Home » রাজনীতি » শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বিপ্লব

শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বিপ্লব

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

paper-cutting-6শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসতে চান। আসতে চান কি, তিনি তো ক্ষমতায় রয়েছেনই। নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের ধারায় প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তিনিই ক্ষমতায় আছেন। শেখ হাসিনার দাবি, উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে দ্বিতীয়বারের মত তাকে ক্ষমতায় আসতে হবে। শুধু তাই নয়, জঙ্গিবাদ নির্মূল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করা, মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে পূনর্বার তার শাসন জারি রাখা দরকার। এ বিষয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা, তার পুত্রের বক্তব্য আরো সরল-“বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ, হিন্দু, সুশীল সমাজকে মারবে।” সুতরাং প্রতিক্রিয়াশীল এই শক্তিকে ঠেকাতে ও সাংবিধানিক ধারা অক্ষুন্ন রাখতে প্রয়োজনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বিএনপিকে ছাড়াই একটি নির্বাচন করতেই হবে। এই ধারাবাহিকতার যারা সমর্থক তারা বলেও ফেলেছেন, শেখ হাসিনা পুনর্বার নির্বাচিত না হলেও সব অর্জন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হওয়া জরুরী বলেও তারা মনে করেন।

ইতিহাসের দিকে ফেরা যাক। মুশকিল হচ্ছে, এই ভূখন্ডে কেউ কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে, এ রকম নজির নেই। ইতিহাসের অমূল্য শিক্ষাটি হচ্ছে, বাংলাদেশ জন্মের পর নির্বাচনবিহীন একদলীয় শাসন কায়েম করে ভুলটি করেছিল আওয়ামী লীগ, দ্বিতীয় বিপ্লবের আকাঙ্খায়। সেই ভুলের ভয়াবহ পরিনাম এবং ট্রাজেডি গোটা দেশ ও জাতিকে নিক্ষিপ্ত করেছিল এক অন্ধকার গহবরে। ইতিহাসের সব ভুলের ফল হয়তো একরকম নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতাগুলি মূল্যবান। বাকশাল কায়েম করার সময় জাতীয় সংসদে সংশোধনী এনেছিল আওয়ামী লীগ। সে সময়েও পার্লামেন্টারি শাসন ব্যবস্থার নামে প্রথমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা বহাল ছিল। ফলে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দেশের ভবিতব্য নির্ধারন করে দেয়া হয়েছিল একদলীয় ব্যবস্থার দিকে। আর এটি করা হয়েছিল সেই ‘ব্রুট মেজোরিটি’র জোরেই। জাতীয় সংসদে সংশোধনী আনতে গিয়ে শেখ মুজিব বলেছিলেন, “আমি টু থার্ড মেজরিটি, তবু আপনারা এমেন্ডমেন্ট করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করেছেন। এই সিটে (প্রধানমন্ত্রীর) আমি আর বসব না, এটা কম দুঃখ নয় আমার স্পিকার সাহেব, তবু আজকে আমূল পরিবর্তন করেছি। শাসনতন্ত্র উত্তরণে সুষ্ঠ শাসন কায়েম করতে চাই। This is our second revolution, second revolutionআমাদের। এই revolutionএর অর্থ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এর অর্থ অত্যাচারঅবিচারনির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আমি চাই এই হাউস থেকে স্পিকার সাহেব, আপনার মাধ্যমে দেশবাসী দলমত নির্বিশেষে সকলকে বলব, দেশকে ভালবাস, জাতির চারটি প্রিন্সিপলকে ভালবাস। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজম। তোমরা আসো, কাজ করো, দরজা খোলা।” (সূত্র: ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বাকশাল গঠনে চতুর্থ সংশোধনী পাশের প্রাক্কালে জাতীয় সংসদে শেখ মুজিবের ভাষন, গ্রন্থ: বাঙালি কন্ঠ, পৃ: ৩৭৩)

