Home » রাজনীতি » সেই সব সোনার ছেলেদের হাতে আইনী ক্ষমতা

সেই সব সোনার ছেলেদের হাতে আইনী ক্ষমতা

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

biswajeet-murder-3গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শান্তি ভঙ্গকারীদের’ বিরুদ্ধে এবং ‘জনগণের জানমাল রক্ষায়’ এগিয়ে আসার জন্য আহবান জানিয়েছেন তারই দলভুক্ত সংগঠন যুবলীগ নেতাকর্মীদের। এই আহবানের মধ্যে নির্দেশ রয়েছে, আর এ নির্দেশ শুধুমাত্র যে যুবলীগের নেতাকর্মীদের দেয়া হয়েছে তা নয়। এ নির্দেশ দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে যে বিরোধী দল রাস্তায় আছে তাদের রাস্তায় নামার আহবান জানিয়ে বলেছেন, ‘রাস্তায় নামুন, দেখি কেমন আন্দোলন করতে পারেন।’ একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তো দূরে থাক, কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ জমিজমা সংক্রান্ত মারামারির কারণে চির বৈরী প্রতিবেশীকে পর্যন্ত এমন ভাষায় হুমকি দেন না। আর যদি দেনও তাহলে যাকে ওই হুমকি দেয়া হবে, তিনি নির্ঘাত চলে যাবে থানা মামলা রুজু করতে অথবা স্মরণাপন্ন হবেন আইনআদালতের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে, বিশেষ করে এমন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তো আর কোনো আইনআদালত, থানাপুলিশ চলে না। এখানে দুটো বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক. যুবলীগসহ তার দলের নেতাকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব হাতে তুলে দিয়েছেন। দুই. যেখানে দেশজুড়ে এমনিতেই নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন চলছে, মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে তার এ বক্তব্য আরও উস্কানিমূলক।

গণতান্ত্রিক দেশ যদি হয় তাহলে সরকার এবং দল আলাদা আলাদা অবস্থায় অবস্থান করে ভারসাম্য রক্ষার নীতির স্বার্থে। ন্যূনতম গণতন্ত্র চর্চ্চাকারী দেশগুলোতে দল এবং সরকারকে আলাদা সত্তা হিসেবেই দেখা হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোটি তেমন নয়। এখানে দেশের চেয়ে সরকার বড়, সরকারের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে নেত্রী বড় এমন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি বিদ্যমান। এ এক ভয়ঙ্কর মানসিকতা। এই পরিস্থিতিতে দলের হাতে আইনশৃঙ্খলা বা জানমাল রক্ষার ‘সুমহান’ দায়িত্ব ‘মহান’ সব যুবলীগছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে ছেড়ে দেয়া বা তাদের যুক্ত করার ফলাফল কি হতে পারে তা বর্তমান এবং এই সরকারের অতীত থেকে মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারেন। যে যুবলীগের সভায় বসে প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের নেতাকর্মীদের এমন দায়িত্ব দিলেন সে যুবলীগ বা অন্য অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের ভূমিকা কি তা তাদের কর্মকাণ্ডে নারীরা বুঝতে পারেন, বুঝতে পারেন তার অভিভাবকেরা এবং সর্বোপরি বিভিন্ন সময় নির্যাতিতনিগৃহীত মানুষজনসহ সবাই। এটা ভালো বুঝতে পারেন বিশ্বজিতের বাবামা আত্মীয়স্বজন সবাই। বুঝতে পারেন যুবলীগছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীনদের হাতে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের স্বজনরা। চাঁদাবাজিটেন্ডারবাজি, প্রকাশ্যে রাজপথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা, যৌন নির্যাতনসহ অনেক ঘটনার সঙ্গে এরা জড়িত। অস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য মিছিলসমাবেশ ভেঙে দেয়া, বাধা দেয়ার অগুনতি ঘটনা কি এসব সংগঠনগুলো ঘটায়নি? আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সামনে অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া দেয়া এবং গুলি ছোঁড়ার ঘটনার ছবি কতোবার, কতো দফায় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে? টেন্ডারবাজিতে মারধর, সশস্ত্র মহড়া, সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাটে তাদের হাতে কতো হাজার মানুষকে নির্যাতিতনিগৃহীত হতে হয়েছে? শুধু তাই নয়, অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই দ্বন্দ্ব সংঘাতে সংঘর্ষে কতো দফায় তারা জড়িয়েছে, কতোজনকে তারা নিজেরা নিজেরাই হত্যা করেছে? যুবলীগের সহোদর ছাত্রলীগ ওই সব গুণে গুনান্বিত তো বটেই, এর উপরে শিক্ষাঙ্গনে যৌন সন্ত্রাসসহ যে তাণ্ডব তারা ঘটিয়েছে তা অবর্ণনীয়, অশ্রুতপূর্ব, অভাবনীয়? কতো মেধাবী ছাত্র তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে জীবন দিয়েছে? ছাত্রাবাস পুড়ানো, শিক্ষাঙ্গনে আসবাবপত্র বেচে দেয়া, শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা থেকে শুরু করে এহেন অপকর্ম নেই, যা তারা করেনি। ক্ষমতা দখলের দিন থেকেই ওই সব সোনার ছেলেদের অসংখ্যবার দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে বিরোধী দল দমনের মহান দায়িত্ব পালন করতে। সোনার ছেলেরা, যুবকেরা সে সব কাজ সুষ্ঠু, সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। সন্তুষ্ট হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী এবং দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা।

