Home » আন্তর্জাতিক » ফুকুশিমা : নজিরবিহীন বৈশ্বিক হুমকি – শেষ পর্ব

ফুকুশিমা : নজিরবিহীন বৈশ্বিক হুমকি – শেষ পর্ব

কেভিন জেসি এবং মার্গারেট ফ্লাওয়ার্স

সূত্র : জেড নেট

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

fukoshimaমিডিয়ায় কিছু প্রকাশ হতে না দেওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকা। ফুকুশিমা থেকে কী কী বিপদ আসতে পারে, সে সম্পর্কে বিশ্বের সবার ভালোভাবে জানা থাকা প্রয়োজন

ফুকুশিমার প্রধান সমস্যা তিনটি। এগুলোর কোনোটিই ইতোপূর্বে কোনো প্লান্টে দেখা যায়নি। আবার তিনটিই মানুষ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। এসব সমস্যার সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান নেই। কিন্তু তবুও সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

প্রথম যে পদক্ষেপটি গ্রহণ করা দরকার তা হলো মিডিয়ায় কিছু প্রকাশ হতে না দেওয়ার চেষ্টা থেকে বিরত থাকা। ফুকুশিমা থেকে কী কী বিপদ আসতে পারে, সে সম্পর্কে বিশ্বের সবার ভালোভাবে জানা থাকা প্রয়োজন। ফুকুশিমার প্রভাব পৃথিবীর প্রায় সবাইকেই ভোগ করতে হতে পারে। ফলে বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার। জনসাধারণ যত বেশি জানবে, সমাধানের সম্ভাবনা তত বাড়বে। পারমাণবিক শিল্প চায় তার সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখতে। তাই এই শিল্প মনে করে, ফুকুশিমা নিয়ে আলোচনা করা হলে ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরো ফিকে হয়ে পড়বে। আসল কথা হলো, পারমাণবিক শিল্পে যে মুনাফার মুলা ঝোলানো হয়, তার তুলনায় ঝুঁকি অনেক বেশি।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো ফুকুশিমা বিদ্যুৎ প্লান্টটির পরিচালনা কোম্পানি টেপকোর অদক্ষতা। তারা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালানোর কোনো যোগ্যতাই ছিল না। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ জাপানি মনে করে, টেপকো জাপানের ‘সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।’

প্রতিষ্ঠানটি সত্যিকার অর্থেই ‘ভ্রান্তিবিলাসে’ মত্ত রয়েছে। পারমাণবিক বিকিরণ যত বেড়েছে বা বিপদের আশঙ্কা যত বাড়ছে, তারা তত অস্বীকার করে যাচ্ছে। অনেকে তো মনে করে, টেপকো মিথ্যার আশ্রয় না নিলে এই দুর্ঘটনার ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা সম্ভব হতো।

সবচেয়ে বড় যে অপরাধ টেপকো করেছে তা হলো বিপর্যয়ের দায় সুনামির ওপর চাপানো। ২০১১ সালের ১১ মার্চের ভূমিকম্পপরবর্তী সুনামির পরই দেখা যায়, পারমাণবিক চুল্লি থেকে তেজষ্ক্রিয়তা নির্গত হচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটা মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। জাপান সরকারের একটি তদন্তেও বলা হয়েছে, এটা ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’ এবং সেটা ঘটেছে চুল্লির নির্মাণ ত্রুটির কারণে। কেবল টেপকো নয়, এই শিল্পটাই সমস্যাপ্রবণ। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পারমাণবিক প্লান্টই সমস্যায় জর্জরিত। এগুলো ভূমিকম্পের আঘাত সহ্য করতে পারবে বলে মনে হয় না। অনেকগুলো আবার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও সক্রিয়া রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান উভয় দেশেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারা বেশ দুর্নীতিবাজ।

ফুকুশিমায় পারমাণবিক চুল্লি গলে যাওয়ার বিষয়টি টেপকো কয়েক মাস গোপন রেখেছিল। তারা নিশ্চিতভাবে গলার খবর জানা সত্ত্বেও বলে আসছিল, বিষয়টা নিশ্চিত নয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরেও জাপান সরকার বলেছিল, প্লান্টটি শীতল হয়ে বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। সাধারণভাবে এ দিয়ে বোঝানো হয়, তেজষ্ক্রিয় নির্গমন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাপমাত্রাও বেশি নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, জাপান সরকারের এই ঘোষণাটি ছিল ভুল। চুল্লিগুলো ঠাণ্ডা রাখতে তখনো পানির প্রয়োজন হচ্ছিল, জ্বালানি রডগুলোকেও শীতল করা দরকার ছিল।

