Home » প্রচ্ছদ কথা » শেখ হাসিনার জন্য এক বিপজ্জনক খেলা ভয়ঙ্কর পথে যাত্রা

শেখ হাসিনার জন্য এক বিপজ্জনক খেলা ভয়ঙ্কর পথে যাত্রা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-cartoons-53গত শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অন্য কোনো বিষয়ে কোনো ঐকমত্য না হলেও একটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। মির্জা ফখরুল ওই বৈঠকে তার সমকক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, সমঝোতার স্বার্থে নির্বাচনী তফসিল এখনই যেন ঘোষণা করা না হয়, অন্তত সপ্তাহখানেক সময় নেয়া হোক। সৈয়দ আশরাফ যথারীতি কথা দিয়ে পাল্টা অনুরোধ করলেন বিএনপিও যেন এর মধ্যে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা না করে। এছাড়া ওই বৈঠক অনুষ্ঠানের খবরটি যেন কোনো ভাবেই প্রকাশ না পায় সে ব্যাপারেও দু’জন রাজি হয়েছিলেন। ওই বৈঠকের অন্যান্য বিষয়ে ঐকমত্যের কোনো সম্ভাবনা ছিল না বা সৈয়দ আশরাফের পক্ষে কোনো সুরাহার পথ নির্দেশনাও দেয়া সম্ভব ছিল না, কারণ এগুলো ছিল মূলতঃ শেখ হাসিনা সরকার প্রধান থাকবেন কিনা এবং কোন ফর্মূলায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী সরকার গঠন করা যায় সে সম্পর্কে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি তার নেত্রীকে বিষয়টি অবহিত করেন। বেগম জিয়া সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও কর্মসূচি ঘোষণার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখিয়েছিলেন।

দুই নেত্রীর সম্ভাব্য সংলাপ, টেলিফোন আলাপসহ সমঝোতার অন্যান্য বিষয়গুলো যে সরকারের দিক থেকে লোক দেখানো ছিল, এক্ষেত্রেও এর কোনো এদিকসেদিক হয়নি। সরকার প্রথমেই যে কাজটি করলো তাহলো, গত শনিবার রাতের খবরটি ছড়িয়ে দিল মূহুর্তেই। আর এর পরে যে কাজটি করা হলো তাহলো, বৈঠকের বিষয়টি যাতে ঘটা করে প্রচার করা হয় সে লক্ষ্যে শেখ হাসিনা তথ্যমন্ত্রীসহ সবাইকে বলেদিলেন। সে মতেই তথ্যমন্ত্রী যথারীতি সংবাদ সম্মেলন করলেন এবং অন্যান্যরাও আলোচনা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে এমন একটা চিৎকার চেচামেচি শুরু করলো। কিন্তু বিএনপি তার সঙ্গে যে কথা অর্থাৎ চুপচাপ থাকার নীতি গ্রহণ করে। তবে সরকারের যা চরিত্র সে অনুযায়ী তারা কাজ চালিয়ে যেতে থাকলো। বৈঠক অনুষ্ঠানের বিষয়টি যে লোক দেখানো এবং জনগণের মধ্যে ভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে তা তখন বুঝতে দেয়া হলো না। আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনও সরকারের এ সমস্ত কূটকৌশলের বিষয়টি প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি। অবশ্য বুঝতে মাত্র কিছুটা সময় লেগেছে। তারা বুঝতে পেরেছেন তখনই যখন তাদের উপরে নির্দেশনামা জারি করা হলো। সরকারের দিক থেকে এই বৈঠকটির কথা প্রচারের পরে কোনো সময় না দিয়েই আবার তারা বলতে শুরু করলো, বিএনপি বৈঠক চায় না। কিন্তু একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, একটি বৈঠক অনুষ্ঠানের পরে আরেকটি বৈঠকের কিংবা সামান্য চিন্তাভাবনার সময়টুকুও সরকার দেয়নি। এই যে দেয়নি তার পেছনের কারণ হিসেবে এ বিষয়টি আবার প্রমাণিত হয় যে, প্রধানমন্ত্রী মনেপ্রাণে কোনো ফলপ্রসূ বৈঠক বা সমঝোতা চান না।

