Home » মতামত » বাংলাদেশের একি দুর্ভাগ্য!

বাংলাদেশের একি দুর্ভাগ্য!

মো.মামুনুর রশীদ

freedom-of-thoughtসরকার ক্ষমতায় থেকেও গণমানুষকে অবজ্ঞা করছে, উপেক্ষা করছে তাদের আশাআকাঙ্ক্ষা, তাদের চিন্তাচেতনা। রাজনীতির দ্বন্দ্বে, ক্ষমতার লালসায় রাজনীতি আজ দানবের নীতিতে পরিণত হয়েছে। রাজনীতিতে দানবের মুখ দেখে গণমানুষ আজ বিভ্রান্ত, হতবাক আর দিশাহারা। এরই জন্য কি নয় মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা? এরই নাম কি গণতন্ত্র? গণতন্ত্রের বিকল্প কেবল গণতন্ত্র, গণহত্যা নয়। আজ দেশে চরম নৈরাজ্য, এক ঘোর অমানিশা। এ সংকট রাজনৈতিক সংকট, গণতন্ত্রের সংকট। সংকট উত্তরণে প্রয়োজন দুই পক্ষের সংলাপ। নিজ নিজ অবস্থানে বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে সংলাপ সম্ভব নয়। সংলাপের জন্য প্রয়োজন কাছে আসা, দূরত্ব কমিয়ে আনা। একটা আবহ তৈরি করা। পরস্পর ন্যূনতম বিশ্বাস স্থাপন করা। বিশ্বাসের ক্ষেত্র তৈরি করা। এতকিছুর পরও যদি সংলাপের কথা বলা হয় তাহলে দুই রাজনৈতিক দলের ইগোতে টানাপোড়েন বাঁধবে।

সংলাপের সম্ভাবনা আর নেই। রাজপথ গড়ে উঠেছে কিছু সরু গলিতে। তবু ঘোর অমানিশায় মানুষের আশার দ্বার খোলা রয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর ধর পাকড়ের মাঝে বিএনপি সারা দেশে হরতাল, অবরোধ ডাকছে। হরতাল জনজীবনে এক অমানবিক দুর্ভোগ নিয়ে আসে। জীবনযাত্রা স্থবির করে দেয়। চলমান দেশ যেন থেমে যায়, আটকে যায়, পক্ষাঘাতগ্রস্থতায় রুপ নেয়। আসে ঝাঁকে ঝাঁকে সন্ত্রাসী, দস্যু, তারা আগুন দেয়, হত্যা করে, বোমাবাজি করে। নেমে আসে মৃত্যুপুরী।

এরপরও সরকার চরম মরিয়া সবদলের নামে একপক্ষীয় নির্বাচন করতে। বিরোধী দলসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে চায় নিরপেক্ষনির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চরম অস্থিরতা ও সহিংসতার আবহে চরম আস্থাহীনতার মধ্যে এ সরকারের নেতৃত্বে নির্বাচন কখনোই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে পারে না । এ অসম্ভব। কিন্তু সরকার অনড়, সে স্থির তার সিদ্ধান্তে এবং সে তা জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়। বিরোধী দল বলে চলেছে, সরকারের রচিত নির্বাচন নাটকে পার্শ্বচরিত্রে সে অভিনয় করবে না, নির্বাচনকে বৈধতা দেবে না।

গোটা দেশ আজ সত্যি অশান্ত। দেশে এক চরম উত্তেজনা, অস্থিরতা। চলছে হরতাল,অবরোধ, বিক্ষোভ, সভাসমাবেশ। দেশের সাধারণ জনজীবন বিপর্যস্ত। সরকার বেহাল। উৎপাদন, বাণিজ্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থনীতি দিন দিন ধসে যাচ্ছে। রপ্তানি বন্ধ। যানবাহন বিকল। বন্দর, রাজপথ অচল। অবরুদ্ধ বাংলাদেশ!

