Home » রাজনীতি » নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগে গৃহদাহ

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগে গৃহদাহ

আবীর হাসান

political-cartoons-62দ্রুতই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে সব কিছু। চলছে আগুনের রাজনীতি আর বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী আছেন জনসমর্থনহীন উদ্ভট এক সরকার নিয়ে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করার জিদ ধরে বিরোধী নেতাদের জেলে পোরা হচ্ছে উস্কানি দেয়ার অজুহাতে। কিন্তু জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়ে ক্রমাগত হুমকিধামকিই দিয়ে যাচ্ছে সরকার। দায় চাপানোর চেষ্টার আগে সরকারের দায়দায়িত্ব পালনটাই যে জরুরি সেটাও যেন ভুলে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। আর সে কারণেই আস্থা হারিয়েছেন তিনি তাঁর দল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতা যে শুধু সাধারণ মানুষকেই শঙ্কিত করছে তা নয়, বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা যারা জেলাউপজেলা পর্যায়ে দায়িত্বরত তারাও রয়েছেন প্রচণ্ড ভীতির মধ্যে। সাধারণ নিরাপত্তার চাইতে বেশি নিরাপত্তা চাইছেন তারা। এদিকে সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দাবি করেছে বিএফইউজে ও ডিইউজে (একাংশ) গত বৃহস্পতিবার দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেয়া হয়েছে স্মারকলিপি। চুয়াডাঙ্গায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গ্রামের বাড়ির নিরাপত্তা বাড়ানোর খবরও পাওয়া গেছে ইতোমধ্যে। এদিকে, সামনের একদলীয় নির্বাচনের কারণে যে সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছে তাতে জেলাউপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে তাদের নিরাপত্তায় উদ্বেগ প্রকাশ করার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, স্কুল শিক্ষক যারা কিনা প্রধানত নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকেন নির্বাচনের দিন তারা হাতেপায়ে ধরছেন কর্মকর্তাদের, যাতে তাদের নির্বাচনী কোনো কার্যক্রমে রাখা না হয়। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এমন তদবিরও চলছে যাতে ওই স্থানটিতে ভোট কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা না হয়।

যে নির্বাচনের নিশ্চয়তা নেই সেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করিয়ে দলের মনোনয়নও দিলেন প্রধানমন্ত্রী আর এই মনোনয়ন নিয়ে এখন দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীনদের পক্ষপ্রতিপক্ষের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক, সংঘাত শুরু হয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে কয়েক স্থানে হরতালের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছিল। মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে যে গৃহদাহ শুরু হয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী নেভাবেন কিভাবে?

বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন – ‘ঘর পোড়ার মধ্যে দেয়া হয়েছে আলু পোড়া।’ কারণ একদিকে চলছে বিরোধী দলের জ্বালাওপোড়াও আন্দোলন, তার মধ্যেই আবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিতদের বিক্ষোভ অবরোধও চলছে। কিশোরগঞ্জ, সাভার, নড়াইল, মাদারীপুর, পিরোজপুর, কুষ্টিয়া, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলার একাধিক আসনের বিতর্কিত মনোনয়ন নিয়ে চলছে উত্তেজনা আর এই উত্তেজনার প্রকাশ দেখানো হচ্ছে সহিংসতার মাধ্যমেই। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে শৃঙ্খলাহীনতার বিষয়টি আবারও সামনে চলে এসেছে। নির্বাচন নিয়ে এখন যে কেবল বিরোধী দল প্রতিবাদমুখর তা নয়, ক্ষমতাসীন দলের বিক্ষুব্ধরাও হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদী। সে কারণেই হয়তো কিশোরগঞ্জে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য একটি পুরো এলাকাই বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। কিশোরগঞ্জ শহরের অন্যতম জনবহুল আবাসিক এলাকা আলোর মেলায় রয়েছে পাঁচটি নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথচ একটি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য ওই এলাকায় তিনটি প্রবেশ পথই বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে কোন যানবাহন প্রবেশ করতে পারছে না। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী একে বলছেন তুঘলকি কাণ্ড।

