Home » অর্থনীতি » এশীয় প্রশান্ত মহাসাগর :: চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র

এশীয় প্রশান্ত মহাসাগর :: চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার সামরিক জোটে রাজি নয়

ফ্রন্টলাইন অবলম্বনে মোহাম্মাদ হাসান শরীফ

india-usaযুক্তরাষ্ট্র আবারো এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছে। একদিকে ওই অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখে দেওয়া তার লক্ষ্য। একসময়ে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাট ভূমিকা ছিল। ১৯৫০ সাল থেকে তারা এখানে দুটি যুদ্ধ করেছেএকটি কোরিয়ান উপদ্বীপে, অপরটি ইন্দোচীনে। এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনী ফিলিপাইনে যুদ্ধ করেছে। সেখানে প্রথমে তারা স্প্যানিশ উপনিবেশ শাসকদের বিরুদ্ধে এবং তারপর ফিলিপিনো জাতীয়তাবাদী বাহিনীর বিরুদ্ধে নেমেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি রাজকীয় বাহিনীকে পরাস্ত করার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিয়েছিল। তবে এখন ওই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারে জাপান তার প্রধান মিত্র। জাপানে ক্ষমতাসীন সরকারের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন এ ব্যাপারে আরো উৎসাহ পাচ্ছে। এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটন তিন লাখ ২০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে। আসলে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর ৬০ শতাংশই এখানে রেখেছে। জাপানকেই যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মিত্র বিবেচনা করছে। এরপর রয়েছে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়া। আধিপত্য বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের দিকে হাত বাড়িয়েছে। ভারত অবশ্য এখন পর্যন্ত জাপান বা ফিলিপাইনের মতো পূর্ণমাত্রার সামরিক জোট গঠন করার প্রস্তাবটি গ্রহণ করেনি।

জাপান সরকারের শান্তিবাদী সংবিধান পরিবর্তন করে সামরিক বাহিনী শক্তিশালীকরণ এবং ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা জোট গঠনের প্রতিও সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ভারতসহ চীনের প্রায় সব এশীয়ন প্রতিবেশির সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে। অথচ ওই দেশগুলোর সঙ্গে চীনের নানা মাত্রার সম্পর্ক ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় এলাকার বিভিন্ন দেশে ঘাঁটিগুলোতে সেনা, বিমান মোতায়েন করে ফেলেছে। এগুলোকে সাময়িক ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও কার্যত স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ঘাঁটির অস্তিত্ব রয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে, তারা অস্ট্রেলিয়ায় আরো আড়াই হাজার সৈন্য মোতায়েন করবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রে যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, চীনের ব্যাপারে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবেকে কঠোর কূটনীতিক ও সামরিকনীতি গ্রহণ করতে এবং এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের ‘বৃহত্তর দায়দায়িত্ব’ গ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনকে ‘সংযত’ রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র জাপানে নতুন একটি ড্রোন ঘাঁটি দিচ্ছে।

সম্প্রতি টোকিওতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হ্যাগেল বলেছেন, আমেরিকা জাপানের নিরাপত্তাকে সার্বিক সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে সংঘাত

চীন ও জাপান পূর্ব চীন সাগরে কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ঝগড়া করছে। জাপানে এসব দ্বীপ সেনকাকু এবং চীনে দিয়াওয়ু নামে পরিচিত। এই ঝগড়া যাতে আরো তিক্ততার দিকে গড়ায় তাই কামনা করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৯৫ সালে চীনজাপান যুদ্ধের সময় জাপান প্রথমে দ্বীপগুলো দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে এসব দ্বীপের ওপর চীনা সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়। কিন্তু তবুও যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপগুলো জাপানকে দিয়ে দেয়। বেইজিং ও টোকিও এ নিয়ে একটা সমঝোতায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু গত বছর জাপান হঠাৎ করেই ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের দ্বীপগুলো কেনার ব্যাপারে অনুমতি দিয়ে দেয়।

চীন মনে করে, দ্বীপপুঞ্জগুলো তার প্রতিরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। তার মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র জাপান যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, সেটা তাকে সামরিকভাবে কোনঠাসা করার পদক্ষেপ। ফলে চীন ও জাপানের নৌবাহিনী কোনো কারণে মুখোমুখি হয়ে গেলে তা থেকে সামরিক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে মিত্র হিসেবে জাপানের সাহায্যে ছুটে আসতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধাবস্থায় জাপানকে সহায়তা করার বাধ্যবাধকতাপূর্ণ একটি চুক্তি ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সেরে রেখেছে। ফিলিপাইনের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের একটি চুক্তি রয়েছে।

কেবল জাপান নয়, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ব্রুনেই ও মালয়েশিয়ার সঙ্গেও দক্ষিণ চীন সাগরের সীমানা নিয়ে চীনের বিতর্ক রয়েছে। চীন আলাদা আলাদাভাবে বিষয়টি নিয়ে দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। ওবামা প্রশাসন জানিয়েছে, তারা এই বিতর্কে মধ্যস্ততা করতে চায়। কিন্তু একই সময়ে আলোচনার টেবিলে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনকে উৎসাহিত করছে। চীনও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তারাও ওই এলাকায় টহল জোরদার করেছে। তারা ওইসব এলাকায় খনিজসম্পদ অনুসন্ধানের কার্যক্রমও জোরদার করেছে।

গত অক্টোবরেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরের আঞ্চলিক ভূখণ্ডগত বিতর্কে হস্তক্ষেপের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দুই মিত্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। আবার বালিতে ত্রিপক্ষীয় সংলাপে মার্কিন, জাপানি ও অস্ট্রেলীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে পূর্ব চীন সাগরের বিদ্যমান অবস্থা পরিবর্তনে যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে চীনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

অবশ্য, দক্ষিণ কোরিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো মিত্র বেইজিংয়ের সঙ্গে এখনই সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। বিশেষ করে জাপানে অ্যাবে এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ক্ষমতায় ফিরে আসার পর চিন্তিত। দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি জাপানের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার ব্যাপারেও আপত্তি জানাচ্ছে। অধিকন্তু, কোরিয়া যখন জাপানের উপনিবেশ ছিল, তখন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানি সেনাবাহিনী সেখানে যুদ্ধাপরাধ করার কথা অ্যাবে এবং তার সিনিয়র সহকর্মীরা অস্বীকার করায় সিউল ক্রুদ্ধ হয়েছে। তাদের অস্বীকারে কোরিয়ায় জাপানবিরোধী মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। এই দুই দেশের মধ্যেও সমুদ্রসীমা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ কারণে দক্ষিণ কোরিয়া এখনই চীনের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোট গড়া সত্ত্বেও। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও জানে চীন কিন্তু সিরিয়া নয়। ফলে এখানে ইচ্ছামতোই সবকিছু করতে পারবে না।।