প্রায় অর্ধশত বছর পরে জাতীয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বদলের মধ্যেও বাংলাদেশে ভিন্ন আদলে ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করার জন্য ক্ষমতাসীনরা সকলের মতামতইচ্ছে, সবকিছুই উপেক্ষা করে চলেছেনইতিহাসের কোন শিক্ষা মাথায় না রেখেই। অর্ধশত বছর পরে সে সময়ের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে একটি মিল রয়েছে। এবারেও জাতীয় সংসদে তার রয়েছে ব্রুট মেজোরিটি। সঙ্গে রয়েছে সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ। এই জোরেই শুধুমাত্র ব্যক্তির আকাঙ্খা চরিতার্থ করার জন্য পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য ভিন্ন আদলে ইতিহাসের পুনরাবৃক্তি ঘটানো হয়েছে। তফাৎ শুধু কখনো এটিকে সর্বদলীয় বা বহুদলীয় নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এবার জঙ্গিবাদ নির্মুলে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দমনে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করতে সংবিধান থেকে চুলমাত্র না নড়ে শেখ হাসিনা’র পুনর্বার প্রধানমন্ত্রী হবার বিষয়টি অনেকটা দ্বিতীয় বিপ্লবের সমান গুরুত্ব পেয়েছে। সে কারনেই একপক্ষীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হলেও এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় বিপ্লবের সেই স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় এরকম স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা না থাকলেও সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে ইতিমধ্যেই শত শত প্রান ঝরে গেছে। শত শত কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। হিংসা, হানাহানি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। ক্ষমতাসীনরা বা বিরোধীরা কথায় কথায় জনগণকে রাষ্ট্রের ও ক্ষমতার মালিক বললেও সেই জনগনের ওপরেই তারা চড়াও হয়েছেন সর্বশক্তি নিয়ে, প্রতিদিন রক্তাক্ত করছেন জনপদশুধুমাত্র ক্ষমতার উদগ্র বাসনায়। ফলে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেনীর এখন ত্রাহী অবস্থা। এর প্রভাব সবার আগে পড়ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। শেখ হাসিনার রাজত্বকালেই সংঘটিত রামুর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ঘটনার সুষ্ঠ বিচার হয়নি। সাম্প্রতিককালে পাবনায় একজন মন্ত্রীর পেটোয়া বাহিনীর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোন প্রতিকার হয়নি। ধরেই নেয়া যায়, সমঝোতা হচ্ছে না, পরিনামে হিংসা এবং ধ্বংস ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। এরকম পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুরা একেবারেই বিপন্ন হয়ে পড়বে। কারন বৈষ্যিক পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলিতে আরব বসন্তের পরে রাজনৈতিক সংঘাতে সংখালঘুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক সংকট রক্তাক্ত সহিংসতায় নতুন মোড় নিয়েছে। প্রতি মুহুর্তে নতুন নতুন ঘটনা ঘটছে। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমের খবরে ধারনা করা হচ্ছিল, আওয়ামী লীগ ভারতের একচ্ছত্র সমর্থন পেয়েছে। ভারতের এই নীতিকে সমর্থন দিচ্ছে মার্কিনীরা। কিন্ত বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, গত কয়েকদিনে মার্কিন কংগ্রেসে এবং ইউরোপিয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টে, মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়, আগামী ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব ও ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সহকারী মহাসচিবের সফরসবমিলিয়ে ধরে নেয়া যায় বাংলদেশের রাজনীতিতে মার্কিনইউরোপিয় আকাঙ্খা প্রধান্য পেতে চলেছে। ভারতের সমর্থন ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা ক্রমশ: একা হয়ে পড়ছেন।

সাম্প্রতিক কালে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিলে এটি পরিস্কার যে, পরস্পরবিবোধী দু’টি আন্তর্জাতিক বলয় এখানকার রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে। বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সমাস্তরালে চীনের তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। এর সঙ্গে যুক্ত জাতিসংঘের তৎপরতা আরো বৈচিত্রময় করে তুলেছে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট। প্রতিবেশী পরাশক্তি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ বিষয়ক অবস্থানগত ভিন্নতার কারনে অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক জটিলতর করে তুলছে।

এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগোচ্ছেন একটি একক নির্বাচনের দিকে। ফলে রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট চরম অনিশ্চিয়তায় এই মূহুর্তে অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো হচ্ছে, দশম সংসদ নির্বাচন কি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে? বিএনপি কি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে? শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত কথিত বহুদলীয় সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারবে? নির্বাচন যদি না হয় তাহলে কি এই সংসদ বহাল থেকে সরকার চালু থাকবে? সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি অবস্থান নেবে? কোন অসাংবিধানিক শক্তির ক্ষমতা গ্রহনের সম্ভাবনা কতটা? এরশাদের পরবর্তী কোন ডিগবাজি বা জামায়াতের ভয়াবহ সহিংসতা কি অব্যাহত থাকবে? শেষতক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কূটকৌশলে এবং ভারতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে? কোটি টাকা মূল্যের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সম্ভবত: আগামী সপ্তাহের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব ও জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব’র সফরের পরপরই সকলের অবস্থানই পরিষ্কার হয়ে উঠবে। এখন অপেক্ষার বিষয়, আগামী বাংলাদেশের ভাগ্যে কি লেখা আছে!