Home » রাজনীতি » রাজনৈতিক স্বার্থেই কি দুদক আইন সংশোধন?

রাজনৈতিক স্বার্থেই কি দুদক আইন সংশোধন?

এম. জাকির হোসেন খান

political-cartoons-29‘‘জনতার শক্তি, রুখবে দুর্নীতি”এ খুদে বার্তাটি দুর্নীতি দমন কমিশন এর নামে গত ২০ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে মুঠো ফোনে পাওয়ার পর দুদকের অসহায়ত্বে অবাক হতে হলো। উল্লেখ্য, দুদক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে অন্ধকারে রেখে জাতীয় জন গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে সংসদে কোনো আলোচনা না করে গত ১০ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে জাতীয় সংসদে সংশোধিত দুর্নীতি দমন কমিশন বিল২০১৩ পাশ হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে দুদক আইন ২০০৪ এর ৩২() ও ৩২ক ধারার প্রতিস্থাপন করে উল্লেখিত ধারায় “জজ, ম্যাজিস্ট্রেট এবং সরকারী কর্মচারীর” বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ১১৫ বছরের পুরনো ফৌজদারী কার্যবিধির ১৯৭ ধারা প্রয়োগ করার বিধান স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পূর্বানমতি ছাড়া দুদক কোনো সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধান, মামলা, তদন্ত এবং চার্জশিট দায়ের করতে পারবে না। উল্লেখ্য, টিআইবি’র দুর্নীতি বিষয়ক খানা জরিপ ২০১২ অনুসারে, ৬৩.% খানা এক বা একাধিক সরকারি খাত হতে সেবা নিতে যেয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ধারা ২() অনুযায়ী দুর্নীতির আওতায় সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, ঘুষ বা উৎকোচ গ্রহণ সহ সব অনিয়মকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া এই ধরনের পূর্বানুমতি সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। ‘সরল বিশ্বাসে’ অথবা মন্ত্রীর ভাষ্য মতে, উপরের নির্দেশে কর্মকর্তারা অনিয়ম করতে বাধ্য হতে পারেন, তবে তা আইনী ব্যবস্থার আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ করাই সংবিধানের বিধান। সাধারণ নাগরিক এবং অন্যান্য পেশাজীবী, সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধি, এমনকি বিরোধীদলের নেতা এবং সরকার প্রধানের ক্ষেত্রেও দুদকের মামলা করার এখতিয়ার রয়েছে, অথচ সরকারি কর্মকর্তাদের বেলায় এর ব্যতিক্রম সাংবিধানিক হয় কোন যুক্তিতে? সরকারি কর্মচারীকর্মকর্তা বাদে রাষ্ট্রের অন্যান্য নাগরিকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে গণ্য করার এখতিয়ার কোনো সরকারের নেই। দুদক আইন ২০০৪ এর সর্বশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে দুদককে স্পষ্টত ২০০৪ এর পূর্বের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর ন্যায় একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হলো। প্রশ্ন হলো, বর্তমান নবম সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে গত ২০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার যে কথা বলেছেন বাস্তবে তা পশ্চাদমুখী।

প্রধানমন্ত্রী তত্ত্ববধায়ক ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করে তা বাতিলের মাধ্যমে সংবিধান হতে একচুল না নড়ার যে প্রতিশ্রুতি জাতির সামনে করেছেন, তাহলে সংশোধিত দুদক আইনের মাধ্যমে একই সংবিধান লংঘন করে দ্বিমুখী অবস্থান গ্রহণ করা হলো তা প্রতিকারে সরকার বা সংবিধানের রক্ষক হিসাবে উচ্চ আদালত হতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের খবর জানা নেই। দুদক চেয়ারম্যান সংশোধনী আইন ২০১৩ সম্বন্ধে বলেছেন যে, ‘‘এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমানাধিকার খর্ব বরা হয়েছে’’। শুধু তাই নয়, দুদকের স্বাধীনতা পুরোপুরি নস্যাত করতে এ সংশোধনীর মাধ্যমে দুদক আইনের ১৬() ধারা অনুযায়ী দুদক কর্তৃক কমিশন সচিব নিয়োগের বিধান পরিবর্তন করে সরকারের পছন্দ মাফিক সচিব নিযুক্তির বিধান করা হয়েছে। পূর্বে দুদক চেয়ারম্যান প্রধান নির্বাহী হলেও সে ক্ষমতা সংশোধনীর মাধ্যমে সচিবের হাতে প্রদান করে দুদকের চেয়ারম্যান এবং কমিশনারকে পুরোপুরি অকার্যকর করা হলো। তাছাড়াও, দুদকের নিজস্ব বিধিতে শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তার তথাকথিত অসৎ উদ্দেশ্যে আনীত মামলার জন্য ২৫ বছরের সাজার বিধানের মাধ্যমে দুদকের সাহসী ও দক্ষ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলো; এবং গত ৫ বছরে পদ্মা সেতু, হলমার্ক, শেয়ার বাজার, রেন্টাল বিদ্যূত কেন্দ্র ভাড়ার চুুক্তিসহ গুরুত্বর্পূণ বিভিন্ন দুর্নীতির মামলার তদন্ত কার্যক্রম বন্ধে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ ব্যতীত কিছু নয়। দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার একাধিকবার বলেছেন যে, আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতামত উপেক্ষা করে ২০০৪ এর দুদক আইনের ২৪ ধারায় কমিশনের স্বাধীনতার বিধান নিশ্চিত করা হলেও ২০১৩ এর সংশোধনীর মাধ্যমে তা এখন অতীত।

