Home » মতামত » বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও বৈদেশিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রাসন

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও বৈদেশিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রাসন

মো. এ এইচ ছিদ্দিকী

freedom-of-thoughtবাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে জন্ম নেয়ার লগ্নেই একটি শোষনমুক্ত ও বৈষম্যহীন দেশ হিসেবে এর সংবিধান রচনা করা হয়। র্র্দূভাগ্যের বিষয়, পদে পদে সচেতনভাবে এদেশের সংবিধানকে লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

সংবিধানের ২য় ভাগে রাষ্ট্র পরিচারলার মূলনীতি বিষয়ক অধ্যায়ে ১৭ নং অনুচ্ছেদ অবৈতনিক ও বাধ্যতামুলক শিক্ষা সংক্রান্তে বর্ণিত আছে:

অনুচ্ছেদ ১৭। অবৈতনিক ও বাধ্যতামুলক শিক্ষা

রাষ্ট্র– () একই পদ্বতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্টার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালকবালিকাকে অবেতনিক ও বাধ্যতামুলক শিক্ষাদানের জন্য :

() সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজনে সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্ঠির জন্য ;

() আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করিবেন ।

তথাপি দেশে একাধিক ধারা বিশিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৭ এর অনুসৃত সুরকে ভিত্তি করলে ধরে নেওয়া যায় যে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই দর্শন অনুসৃত হবে ।

অতীতে উচ্চ শিক্ষা কেবল মাত্র সরকারি নিয়ন্ত্রনে ছিল। গত শতকের ৯০ দশক থেকে উচ্চ শিক্ষায় বেসরকারি উদ্যোগকে স্বীকৃতি জানানো হয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯১ নামে একটি আইন সংসদে পাস করা হয়। এটি পরে ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে সংশোধন করা হয়।

লক্ষনীয় যে, বাংলাদেশে সব সময় শিক্ষাকে অলাভজনক খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বেসরকারী খাতে শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি বানিজ্যিক ভিত্তিতে বা লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। মজার বিষয় হচ্ছে যে, বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বিষয। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সল্প খরচে পড়াশোনা করা যায় এবং এখানে সার্টিফিকেট বানিজ্য হয় না। কিন্তু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ভর্তি হওয়ার অর্থ হল উঁচু গ্রেডসহ পাশ সুনিশ্চিত। এতে জাতি দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গেছে। আর্থাৎ যার অর্থ আছে সে টাকা দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে উচ্চ গ্রেডসহ সার্টিফিকেট নিয়ে চাকুরী বাজারে প্রবেশ করতে পারবে আর দরিদ্র ছাত্র ছাত্রীরা আর্থের অভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম নীচু গ্রেড নিয়ে চাকুরী বাজারে পিছিয়ে থাকবে। অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষা বাজার অর্থনীতির কবলে পড়েছে। যাহোক দেশে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক সাফল্যের কারনে এই খাতে বিদেশীদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়েছে। তার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্জুরী কমিশন ‘‘দেশে বিদেশী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাংলাদেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত সংক্রান্ত খসড়া বিধিমালা২০১১” শীর্ষক একটি খসড়া নীতিমালা প্রনয়ন করেছেন। অতি সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ থেকে এর সম্পদ লুট করা ছ্াড়া এর অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই।

সরকার দেশে বিদেশী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা২০১১ প্রনয়ন করে এর পর্যালোচনা কল্পে আহুত সভায় অনেককে আমন্ত্রন জানান। সে প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রনালয় ২০১২ সালের ২৪ মে একটি আন্তঃ মন্ত্রনালয় এবং সংস্থার সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিধীমালাটি পূনঃবিন্যস্ত করার লক্ষে গঠিত গঠিত উপকমিটি ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওই এক বছরের ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়।

সরকার কর্তৃক প্রনীত যে কোন প্রবিধি বা বিধিমালা বিদ্যমান কোন আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রণয়ন করা হয়। প্রস্তাবিত এবং আলোচ্য বিধিমালার উৎস সুস্পষ্টভাবে বিধিমালায় বিধৃত নয়। আইনের উৎস বিধৃত না থাকলে বিধিমালার প্রায়োগিক ক্ষমতা বিঘিœত হওয়ার সমূহ সম্ভবনা বিদ্যমান। প্রস্তাবিত বিধিমালার সূচনাতে আইনী উৎস সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা বাঞ্চনীয়।

এখানে অবশ্যই বলা প্রয়োজন যে, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ সার্বজনিনভাবে প্রযোজ্য একটি আইন যা দেশী বা বিদেশী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিষ্ঠিতব্য সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে সমভাবে প্রযোজ্য। এই আইনের ৫০ ধারার আইনের উদ্দেশ্য পূরন কল্পে সরকারের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পিত আছে। সুতরাং প্রস্তাবিত বিধিমালাটি ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ন আইনের অধীনে প্রনীত হয়েছে বলে ধারনা করা যায়।

