Home » রাজনীতি » বান আর তারানকোরা এদের তুলনায় শিশু!

বান আর তারানকোরা এদের তুলনায় শিশু!

আবীর হাসান

cartoon-tarancoসময় নষ্ট করা আর সময়কে আরও বেশি বিপজ্জনকভাবে মূল্যহীন করে ফেলাটা আমাদের জাতিগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একে অবশ্যই কোন গুণপনা বলা যাবে না। বদঅভ্যাস শব্দটাও কুরুচিপূর্ণ এই ব্যাপারটাকে ঠিকমতো তুলে ধরতে পারে না। লক্ষ্য করলেই বুঝবেন, বিপদ থেকে মহাবিপদের দিকে আমরা যাচ্ছি এই সময় নষ্ট করে করেই। ডিসেম্বর মাসের দুটো সপ্তাহ কাটিয়ে দিলাম যেন নিজেদের সঙ্গে নিজেরা ফাজলামি করে : ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ায় গোল্লায় পাঠিয়ে, ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ রেখে, কম খেয়ে, কম পরে কৃত্রিম একটা যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে যেন আমরা নরকের উত্তাপ টের পাওয়ার চেষ্টা করছি ইহজগতেই।

কী তামাশা! শুক্রবারগুলোকে কাজের দিন বানিয়ে হুড়, মুড় করে পথে নেমে জান্তব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি সবাই মিলে। আহা আমাদের দরদী দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদরা কী কাণ্ডই না করছেন? গণতান্ত্রিক বহুদলীয় রাজনীতিতে আন্ডার গ্রাউন্ড ফ্যাক্টর থাকে এই প্রথম বোঝা গেল। বোঝা গেল বিপরীত মেরুর পুলিশ দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টাটাই ক্ষমতাসীনদের একমাত্র পন্থা। জাতিসংঘ থেকে উড়ে আসা তারানকো তো এদের কাছে শিশু। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এত বদমায়েশী থাকতে পারে তা তার ধারনার বাইরে থাকারই কথা। তার ওপর আমাদের রাজনীতিবিদদের বাংলায় করা চিন্তা কষ্টেসৃষ্টে অনুবাদ করে তাকে যা বোঝানো হয়েছে তাতেও কূটকৌশলের ভেজালটাই ছিল বেশি। যেমন বলা হয়েছে, সংবিধান মেনে নির্বাচন করতে চায় ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু সেই সংবিধানটাকে যে কেটেছিড়ে যোগান দিয়ে, এক দফাকে আরেক দফার সঙ্গে সাংঘর্ষিক করে এক উদ্ভট নিয়ম তৈরি করা হয়েছে তা ঠিক মতো বোঝানো হয়নি। যুক্তি হয়তো এটাই তোলা যায় যে, সরকার বিরোধীরাও তো ছিলেন আলোচনায় তারা বোঝাননি। দুঃখজনক হলেও সত্যি এটাই যে তারা ঠিক মতো বুঝিয়ে উঠতে পারেননি। ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করে এ তারানকো প্রয়াসের যে উপংসহার টেনেছেন তাতেই স্পষ্ট হয়ে গেছে বোঝাবুঝির ব্যাপারটা। তিনি যে এই টেলিফোনটা করার আগে ঢাকায় অবস্থানকারী তারানকোর সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলেন তা তারানকোই বলেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। অতএব ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের’ জন্য বান কি মুনের আশা এবং তাগিদ দেয়াটা তাই অবুঝদের দিক থেকে স্বাভাবিক। অথবা এটাও বলা যায় যে, একটা সংবিধানের মধ্যে অগণতান্ত্রিক একদলীয় বা এক ব্যক্তির শাসনের ধারাবাহিক ব্যবস্থা থাকতে পারে এটা মুন তারানকোদের চিন্তার বাইরেই ছিল এবং এখনো আছে।

তারানকো এই ভেবে এ দেশ ছেড়েছেন যে, অন্তত সংলাপে বসার কাজটা করিয়ে দিতে পেরেছেন। কিন্তু সম্ভবত তার ধারণাই নেই যে, এই সংলাপ কতো নিস্ফল, কতো প্রতারণাপূর্ণ আর কতো অকেজো। তারানকোর মধ্যস্থতায় যারা মুখোমুখি হয়েছিলেন তাদের যে সামান্যতম সিদ্ধান্ত নেয়ার বা দেয়ার এখতিয়ার নেই তা কি তারানকোকে ঠিক মতো অনুবাদ করে কেউ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন?

তারানকো ঢাকায় থাকলেন ২৪ ঘন্টা বেশি বেশ আশাবাদী মানসিকতা নিয়ে দৌড়ঝাপ করলেন, বসলেন এবং বসালেন। তবে ক্যামেরায় তাকে বেশি দেখা যায়নি। এটা নিয়ে অনেকের ক্ষোভ আছে। কারণ রাজনীতিতে যাই ঘটুক আমরা তা টেলিভিশনে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মন্ত্রিসভার বৈঠক অথবা বিরোধী দলের গোপন আস্তানা থেকে কর্মসূচি ঘোষণা সবই টেলিভিশনে দেখেই আমরা গালগল্প করি, সময় কাটাই, তারপর এক সময় হাই তুলতে তুলতে ঘুমিয়ে পড়ি। তারানকো এই একটা উদাহরণই তুলে ধরে গেছেন যে, যদি কিছু করতে হয় তাহলে ক্যামেরার বাইরে করতে হবে। বিষয়টা আমাদের সময় নষ্টকারী রাজনীতিবিদরা বুঝেছেন কিনা কে জানে?

তারানকো ঢাকায় থাকতেই আবার ১১ তারিখে টেলিফোনে ঢুকেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসন সম্ভব এবং আলোচনা চলছে। কিন্তু ব্যাপারটা কি ওই রকম সঙ্কটের উৎসে কি আছে কে আছেন? তার সিদ্ধান্ত কি? এই সিদ্ধান্তটা নেয়ার এখতিয়ার যে প্রধানমন্ত্রীর নিজেরই সেটা দেশবাসী যেভাবে বুঝতে পারছে সেভাবে অন্য কেউ কিংবা ভিন দেশীরা বুঝতে পারছে না। তারা তাদের সংস্কৃতি, তাদের গণতন্ত্রের অভ্যাস দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে এবং আশা করে কিছু ত্র“টিবিচ্যুতি হলেও পাল্টাপাল্টি পুলিশি অ্যাকশন বা নৈরাজ্য হলেও তা থামানোর চেষ্টা হবে।

কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন তারা থামবেন না থামাবেন না। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা তাদের প্রয়োজন নেই, তাদের প্রয়োজন ক্ষমতার ধারাবাহিকতা। সে জন্য বিপজ্জনকভাবে তারা সময় নষ্ট করছেন। অন্যদেরও কেবল সময় নয়, সম্পদ, জীবন সবই নষ্ট করাচ্ছেন। মানুষের একটা আশাকে আরেক আশা জিইয়ে রাখে। কিন্তু এখানে ঘটছে উল্টো জনমানুষ বা বিশ্ববাসীর এই আশার বিপরীতে দানবীয় আশাকে দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করা হচ্ছে আর সময়কে দেয়া হচ্ছে নষ্ট হতে। তাই এখন খুব স্বাভাবিকভাবে যে সমস্ত বিষয় ঘটার কথা তা নাও ঘটতে পারে এবং সেই আশঙ্কাই বেশি। আর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হলে সেটা হবে একটা ছেলেখেলা নষ্ট সময়ে ফলা একটা মাকাল ফল।।