

এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছিল, তখন তেজষ্ক্রিয়তাবিষয়ক জাতিসংঘ বৈজ্ঞানিক কমিটি তাদের মূল্যায়ন তৈরি করছিল। এটা পাওয়া গেলে তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা এবং মানুষ ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপকভিত্তিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও তথ্য পাওয়া যাবে। ওই প্রতিবেদনে কিভাবে তেজষ্ক্রিয়া সামগ্রী নির্গত হলো, কিভাবে তা মাটি ও পানিতে জমা হলো, অতীত সময়ের দুর্ঘটনার সঙ্গে ফুকুশিমার তুলনা, পরিবেশ ও খাদ্যে এর প্রভাব এবং মানব স্বাস্থ্যে ও পরিবেশে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওয়াসারম্যান সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তরলীকরণ কোনো সমাধান নয়।’ বরং প্রশান্ত মহাসারগীয় এলাকায় দীর্ঘদিন তেজষ্ক্রিয়তার উপস্থিতি থাকবে পানিতে থাকা তেজষ্ক্রিয় উপাদান উদ্ভিদ গ্রহণ করে। ওই উদ্ভিদ আবার মাছ খায়। বড় মাছ খায় ছোট মাছ। এই প্রক্রিয়ায় খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা টুনা, ডলফিন ও তিমির মতো মাছে উচ্চমাত্রার তেজষ্ক্রিয় জমা হয়। আর সবার ওপরে থাকা মানুষ এসব দূষিত মাছ খায়।

তবে প্রশান্ত মহাসাগরে তেজষ্ক্রিয় পানির চুইয়ে পড়াটাই সবচেয়ে খারাপ সমস্যা নয়। এর চেয়েও বড় বিপদ ঘাপটি মেরে আছে। গত মাসে এশিয়াপ্যাসিফিক জার্নাল জানিয়েছে যে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা প্রতিষ্ঠান টেপকো মাটির ওপরে এক হাজারটি ট্যাংকে এবং মাটির নিচে অজ্ঞাত সংখ্যক ট্যাংকে তিন লাখ ৩০ হাজার টন পানি জমিয়ে রেখেছিল। প্রতিদিন পর্বতমালা থেকে ৪০০ টন পানি আসতো। এখন প্রতিদিন ৩০০ টন পানি চুইয়ে পড়ে প্রশান্ত মহাসাগরে যাচ্ছে। বাকি পানির অবস্থা জানা নেই।

প্লান্টটি শীতল রাখতে টেপকো প্রতিদিন সেখানে ৪০০ টন করে পানি ঢালে। এই পানির অর্ধেক রিসাইকেল করা হয়, বাকিটা মাটির উপরিভাগের ট্যাংকে জমা হয। এই তেজষ্ক্রিয় পানি জমিয়ে রাখার জন্য অব্যাহতভাবে নতুন নতুন স্টোরেজ ট্যাংক বানানো হচ্ছে। ২০১৬ সাল নাগাদ আট লাখ টন তেজষ্ক্রিয় পানি জমা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হার্ভে ওয়াসারম্যান হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, আরেকটি ভূমিকম্প বা সুনামি ফুকুশিয়ায় আঘাত হানলে এসব ট্যাংক ধবংস হয়ে যাবে। এশিয়াপ্যাসিফিক জার্নাল উপসংহার টেনেছে এভাবে : অর্থাৎ পানি সমস্যার সত্যিকারের কোনো সমাধান হচ্ছে না।

ফুকুশিমাতেও তেজষ্ক্রিয় পানিজনিত সমস্যা রয়ে গেছে। গত ১১ অক্টোবর টেপকো জানিয়েছে, সেখানে তেজষ্ক্রিয়াতার মাত্রা সাড়ে ছয় হাজার গুণ বেশি। ব্যবহৃত জ্বালানি রড : তেজষ্ক্রিয় পানি ও খোয়া যাওয়া পারমাণবিক উপাদানের মতো আরেকটি বিপদ হলো ব্যবহৃত জ্বালানি রড। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্টটি ৪০ বছর ধরে সক্রিয় ছিল। ফলে ফুকুশিমা প্লান্টের ভূগর্ভে ১১ হাজার ব্যবহৃত রড জমেছিল। এসব রডে উচ্চমাত্রার প্লুটোনিয়াম ও ইউরেনিয়াম রয়েছে। বৃহত্তম ও অত্যাসন্ন চ্যালেঞ্জটি হলো ১,৫৩৩টি ব্যবহৃত জ্বলানি রড ৪ নম্বর চুল্লির ওপরের চতুর্থ তলায় রাখা হয়েছিল। তবে চুল্লিটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য সুনামির আগে দিয়ে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত খোলা বাতাসে রাখা হয়েছে। এগুলোর মোট ওজন ৪০০ টন। এগুলোতে যে তেজষ্ক্রিয়তা রয়েছে, তা হিরোশিতা পারমাণবিক বোমার চেয়ে ১৪ হাজার গুণ বেশি তেজষ্ক্রিয়তা পূর্ণ।

যে ভবনে এসব রড জমিয়ে রাখা হয়েছিল, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন যেকোনো সময়ে সেটি ধসে পড়তে পারে। আবার এর আশপাশের ভবনগুলোর সঙ্গে পানির সংস্পর্শ রয়েছে। ফলে এসব রডও যেকোনো সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে মিশে যেতে পারে।

অনেকে আশঙ্কা করছেন, এসব রড থেকে পারমাণবিক বোমার মতো বিস্ফোরণের সৃষ্টি হতে পারে। আর সেটা ঘটলে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পারমাণবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে।

এসব রড যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে, তা নিয়ে কারো মধ্যেই সংশয় নেই। তবে সরানোর কাজটি খুব সহজ নয়। পারমাণবিক ইঞ্জিনিয়ার আরনি গান্ডারসন বলেন, কেউ যদি মনে করে, সিগারেট প্যাকেট থেকে সিগারেট সরানোর মতো কাজ এটি তবে ভুল করা হবে। সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট টেনে বের করলে অন্যগুলো আগের জায়গাতেই থেকে যায়। কিন্তু পারমাণবিক রড নাড়াচাড়ার সময় একটু এদিক সেদিক হলেই মারাত্মক পারমাণবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।।