এবারে শান্তি বজায় রাখা এবং জানমাল রক্ষার নামে পুনরায় তাদের দায়িত্ব দেয়ার মধ্যদিয়ে চলমান চরম অস্থির পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তাই এখন আমজনতার চরম আতঙ্কের বিষয়। ইতোমধ্যে এর ঢেড় আলামতও পাওয়া যাচ্ছে। সংবাদ আসছে তাদের কর্মকাণ্ডের, এদিকওদিক থেকে।

এদিকে সংবাদ মাধ্যমে চলমান সংঘাতসংঘর্ষসহিংসতার খবর কিভাবে ছাপতে হবে, কিভাবে ছাপা উচিত তার নীতিমালা দিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। তিনি হরতালঅবরোধ চলাকালে ওই সব কর্মকাণ্ড নয়, যারা এটা করছে তাদের ছবি প্রকাশে আহবান জানিয়েছেন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহত হওয়াদের দেখতে গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখানে তিনি বলেছেন, কিভাবে টেলিভিশন সাংবাদিকদের ছবি তুলতে হবে, কাদের সংবাদ প্রকাশ করতে হবে, কাদের চিহিৃত করে তা প্রকাশ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী ওই সময় এও স্মরণ করিয়ে দেন যে, অধিকাংশ টেলিভিশনের অনুমোদন তার সরকারই দিয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকেরই ২০০৫২০০৬ সালের ঘটনাবলীর কথা মনে পরে যায়। কিন্তু তাদের তা মনে পড়ে না।

যেকোনো সুস্থ, বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষই হরতালঅবরোধের নামে নৈরাজ্য, ভাংচুর, মানুষকে নাজেহাল করা, অগ্নিদগ্ধ করার পৈশাচিক ঘটনার নিন্দা না জানিয়ে পারে না এবং আমরা সকলেই এর তীব্র নিন্দা জানাই। সবাই চায়, এর অবসান হোক। কিন্তু কয়েকটা বিষয় খটকা লাগে। এ মেডিক্যালের অনতিদূরেই একজন অফিসগামী সরকারী কর্মচারীকে দিগম্বর করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। আরো মনে পড়ে বহু ঘটনা। কিন্তু অতীত নিয়ে পড়ে থাকাটা কোনো সুস্থতার লক্ষণ নয়। আরও একটি বিষয়ে খটকা লেগেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত গীতা সেনের অসংখ্য প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা এবং উপলব্ধির তো কোনো জবাব প্রধানমন্ত্রী দিলেন না। গীতা সেনের ওই সব সঙ্গত প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা, উপলব্ধি দেশের আমজনতার মনোভাবেরই কিঞ্চিৎ বহিঃপ্রকাশ এবং প্রতিফলন। কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাব প্রধানমন্ত্রী দিতে পারবেন না।

প্রধানমন্ত্রী জবাব দেন কিংবা নাই দেন সোনার ছেলেরা বসে নেই। তার দেশপ্রেমিক নেতাকর্মীরা সরব, সোচ্চার। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরের দিনই ঢাকায় আরটিভি’র দু’জন সাংবাদিককে কর্মরত অবস্থায় বেদম পিটুনি দেয়া হয়েছে এই বলে যে, তারা সঠিক সাংবাদিকতা করছিলেন না। তারা বোমা হামলার ছবি এবং অবরোধকারীদের ছবি তুলছিলেন, খবর সংগ্রহ করছিলেন মাত্র। পরে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে। সাংবাদিক বলেই জীবন রক্ষা, নতুবা কি ঘটতে পারতো বলা মুশকিল। এখন সাংবাদিকতার নীতিমালা এবং সাংবাদিকদের করণীয় ঠিক করে দেবে ক্ষমতাসীন দলের ওই সব মহাপ্রশ্নবোধকধারী ব্যক্তিবর্গ। পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটও তাদের কথায় সাংবাদিকদের রিমাণ্ড দিয়ে দিয়েছে। তাদের নামে উস্কানির অভিযোগ আনা হয়েছে।

দু’জন টিভি সাংবাদিকদের যদি উস্কানির দায়ে দায়ী করতে হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে তার বক্তব্যের জন্য কোন দায়ে দায়ী করা হবে? যে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী মুড়িমুড়কির মতো কথায় কথায় গুলি চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা হবে? যে সব ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে রাজপথে কাউকে কেয়ার না করে হামলা চালায় তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা হবে? ক্ষমতাসীন যে সব নেতাকর্মী তাদের অবিরাম বক্তব্যে কুরুচিপূর্ণ কথা এবং অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকে এবং প্রতিপক্ষের উপরে হামলা চালানোর জন্য উস্কানি দেন তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা হবে? কিন্তু কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হবে না, কারণ তারা ক্ষমতাসীন দলের।

সংবাদপত্র এবং সংবাদ মাধ্যমের উপরে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরই একটা ক্রোধ কাজ করে। এটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিনা জানা নেই। এর বহিঃপ্রকাশ সবাই দেখছে টকশোতে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপারে আক্রমণাত্মক বক্তব্যের মধ্যদিয়ে। সংবাদ মাধ্যম বন্ধ করা, ইউটিউব, ফেসবুক বন্ধ করার প্রসঙ্গ যেহেতু সবারই জানা তাই এ নিয়ে মনে হয় আলোচনার প্রয়োজন নেই।

তবে এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, দুটো কারণে এমনটা হয়ে থাকে এক. স্বৈরাচারের মূল প্রবণতা হচ্ছে তারা ভিন্ন মত সহ্য করতে পারে না। কোন প্রতিপক্ষ থাকুক তা তারা চায় না। দুই. আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট ভীতি। আর এ কারণে ওই ভীতি সৃষ্ট ভীতির সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ এসব কর্মকাণ্ডগুলো।।