এমন বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে টেপকো আবার এই খাতে অর্থ বরাদ্দ কমাতে থাকে। এমনকি ফুকুশিমা বিপর্যয় রুখতে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করেনি। এমনকি শ্রমিকদের বেতন পর্যন্ত ২০ শতাংশ হ্রাস করেছে। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের আরেকটি দিক হলো, টেপকোর শ্রমিকদের মনোবল হারিয়ে ফেলা। গত অক্টোবরে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এসব শ্রমিক এখন মদ্যপে পরিণত হয়েছে, অনেকে উদ্বেগে ভুগছে।

এসব অব্যবস্থার কারণে শীর্ষ ১৬ জন পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ জাতিসংঘকে লেখা এক খোলাচিঠিতে ফুকুশিমা চুল্লির দায়দায়িত্ব টেপকোর কাছ থেকে নিয়ে আন্তর্জাতিক আনবিক জ্বালানি সংস্থা আইএইএ’র কাছে দেওয়ার অনুরোধ করেছে। তারা তেজষ্ক্রিয়তা হ্রাস করতে পর্যাপ্ত তহবিল সংস্থানেরও অনুরোধ করেছে। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জাপান সরকার ও টেপকো কেউই গুরুত্ব দিয়ে এটি মোকাবিলা করার কাজে নামেনি।

এখন সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বজুড়ে যত পারমাণবিক প্লান্ট আছে, তাদের সবাই একই সমস্যায় পড়তে পারে। অনেক জ্বালানি ইস্যুর সঙ্গেও এটি সম্পৃক্ত। পৃথিবীকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে।

পারমাণবিক শিল্পের আরেকটি বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র নিজেই পারমাণবিক জ্বালানি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং বিশ্বও তা অনুসরণ করবে। মার্কিন পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গ্যারি জ্যাককো বলেছেন, তিনি এমন কোনো মুভি দেখেননি যাতে দেখানো হয়েছে যে ২০০ বছর পর পৃথিবী পরিচালিত হবে পারমাণবিক চুল্লিতে। কেউ এটাকে ভবিষ্যতের জ্বালানি মনে করে না। তার মতে পারমাণবিক জ্বালানির অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান হারে ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। এ কারণে এ দিকে বিনিয়েগের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে।

চিন্তাবিদ রালফ নাদেরের মতে পারমাণবিক জ্বালানি ‘অপ্রয়োজনীয়, অনাকাঙ্ক্ষিত, অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয় এবং সবচেয়ে বড় কথা অনিরাপদ। তিনি বলেন, এখনো পারমাণবিক জ্বালানি টিকে আছে কেবল এ কারণে যে পারমাণবিক লবি রাজনীতিবিদদের এটা রক্ষা করতে বলে।

ফুকুশিমা অনেক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ওয়াসারম্যানের মতে, এ থেকে আরো বড় বিপদও হতে পারত, যদি যে ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছে সেটির কেন্দ্র ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দূরে না হয়ে ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দূরে হতো। সেক্ষেত্রে পুরো চুল্লিটি সঙ্গে সঙ্গে উড়ে যেত।

ওয়াসারম্যান মনে করেন, আমাদের সব জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে সৌর, বাতাস, তাপ ও মহাসাগরীয় প্রযুক্তি থেকে। অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তিনি বলেন, কার্বনমুক্ত, পারমাণবিকমুক্ত জ্বালানি অর্থনীতি কেবল সম্ভবই নয়, এটা অনিবার্য। কেবল প্রশ্ন হলো, ওই অবস্থায় পৌঁছাতে আমাদের কত সময় লাগবে।

ফুকুশিমা বিপর্যয়ের সময়কার জাপানি প্রধানমন্ত্রী নাওতো ক্যান সম্প্রতি এক বক্তৃতায় বলেছেন, তিনি ছিলেন পারমাণবিক বিদ্যুতের সমর্থক। কিন্তু ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর ‘আমি পুরো ১৮০ ডিগ্রি বদলে গেছি।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পারমাণবিক বিপর্যয় ছাড়া অন্য কোনো বিপর্যয়েই ৫ কোটি লোককে বিপদে ফেলতে পারে না। অন্য কোনো দুর্যোগই এ ধরনের ক্ষতি করতে পারে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, জাপানের ৫৪টি পারমাণবিক প্লান্টের সবগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আস্থার সঙ্গে বলেন, ‘পারমাণবিক জ্বালানি প্লান্ট ছাড়াই আমরা আমাদের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারব।’

বস্তুত, বিপর্যয়টির পর জাপানে সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন তিনগুণ বেড়েছে, যা তিনটি পারমাণবিক প্লান্টের সমান। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘মানুষ যদি সত্যিই একসঙ্গে কাজ করে, তবে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেই আমাদের সব জ্বালানি উৎপাদন করতে পারব।’

(ওয়েব সাইট অবলম্বনে)