এক নির্বাচন নিয়ে পক্ষেবিপক্ষে যা চলছে তা আসলেই তুঘলকি কাণ্ড। কেউ কোন শৃঙ্খলার মধ্যে নেই এবং সর্বোপরি সুস্থতার মধ্যেও নেই। সর্বত্রই উদ্বেগ আতঙ্ক আর ক্ষোভ ভৌতিক বিশালত্ব নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। সে কারণেই অবচেতন থেকে বেরিয়ে আসছে অপ্রিয় সত্যও। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অবরোধে বাস পোড়ানোয় দগ্ধ আহতদের দেখতে। সেখানে গীতা সেন নামের এক দগ্ধ গৃহবধূ বারবার বলেছেন, ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না। আমরা অসুস্থ সরকার চাই না, আমরা ভালো সরকার চাই, অসুস্থ সরকার চাই না।’

কাঁদতে কাঁদতে বলা ওই গৃহবধূর কথাই যেন সারাদেশের মানুষের কথা। এদেশের মানুষ তো এই ক্ষমতার রশি টানাটানি থেকে তৈরি অশান্তি চায়নি। চায়নি এমন উদ্ভট সরকারের আমল যে সরকার সাংবিধানিক (!) কিন্তু গণতান্ত্রিক নয়। এ সরকার ফ্যাসাদ বাধায় কিন্তু দায়দায়িত্ব নেয় না। দায়িত্ব পালন বলতে বোঝে গ্রেফতার, গুলি চালানো আর রাস্তাঘাট বন্ধ করে আরও ভীতি সৃষ্টি করা। গত ছয় মাস ধরে যা করেছে এই সরকার তা তো এই যে, বিরোধী দলকে হাতে ধরে আন্দোলনে নামিয়েছে তারা। জনমনে উদ্বেগ আর ক্ষোভ সৃষ্টি তো বিরোধী দল আগে করেনি, করেছে সরকার। গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার ধার না ধেরে এক তরফা গোয়ার্তুমি করে দমন পীড়নের মাধ্যমে ‘সব ঠাণ্ডা করে দেয়ার’ নীতি নিয়ে এগিয়ে চলার কাজটাও তো সরকারই শুরু করেছে। নতুন নির্বাচনী নিয়মের সবক কে দিয়েছে? বিরোধী দল? উত্তর একটাই সরকার।

ক’দিন আগে এক প্রবীণ নাগরিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে কি মানুষ পাগল হয়ে যাবে না?’ এ প্রশ্নের উত্তর তিনি আশা করেননি। কারণ যথেষ্ট বুঝদার মানুষ তিনি শুধু তিনি বিস্ময়বোধ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলে থাকা পুর্নঃবয়স্ক মানুষগুলোর কি এই সাধারণ বোধটুকু নেই। দায়িত্বশীল আচরণ কেন তারা করছেন না। তিনি নিজেই বলেছিলেন ওরা নিজেরাই তো বিপদে পড়বে।

সপ্তাহ দুয়েক আগের এই কথাবার্তার পর আজ দেখতে পাচ্ছি ওই প্রেসক্রিপশনই ঠিক। প্রধানমন্ত্রী তার সরকার নিয়ে বিপদে পড়েছেন। বিরোধী পক্ষের ঘরভাঙা, জোট ভাঙার চেষ্টা বা জিদের আগুনে জ্বালিয়ে দেয়ার যে চেষ্টা সেটা তো সফল হয়ইনি, আগুন জ্বালিয়েছেন নিজেদের ঘরেই। এ আগুন অনৈক্যেরবিশৃঙ্খলার। অপ্রকৃত এক উদ্ভট নির্বাচনকে সামনে রেখে পছন্দের সন্ত্রাসী, স্নেহভাজন আর অর্থবানদের মনোনয়ন দিয়ে নিজেদের অগণতান্ত্রিকতার দৈন্য প্রকটভাবে প্রকাশ করে ফেলেছেন। জনগণের সামনে এখন তাদের অসুস্থতার প্রমাণের অভাব নেই। সে কারণে অগ্নিদগ্ধ গীতা সেন প্রধানমন্ত্রীর সামনেই বলতে পারলেন, ‘আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’

সরকারের এই উদ্ভট মানসিকতার খবর দেশ থেকে বিদেশে সর্বত্রই রটে গেছে। তবে তা রটনা থাকেনি। অঘটনের উৎস উস্কানিদাতা পক্ষ সব দায়ই এ সরকারের। মুখের কথায় তা আর ঝেড়ে ফেলা যাবে না। কারণ হাসের যে পালক গায়ে ছিল তা আর নেই। উপরন্তু নোংরা কাদায় লুটোপুটি খেয়ে চলেছেন তারা আর সেই কাদা মাখা বিস্তৃত চেহারাটা সবাই দেখছে। তবে আমাদেরও প্রশ্ন, কতদিন তা দেখতে হবে?