প্রধানমন্ত্রী রোববার রাতেই ১৪ দলের সভা সোমবার সকালে ডাকা এবং অনতিবিলম্বে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি উত্থাপনের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ১৪ দলের বৈঠকটি তড়িঘড়ি করে অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সোমবারই যাতে তফসিল ঘোষণা হয় এবং এর পরবর্তী সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া মোকাবেলায় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবাইকে নির্দেশ দেন। একদিকে পর্দার অন্তরালে চলতে থাকে এসব আয়োজন, অন্যদিকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলতে থাকেন বিরোধী দল যে মন্ত্রণালয় চাইবে তা তারা নিতে পারে, কথিত সর্বদলীয় সরকারে অংশগ্রহণ করে। পুরো সংবাদমাধ্যম এবং দেশের মানুষ চমকে উঠলো সোমবার সকালে তফসিল ঘোষণার আলামত দেখে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো আগেই আতঙ্কে থাকা মানুষগুলোর চরম আতঙ্কে পৌছে যাওয়া। মোট কথা, সমঝোতার শেষ সময়ের যে আশার আলো ধপ করে জ্বলে উঠেছিল তাও প্রধানমন্ত্রী নিভিয়ে দিলেন এক ফুঁৎকারে।

এটা এখন নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনোদিনই মনেপ্রাণে চাননি সংলাপ বা সমঝোতা হোক। একথা আগে বলা হলেও অনেকের মনে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করেছিল এবং পরিণামে শেষ সময়ে নিশ্চয়ই একটি সমঝোতা হবে এমন আশার বিষয়টি মনোজগতে ক্রিয়ারত ছিল। এখন আর কোনো আশার আলো নেই, কোনো দ্বিধা নেই, কোনো উপায়ও নেই। আর কোনো কারণও নেই নিরাশ না হয়ে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারটির উপরে জনগণ যে চরমভাবে বিরক্ত এবং এ কারণে জনপ্রিয়তায় যে বিশাল ধস নেমেছে তা প্রধানমন্ত্রী মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছিলেন। তবে এ উপলব্ধিটি প্রথমে নিজ থেকে হয়নি আন্তর্জাতিক মুরব্বীর সতর্কবার্তা ছিল অনেক আগে থেকেই। কাজেই অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এমন বিপদ রেখে বিএনপিসহ সব দলকে নিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার মস্তবড় ঝুঁকি নিতে তিনি রাজীও হননি, তাকে এ পথে যাওয়ার পরামর্শও তারা দেয়নি। একটি দেশ বাদে অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে এ সরকারটির সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে ভালো তো ছিলই না, বরং সম্পর্কের পারদ দিনে দিনে নিচে নেমে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় সম্পর্কোন্নয়নের তেমন কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। আর এ কারণে নির্ভরতার মূল কেন্দ্রের উপরে নির্ভরতা ষোলআনা নিশ্চিত হয়ে যায় অচিরেই। সংলাপসমঝোতার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সংলাপ সংলাপ খেলা এবং সমঝোতা সমঝোতা বলে চিৎকার করতে হয়েছে, মূলত আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই।

এ বিষয়টি বলা প্রয়োজন যে, আওয়ামী লীগের মতো একটি দল ক্ষমতায় না থাকলে নিরাপত্তা কৌশলগত দিকসহ সামগ্রিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুযোগসুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে বলে যারা বিশ্বাস করে তারা চায় না যে এমন একটি নির্বাচন হোক, যাতে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের সামান্যতম সম্ভাবনা থাকে। কাজেই পুরো বিষয়টিই অভ্যন্তরীণ এবং বর্হিঃদেশীয় কূটকৌশলের অংশ হিসেবে কাজ করেছে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে সরকার যে সত্যিকার অর্থে একদলীয় নির্বাচনের দিকে চূড়ান্ত যাত্রা শুরু করেছে তাতে আর কারো মনে কোনো সংশয়সন্দেহ নেই। আগে যাদের মনে সংশয়সন্দেহ ছিল তা আর রইলো না। সরকার ‘বোম্বাই হাজী’ হয়ে ফিরে আসবে, আসল লক্ষ্যে পৌঁছাবে না এমনটা যারা মনে করেছিল তারা সবাই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

