Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

এক রহস্যময়ী নারী

ফারুক চৌধুরী

oil-goldজাতিসংঘ প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছে এক নারীর নাম। তিনি যেন নায়িকা। তিনি আজিজা কুলসুম গুলাম আলি। মিসেস গুলাম আলির কয়েকটি পাসপোর্ট। তিনি থাকেন কখনো বুকাভুতে, কখনো ব্রাসেলসে, কখনো বা নাইজেরিয়াতে। ব্যাপারটি নির্ভর করে তার কাজের ওপরে। এ মিসেস ইতিপূর্বে বুরুন্ডিতে গৃহযুদ্ধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বুরুন্ডিতে একদল বিদ্রোহীকে অস্ত্র ও অর্থ যোগান দিয়েছিলেন। এরপরে তিনি নতুন জোট গড়ে তোলেন রুয়ান্ডার সরকারের সঙ্গে, হয়ে ওঠেন কিগালি সরকারের বড় মিত্র। মিসেস গুলাম আলি রুয়ান্ডা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সোনা, কোলটান ও ক্যাসিটেরাইট ব্যবসায়ে জড়ান। এর আগে তিনি জড়িয়ে ছিলেন বুরুন্ডির হটুদের সুবিধার্থে অস্ত্র, সোনা ও গজদনড চোরাকারবারে। সিগারেট চোরাচালানেও তার নাম শোনা যায়। বেআইনি ব্যবসাকে তিনি আড়াল করতেন তার সিগারেট ফ্যাক্টরি দিয়ে। সে কারখানা আজ লাটে উঠেছে। কোলটান ব্যবসায়ে তার খদ্দেরদের মধ্যে রয়েছে স্টার্ক, কোগেকম, সোগেম। বড় দুটি ব্যাংক তার আর্থিক লেনদেনের কিছুটা সামাল দেয়। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা কয়েকবার অনুরোধ জানালেও বেগম গুলাম আলি তাদের সঙ্গে দেখা করেননি। এ প্রতিবেদন রচনাকালে কোলটান রফতানি ব্যবসায়ের একচেটিয়া আয়োজনের প্রধান হয়ে ওঠেন তিনি। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জাল নোটও তৈরি করেন। তিনি শুল্ক সংক্রান্ত কাগজপত্র জাল করেন। তিনি বলেছেন, ‘এ ব্যবসায়ে সবাই এটা করে।’ বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছেন কোলটান রফতানির কোম্পানিগুলোর মধ্যে জুয়াচুরি ব্যাপক।

এসব কর্মে একশ্রেণীর ব্যাংকও যুক্ত। জাতিসংঘ প্রতিবেদনে এদের নাম ও কাজের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এতে জড়িত এক শ্রেণীর বিশাল কোম্পানি। এগুলো সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন। এ লুটের কাজ সহজ করলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রশাসনিক কাঠামোও সাজানো হয় উপযুক্তভাবে। কখনো ভিন দেশের প্রশাসনিক প্রধান পদে আসীন করা হয় কঙ্গোর লোককে। তার কাজ হবে স্বদেশে লুটের কাজ সংগঠিত করা।

আর শ্রম? সে তো বিশ্বজনীন। শৃঙ্খলিত শ্রমকে নিয়োগ করা হয় পৃথিবীর গভীর থেকে সম্পদ তুলে আনতে। শিশু শ্রমও রেহাই পায় না। লুট কতটুকু, কেমন পরিমাণ হয়? জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনেই উত্তর খোজা যাক। প্রতিবেদন বলেছে : ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১৯৯৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিদেশি সেনা দলগুলোর দখল করা কঙ্গোর এলাকাগুলো থেকে খনিজ সম্পদ, কৃষিজ ও বনজ সামগ্রী, গবাদিপশু লুটে নিঃশেষ করা হয়েছে, যাকে ইংরেজিতে অভিহিত করা হয়েছে ড্রেইনড অফ। বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, উগান্ডা যে দেশই হোক, লুটের ধরন এক। একজন অফিসারের নেতৃত্বে একদল সৈন্য আসে খামার, গুদামে, কারখানায়, ব্যাংকে, তারা আদেশ দেয় দরোজা খুলে দিতে। সেনারা লুটের মাল তোলে গাড়ির পর গাড়িতে। লুটের মাল নিয়ে গাড়ির বহর চলে যায়। কঙ্গোর একটি অঞ্চলে ১৯৯৮ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালে এপ্রিলের মধ্যে ২০০০৩০০০ টন ক্যাসিটেরাইট ও ১০০০১৫০০ টন কোলটান লুটে নেয়া হয়। সৈন্যদের পাহারায় বস্তা বস্তা অর্থ নেয়া হয়।

