Home » অর্থনীতি » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (শেষ পর্ব)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (শেষ পর্ব)

বামপন্থীদের শক্তি ও ভাঙন

আনু মুহাম্মদ

communistsআওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৬ দফার আন্দোলন যখন দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করছে তখনও এই কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ আর বেশিদিন থাকেনি। আগেই বলেছি, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে তখন মস্কো ও পিকিং ক্রমে দুটো কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশেও তার প্রভাব বাড়ছে। ১৯৬৭ সালে প্রথম দফা পার্টি ভাগ হয়। মস্কোপন্থী বলে পরিচিত ধারায় মণি সিংহ সহ পুরনো পার্টির অধিকাংশ নেতা ছিলেন। তুলনামূলক ভাবে নবীনরা পিকিংপন্থী ধারার সূচনা করেন, এর প্রথম নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদীলেনিনবাদী)। এই ধারা থেকেই পরে আরও বিভিন্ন বিভক্তি হয়। কোন বিভক্তির কারণ হিসেবে উৎপাদন পদ্ধতি বিতর্ক, কোন বিভক্তির কারণ হিসেবে কর্মসূচি, কোনটির কারণ হিসেবে বিপ্লবের স্তর ইত্যাদি জানানো হয়। এসব বিভিন্ন ধারা উপধারায় নেতৃত্ব দেন: সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, দেবেন শিকদার, আলাউদ্দীন আহমদ, অমল সেন প্রমুখ।

মস্কো আর পিকিং এর অবস্থান কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে বিভক্তি দেখা দেয়, পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ইউনিয়নে ভাঙন দিয়েই তার শুরু। প্রকাশ্য রাজনৈতিক দল হিসেবে যেহেতু ন্যাপের মধ্যেই কমিউনিস্ট দল এর লোকজন কাজ করছিলেন, সেহেতু তাদের বিভক্তির প্রতিফলন হিসেবে ন্যাপ দুভাগে বিভক্ত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নেতৃত্বাধীন অংশে পিকিং পন্থীরা সমবেত হন আর মস্কোপন্থীরা হন মোজাফফর আহমদ নেতৃত্বাধীন অংশে।

পুরো ৬০ দশকে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ধর্মের নিপীড়ন ও বৈষম্য বিরোধী নতুন ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন তিনি, যাতে তাঁর সখ্য গড়ে উঠে বিপ্লবীদের সাথে। বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর কন্ঠ ছিল সবচাইতে সোচ্চার। তবে পিকিংপন্থী বামপন্থীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক অনেকরকম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়। এক পর্যায়ে অনেকেই তাঁকে ত্যাগ করেন। পিকিংপন্থীদের মধ্যে কেউ কেউ চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে আইয়ুবপ্রীতি প্রকাশের যে প্রবণতা দেখান সেটা নিয়েও অনেক জটিলতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তার দায়ও মওলানা ভাসানীকে বহন করতে হয়।

এই দশকেই সইফ উদ দাহার গঠন করেন প্রথমে শ্রমিক কৃষক কর্মী সংঘ ও পরে কমিউনিস্ট কর্মী সংঘ। গঠিত হয় হাতিয়ার গ্রুপ। সিরাজ সিকদার গঠন করেন পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন। তাঁর থিসিস প্রকাশিত হয় ১ ডিসেম্বর ১৯৬৮। এই সংগঠনই পরে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি নাম ধারণ করে। এছাড়া গঠিত হয়েছিল কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি। এই দুইটি ধারা স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি গঠন করে যথাক্রমে ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে। পার্টি দ্বিধা ও বহুধাবিভক্তিতে গণসংগঠনগুলোও একের পর এক ভাঙন ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। গণ ও শ্রেণীসংগঠনের সবচাইতে বড় বিপর্যয় আসে এরপর। এটা ঘটে যখন পিকিংপন্থীদের প্রধান অংশ বিনা পর্যালোচনায় চারু মজুমদারের শ্রেণীশত্রু খতমের লাইন গ্রহণ করে। এই লাইনের ফলে বিপুল সংখ্যক নেতা কর্মী সংগঠক ‘বিপ্লবী উদ্দীপনা’ নিয়ে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র সংগঠন সহ বিভিন্ন প্রকাশ্য কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করেন। অন্যদিকে মস্কোপন্থী ধারা ততদিনে আওয়ামী লীগের সাথে অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী ধারার অনেক নিকটবর্তী।

এর মধ্যে ৬০ দশক শেষ প্রান্তে। বিশাল গণঅভ্যুত্থান শেষে এই দেশ তখন জনগণের উপর বর্বরতম সামরিক আক্রমণ এবং স্মরণকালের বৃহত্তম গণযুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আর ততদিনে বিপ্লবী স্বপ্ন ও অঙ্গীকার নিয়ে যেসব সংগঠন পুরো দশকের ঝড়ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে দাঁড়িয়েছিল, এবং যে নেতৃবৃন্দ ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মতো বড় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদের কেউ কেউ আত্মসমর্পণে সন্তুষ্ট; আর বড় অংশ ছত্রভঙ্গ, অপ্রস্তুত এবং আত্মহনন আর আত্ম কলহে লিপ্ত। এর ফলাফল এখনও এমন বাংলাদেশ আমরা টেনে যাচ্ছি, যার কথা ৬০ দশকের উদ্দীপ্ত সংগ্রামী আর অসাধারণ মানুষেরা তাঁদের রক্ত শ্রম মেধা দিতে দিতে চিন্তাও করতে পারেননি।।