একদলীয় নির্বাচনের বৈধতা এদেশে কখনো মেলেনি, ভবিষ্যতেও মিলবে এমনটা আশা করা যায় না। কারণ মানুষ যেমন এটা মানেনি বা মানে না তেমনি বৈধতা পাওয়া যায় না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও। ১৯৮৬, ১৯৯৬ নির্বাচনই এর সাক্ষী। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ জেনারেল এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে যে ঐতিহাসিক ভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিল, তার খেসারত তাকে দিতে হচ্ছে এবং বহুদিন দিতে হবে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি একটি একদলীয় নির্বাচন করে সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। আওয়ামী লীগ কথায় কথায় বিএনপিকে ১৯৯৬এর একদলীয় নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করে, খোটা দেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ আবার এত বছর পরে এসে আরো একবার বিপজ্জনক খেলায়, ভয়ঙ্কর পথে যাত্রা শুরু করলো। এখানে একটি বিষয় বলতেই হবে, এই ভয়ঙ্কর যাত্রা এবং বিপজ্জনক খেলায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন শেখ হাসিনা স্বয়ং। কারণ অন্যরা তার পাশে এখন থাকলেও ভবিষ্যতে তাকে একাই এর সমস্ত দায় এবং দায়িত্ববহন করতে হবে। এটি প্রশ্নাতীতভাবে সত্য, অন্যরা কখনো এর দায় এবং দায়িত্ব নেয় না।

অভ্যন্তরীণভাবে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে যে কতো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হলো তা তারা হয়তো বুঝতে পারছে না অথবা পারলেও ‘ফিরিবার পথ নাহি’ অবস্থায় পৌছে গেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দলটি যে কতো বড় সঙ্কটে পড়েছে তা তাদের পক্ষে চিন্তা করাও কঠিন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমী দুনিয়ার তাবৎ সব শক্তি ‘সব দলের’ অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছে এবং তারা এটা চায়ও। এমনকি চীনও নজিরবিহীন ভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ অবস্থায় একটি একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণায় বর্তমান সরকারের জন্য চরমভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক দুনিয়া সরকারের ব্যাপারে সীমাহীনভাবে সন্ধিগ্ধ করে তুলেছে। আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না তেমনি আন্তর্জাতিক বৈধতাও তারা পাবে না। যদিও বর্তমান সরকার মনে করছে টিকফা চুক্তির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব ইতিবাচক হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের এই হিসাবনিকাশে মস্তবড় ভুল আছে।

বরং একদলীয় একটি নির্বাচনে সরকার আন্তর্জাতিকভাবে নানা চাপের মধ্যে পড়বে বলেই মনে হয়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম যে ভাষা ব্যবহার করছে, ভবিষ্যতে তাদের অবস্থান যে আরো কঠিন হবে তাও বোধ করি সরকারের হিসাবের মধ্যে নেই। মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের উপরে শুনানি অনুষ্ঠান, ওই শুনানিতে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কর্মঅধিবেশনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা ও প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টিও খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই।

একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের কোনো পাত্তা তারা না দিতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ওই সব সংবাদমাধ্যমের বক্তব্যকে তাদের সরকার কিংবা সরকারগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাছাড়া সরকারের মনোভাব জেনেও তারা তাদের খবরাখবরগুলো লিখে থাকে। কাজেই হেলায়ফেলায় এসব সংবাদমাধ্যমের খবরগুলোকে উড়িয়ে দেয়া বোধ করি উচিত হবে না।

নিউইয়র্ক টাইমস গত ২০ নভেম্বর এক সম্পাদকীয়তে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে এও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, অধিকার লঙ্ঘিত হলে ভবিষ্যতে হয়তো এই দেশটির উপরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমস সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা এই সম্পাদকীয়টিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে, সরকার না নিলেও। কিন্তু এতো সব বিপদ ও ঝুঁকির কথা জেনেও সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী, কেন এক ভয়ঙ্কর খেলায় এবং বিপজ্জনক পথে যাত্রা শুরু করলেন? কারণ বিপদ যদি আসেই তাহলে বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি। জনগণের তো কোনো দোষ নেই।।