দেখা যাচ্ছে, লুটের আঁতাত অনেক বিস্তৃত, ব্যক্তি মালিক থেকে রাষ্ট্র, ‘বিদ্রোহী’ থেকে ব্যবসায়ী, সেনানায়ক থেকে অস্ত্র নির্মাতা, সবাই আছে এ কাজে মিলেমিশে। এরাই কি সব? এদের আড়ালে কি কেউ নেই। কোন সে সুতো, যা এদের সবাইকে বেঁধে রাখে এক সঙ্গে? সে কি ধনলিপ্সা, লোভ? সে কি ‘আরো আরো চাই, যতো পাই, ততো চাই’? স্থানাভাবে সবের বিবরণে না গিয়ে কেবল কোলটানে কান্ডটাই দেখা যাক। এন্টায়র্প বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ম্যারিজ ২০০২ সালে রাইজ অ্যান্ড ডিক্লাইন অব দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম বিষয়ে সম্মেলনে পেশ করেন প্লান্ডার, ক্রিমিনালাইজেশন অব দ্য স্টেট অ্যান্ড ডিক্লাইন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম : দ্য কেস অব ডি আর কঙ্গো শিরোনামে প্রবন্ধ। এতে তিনি ছক কেটে দেখান যে, খনি আর নদীর বুক থেকে মজুররা তুলে আনেন কোলটান। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সামরিক চক্রের হাত ঘুরে তা পৌছায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে এবং সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলোর হাতে। সেগুলো পৌছে দেয়া হয় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কাছে। সেখান থেকে প্রক্রিয়াকরণ কারখানার ভেতর দিয়ে ট্যানট্যালাম গুঁড়ো নাম নিয়ে তা হাজির হয় সূক্ষ্ম প্রযুক্তির শিল্পে। এ সামগ্রী প্রক্রিয়ার কারখানা জগতে রয়েছে গোটা বিশেক কাজাখস্তানে, যুক্তরাষ্ট্রে, জার্মানিতে, চীনে, জাপানে। এ গুলোর মধ্যে মাত্র চারটি কারখানা বানাতে পারে ট্যানট্যালাম গুঁড়ো। সে চারটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, জাপানে, জার্মানিতে, চীনে। আর সূক্ষ্ম প্রযুক্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আলকাটেল কমপ্যাক, ডেল, এরিকসন, এইচপি, আইবিএম, নকিয়া, সিমেন্স, লুসেন্ট, মটোরোলা। বড় চেনা নাম এগুলো। এই চেনা নামের কোম্পানি সব কোটি কোটি খদ্দেরের কাছে পৌছে দেয় মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, গেম বা খেলার ডিজিটাল সামগ্রী।

এ সবের মাঝে থাকে পরিবহন, ব্যাংক, রাজনীতি, বিধি, শুল্ক, বিশ্ব শক্তি। ডেনা মন্টেগু ২০০২ সালে স্টোলেন গুডস : কোলটান অ্যান্ড কনফ্লিক্ট ইন দ্য ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন : রোয়ান্ডা ও উগান্ডাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন।

এসবে আরো মিশে থাকে : রক্ত। আরো থাকে : মেহনত, মজুরদের কাছ থেকে আত্মসাৎ করে নেয়া মেহনত। আর সব শেষে থাকে মুনাফা। কতিপয়ের পকেটে, অ্যাকাউন্টে। সে কতিপয় প্রমোদতরীতে চড়ে ঘুরে বেড়ায় ক্যারিবিয়ান সাগরের দ্বীপ থেকে দ্বীপে, ক্যারিবিয়ানের সূর্যাস্ত রং মেখে দেয় তাদের চোখে। কোলটানের রক্তাক্ত, নিষ্ঠুর, সুন্দর যাত্রা!

কোলটান থেকে কে কতো পায়? এ হিসাব করা প্রায় ধাঁধার উত্তর খোঁজার মতো। কারণ তথ্যগত বিভ্রান্তি বেশি। একজন গবেষক এ সংক্রান্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে অনুমান করেছেন যে, স্থানীয় বেপারী ১০ ডলার পেলে রুয়ান্ডার ব্যবসায়ী পায় ২০০ ডলার, আর পাঁচ ছয় জন খনি মজুরের একেকটি গ্রুপ পায় সপ্তাহে ৩০ ডলার। অর্থাৎ দিনে একজন পায় ১ ডলারের কম। আহরণের পরে ৩০ কিলোগ্রাম সামগ্রী বস্তায় ভরে হেঁটে হেঁটে তা নেয়া হয় স্থানীয় ব্যবসায় কেন্দ্রে, গড়ে ২০৩০ কিলোমিটার দূরে। সোনা, হীরা লুটের ঘটনা আরো নিষ্ঠুর। তবে লুটের ধরন একই। সে বিষয়ে আর আলোকপাত না করে আগামীতে দেখা যাবে আরো লোভনীয় ক্ষেত্রে কেমন ঘটনা ঘটে চলেছে।।

(চলবে…)