বিধিমালা প্রণয়নে অবশ্যই খেয়ালে রাখতে হবে যে বিধিমালা আইনের উদ্দেশ্য পূরনকল্পে প্রণীত হতে হবে এবং তা কোনক্রমে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ ইং এর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অথবা অসংগতিপূর্ণ হলে তা আইনসিদ্ধ হবে না।

আলোচ্য বিধিমালায় কিছু প্রবিধিতে এই জাতীয় সাংঘর্ষিক অথবা অসংগতি রয়েছে যার নিরসন হওয়া প্রয়োজন। উপরন্তু ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন থেকে কিছু বিশেষ বিশেষ বিধান উদ্ধৃত করে আলোচ্য বিধিমালায় গ্রথিত করা হয়েছে। এতে এমন একটি ভ্রান্ত ধারনা সৃষ্টি হওয়া সম্ভব যে, আইনের এই বিধান গুলোই বিদেশী উদ্যোগে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্যগুলো নয়। এই ধারনা নিরসন করা প্রয়োজন।

পক্ষান্তরে আরেকটি প্রবিধিতে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা হয়েছে যে, স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ যথাযথভাবে অনুসরন ও প্রতিপালন করতে হবে (প্রবিধি ৩০)। উপরোক্ত প্রবিধির প্রেক্ষিতে বিশেষভাবে বাছাইকৃত আইনি বিধি নীতিমালার অর্ন্তভূক্ত করার প্রয়োজন নেই বলেই অনুুমিত হয়।

প্রস্তাবিত নীতিমালার ৪ নং প্রবিধিতে যে স্থানীয় প্রতিনিধি এর বিধান রাখা হয়েছে তা ২০১০ সালের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়; এই প্রবিধি এমন একটি ধারনা প্রদান করে যে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনায় বোর্ড অব ট্রাস্টিজ বা আইনে প্রদত্ত অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। স্পষ্টতই তা আইন সংগত হবে না। ২০১০ সালের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ধারা ১৩ এর ৩ উপধারায় বর্ণিত আছে যে, কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করা যাবে না। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক শাখা ক্যাম্পাস স্থাপন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

টিউশন প্রভাইডিং/স্টাডি/টিচিং/কোচিং সেন্টার সংক্রান্ত নীতিমালা ও বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত নীতিমালা আলাদাভাবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, টিউশন প্রভাইডিং/স্টাডি/টিচিং/কোচিং সেন্টার গুলোর স্থাপন ও পরিচালনা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন২০১০ এর আওতাভূক্ত নয়। প্রয়োজন অনুমিত হলে নতুন আইন প্রনয়ন এবং সেই আইনের আওতায় যথাযথ বিধিমালা প্রনীত হতে পারে।

এই নীতিমালার উদ্দেশ্যবলি কোথাও সুস্পষ্টভাবে বিধৃত নয়। ধারনা করা যায়, এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে আর্ন্তজাতিক মান সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে নিজস্ব স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী করা, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্দেশ্য। তবে এই মান নিশ্চিত করতে সরকার মঞ্জুরী কমিশন, বেসরকরি প্রতিনিধি ও খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী সমন্বয়ে কার্য্যকরী প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে এই বিধিমালার সুযোগে যথাযথ মান সম্পন্নহীন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় গুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে শিক্ষার মান ক্ষুন্ন করতে না পারে।

উচ্চ শিক্ষাকে বানিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার না করার লক্ষ্যে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর ৭ নং ধারার সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, “কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সাধারন তহবিলের অর্থ উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যাতিত অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যায় করা যাইবে না” এই বক্তব্যটি সুস্পষ্ট করা অপরিহার্য।

বিদেশী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে এই ধারাটি অবশ্যই প্রযোজ্য। তা সুস্পষ্ট করা বাঞ্চনীয়। পক্ষান্তরে যদি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষনের অভিপ্রায়ে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় এবং আহরিত লভ্যাংশ/উদ্বৃত্ত তহবিল বিদেশে প্রেরণ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে স্পষ্টতঃই শিক্ষা দর্শন এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন১০১০ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

আরেকটি ব্যাপার অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে প্রনিধানযোগ্য। সেটি হলো বিদেশী স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়/বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস/কোটিং সেন্টার গুলোকে প্রদেয় সুযোগ সুবিধা ও শর্তাবলী বাংলাদেশের জাতীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত/প্রতিষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুযোগ সুবিধা ও শর্তাবলী থেকে কোনক্রমেই শিথিল হওয়া অভিপ্রেত, যৌক্তিক বা আইন সংগত হবে না।।