বর্তমান সরকারের নীতি নির্ধারকরা কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেয়, অথচ দুদকের স্বাধীনতা খর্ব করে দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচারে বাঁধা সৃষ্টির মাধ্যমে সংবিধানের ২০() অনুচ্ছেদ (“রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুর্পাজিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবে না”) সুস্পষ্টভাবে লংঘন করে বাধাহীনভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটে উৎসাহিত করা হলো। দুদক আইন সংশোধন করার জন্য মন্ত্রিপরিষদের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে যে কমিটি গঠন করা হয় তারই সুপারিশের ভিত্তিতে দুদকের সঙ্গে ‘স্বশাসিত’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাংবিধানিক সংশোধিত দুদক আইন পাস করা হয়। দেশের সচেতন নাগরিক, দুদক, উন্নয়ন সহযোগীদের কঠোর অবস্থানের পরও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মাহজোট সরকারের একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে দুদককে ‘নখ দন্তহীন মৃত বাঘে’ পরিণত করার পেছনে যে অসদুদ্দেশ্য রয়েছে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রক্তন গভর্ণর ড: মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন স্পষ্ট করেছেন; তাঁর মতে,‘‘সংশোধিত দুদক আইন পাস করার পেছনে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী উদ্দেশ্য রয়েছে। যদি জাতীয় ঐক্যমত থাকতো তাহলে এটা হতো না”।

এ সংশোধনীর কারণে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সুনাম প্রবলভাবে ক্ষুন্ন হবে। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, রানা প্লাজায় বিপর্যয় এবং অহরহ মানবাধিকার লংঘনের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ প্রবল ইমেজ সংকটে রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের চাপে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ৩ () ধারার অধীনে দুদক প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ; দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া; ত্রুটিপূর্ণ আইন ও বিধিমালা এবং প্রায়োগিক ক্ষমতার অভাবে স্বাধীনতা চর্চা সুদূর পরাহত। মূলত এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে কাজে লাগানোর স্বার্থেই এমন একটি সংশোধনী সরকার এনেছে।

দশম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে মহাজোট সরকারের প্রধান দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকারের পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অন্যতম হিসেবে স্থান পায় এবং নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮ এর দিনবদলের সনদ (প্যারা ২) উল্লেখ করা হয় যে, ‘‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে, ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশী শক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে। সরকারি কর্মকান্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটারায়ন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে।” এ প্রেক্ষিতে, নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি দমনের কাজে দুদককে ব্যবহার করার অভিযোগ উত্থাপন করে দুদক পুনর্গঠনের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে অসাংবিধানিকভাবে দুদক আইন সংশোধন করে কোন ধরনের স্বচ্ছতা বা জবাদিহিতা প্রতিষ্ঠার দাবি জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। উল্লেখ্য, ২০০৯ এর ২৪ জুন গোলাম রহমানকে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তির পর সরকারের চাপের কাছে দুদক নতি স্বীকার না করার কথা বললেও পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে দুদকের ওপর সরকারের চাপের কথা প্রকাশ পায় । ফলে, এ সময়ে দুদককে কোনো শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বা মামলা করতে দেখা যায়নি । উপরুন্তু পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশপ্রেমিক আখ্যা দেন। এটা দিন বদলের চিত্র বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যে সামঞ্জস্য নয়, তা পরিস্কার।

শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের নেতাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয় অথচ দুদকের চেয়ারম্যান এর মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ ছিলো না । বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১৫টি মামলার সবগুলো থেকে ইতোমধ্যে তিনি খালাস পেয়েছেন । অন্যদিকে আইন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সরকারি দলের নেতাদের অভিযোগে দায়েরকৃত আড়াইশ মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে দুদকে পাঠায়, বিভিন্নভাবে সেগুলো প্রত্যাহার, বাতিল বা খারিজ করা হয়েছে। এসব মামলা নিয়ে দুদক উচ্চ আদালতে কোন আপিল করেনি। এছাড়া দুদক সরকারি দলের নেতাদের মামলাসহ প্রায় এক হাজার মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় যার অর্থ দুদক মামলাগুলো নিয়ে আর এগোবে না। এ হলো বর্তমান সরকারের দুর্নীতর বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতির প্রকৃত চিত্র।

শুধু তাই নয়, নিবাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাধরদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হবে বলা হলেও সরকারি দলের মন্ত্রীএমপিদের কোনো হিসাব প্রকাশ না করে বিরোধী দলের নেতাদের সম্পদের হিসাব নেওয়া শুরু হয় । এ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রমাণ হলো রাষ্ট্রের করের টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি নিশ্চিতে সংবিধান লংঘন করতে রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা একজোট। এটা সুষ্পষ্ট যে, বর্তমান সংশোধনীটি সরকারের হঠাত গৃহীত কোনো পদক্ষেপের অংশ নয় বরং দুদক পুনর্গঠনের নামে এটাকে অকার্যকর করে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সরকারের গৃহীত পূর্ব পরিকল্পনার অংশ বলে মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে, পরবর্তী দশম সংসদ নির্বাচনে সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীর মাধ্যমে প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে অসাংবিধানিক এ সংশোধনের মাধ্যমে সরকার জাতির সামনে নিজেদেরকে প্রতারক হিসাবে উপস্থাপন করেছে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, “দুর্নীতি বান্ধব এই সংশোধনীর ফলে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারসহ সকল বড় বড় বক্তৃতা ফাকাবুলি ছাড়া আর কোনোভাবে দেখার সুযোগ থাকলো না।”