১৮ দলীয় জোটের ডাকা একেরপর এক টানা অবরোধে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সমঝোতা না হলে দেশে সহিংসতা ও নাশকতা আরও বাড়বে ভেবে সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। বস্তুত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ হানাহানি অব্যাহত থাকলে মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই শুধু নয়, ব্যবসাবাণিজ্য, আমদানিরফতানিসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, শিক্ষা কার্যক্রম, চিকিৎসাসেবা, ভ্রমণএক কথায় সকল কর্মকান্ডই ব্যাহত হচ্ছে। এতে যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশ ও জনগণের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কাছে ক্ষমতাটাই বড়। সাধারণ মানুষ, এমনকি দলীয় কর্মীও যদি রাজনৈতিক দলের হঠকারী কর্মসূচির কারণে মারা যায়, তাহলেও তাদের কিছু যায়আসে না।

লক্ষণীয়, সহিংসতা ও নাশকতার জন্য সরকার তথা ক্ষমতাসীনদের টার্গেট করা হলেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ধ্বংস করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, যা ব্যবহার হয় সাধারণ মানুষের জন্য। সেক্ষেত্রে যারা এসব ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত, তাদের বিবেক, নীতিনৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এসব সহিংস কর্মকান্ড সরকারকে তার অবস্থান থেকে সামান্যও টলাতে পারছে না। দেশের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের জন্য কি তাহলে শুধু বিরোধী দলকেই দায়িত্ব নিতে হবে? সরকার দলের কোন দায়িত্ব নেই? কিন্তু বাস্তবতা হল ভিন্ন, ১৮ দলীয় জোট একের পর এক হরতালঅবরোধ দিয়ে গেলেও সরকারের মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সহিংসতা ও নাশকতায় ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার সরকারও এড়িয়ে থাকতে পারে না। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, দেশে ৯০’ পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশে সহিংসতা, প্রতিহিংসা,হানাহানি, রাহাজানি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। চলমান সংকটের সহিংসতার পরিসংখ্যানে দেখতে পাওয়া যায় রাজনৈতিক সহিংসতায় গত ২২ বছরে প্রাণহানি হয়েছে ২৫৬০ জন মানুষের। এতে ২২ বছরে ক্ষমতাসীন দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনামলে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের একটি তুলনামুলক হালচাল। ১৯৯১ সালের জুন থেকে ১৯৯৬ সালের মে পর্যন্ত ক্ষমতাসীন বিএনপির আমলে ১৭৪ ব্যক্তি; ১৯৯৬ সালের জুন থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসনামলে ৮৯৮ জন; ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি আমলে ৮৭২ জন এবং বর্তমান সরকারের আমলে (২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) ৬১০ জন লোক নিহত হয়েছেন। অবশ্য ২০০৬ সালের অক্টোবরনবেম্বরডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের লগিবৈঠা আন্দোলন ও হরতাল অবরোধের সময় তাদের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত ৮৭ ব্যক্তির হিসাব এখানে নথিভুক্ত করা হয়নি। আবার তাদের চলতি আমলের সংখ্যাও বিতর্কিত। তথাপিও এদের বাদ দিলে বিএনপি আমলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ১০৪৬ জন এবং আওয়ামী লীগ আমলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৫২ জন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি আমলের চেয়ে পাঁচ’শতাধিকের বেশিসবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচন নিয়ে যে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার সূত্রপাত সরকারেরই একটি সিদ্ধান্ত থেকে। তাই বিরোধী দলকে নির্বাচনের ব্যাপারে আস্থায় আনার দায়িত্বটি সরকারকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সরকার এড়াতে পারে না।

নির্বাচন নিয়ে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধান করা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি সময়োচিত সিদ্ধান্তই পারে জাতিকে এ সংকট থেকে উদ্ধার করতে। জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জার্মানি, রাশিয়া, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান সত্ত্বেও আন্দোলন পরিহার করছে না বিএনপি । কারণ শেখ হাসিনা সরকার বিরোধীদলের প্রস্তাব মেনে নেয়নি। সরকারই কঠোর পথে পা বাড়াতে বাধ্য করেছে বিএনপিকে। জনগণের জানমাল ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব এখন সরকারের। রাজনৈতিক সহিংসতা ও নাশকতার শিকার আজ দেশের সাধারণ মানুষ। সহিংস হরতাল অবরোধে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। ভীতিকর অবরোধ হরতালে কিশোরকিশোরী, রিকশাচালক, বাসচালক, টেম্পোচালক, অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আক্রান্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতাই কাম্য। যার মাধ্যমে দেশের জনগণকে একটি সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক ধারার নির্বাচন উপহার দেয়া যাবে। না হলে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশ একেবারেই অচল হয়ে পড়বে।।

সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী

mamunhist39@gmail.com