Home » রাজনীতি » এরশাদ যখন মূল ফ্যাক্টর

এরশাদ যখন মূল ফ্যাক্টর

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-91এক. ডিসেম্বর নিয়ে বাঙালী জাতির আলাদা একটা গর্ব রয়েছে। যে কোন অর্থেই এটি বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসে পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে অর্জিত হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিজয়। ট্রাজেডি হচ্ছে, অসাধারন ও তাৎপর্যপূর্ণ এই বিজয় বিয়াল্লিশ বছর ধরেই খন্ডিত ও অসম্পূর্ণ, ঘুরে দাঁড়ানোর নয়। শুধুই স্মৃতি জাগানিয়া, অতীতাশ্রয়ী। মনে করার চেষ্টা, ৭১’র ডিসেম্বরে বাঙালী তাঁর ইতিহাসে সবচেয়ে মহোত্তম বিজয়ের সূচনা হয়েছিল, শোষণ ও অর্থনৈতিক মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের ১৯ বছর পরে এই জাতি বিজয়কে সম্পূর্ণ করতে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আরেকটি বিজয় অর্জন করেছিল। ১৯৬৯ সালে পরাধীন দেশে গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসককে উচ্ছেদ করার ধারাবাহিকতায় স্বাধীন দেশে জনগন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের পতন ঘটিয়ে জনতা আবার গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। পাশাপাশি প্রত্যাশা জন্ম নেয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জবরদখল ও সম্পদ লুন্ঠনকারী, হত্যা ও চরম নীতিভ্রষ্টতার দায়ে পতিত এরশাদ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ইতিহাসের অমোঘ পরিনতি ভোগ করবে।

বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য চরম ট্রাজেডি হচ্ছে, সেই পতিত এরশাদ মাত্র দুই দশকে ক্ষমতার খেলায় নোংরা রাজনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। ফলে সে যেভাবে খেলছে, যেভাবে বলছে, যা যা করছে, তাই দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের কাছে অনুসরনীয় এবং অনুকরণীয় হয়ে উঠছে। ২৩ বছর আগের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ছিল জনগনের কাছে সবচেয়ে ঘৃনিত ও ধিকৃত ব্যক্তি, সেই এরশাদই এখন শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার কাছে পরম প্রার্থিত ব্যক্তি। এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দুই দশকে সবচেয়ে যে খারাপ পরিবর্তনটি হয়েছে তা হলো, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে ১৯৯১৯৬ মেয়াদে যুগপৎ আন্দোলন এবং ২০০৭ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোট করে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তার ঐতিহ্যিক ও গণতান্ত্রিক চরিত্রটি খুইয়ে বসেছে। অন্যদিকে, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এবং অতিরিক্ত নির্ভরতা ও এরশাদের কৃপাদৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টার কারনে বিএনপি তার জাতীয়তাবাদী চরিত্রটি হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতিতে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মত গনধিকৃত দলগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করে ছেড়েছে এবং তাদের পরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের জন্ম থেকে শুরু করে প্রায় সবরকম ঘটনঅঘটনের মাসগুলিই হচ্ছে ডিসেম্বরজানুয়ারিফেব্রুয়ারী এবং মার্চ। পাঠক লক্ষ্য করবেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়, ৯০’র গণঅভ্যুত্থান, /১১ এর সেনা সমর্থিত সরকার এবং সবশেষে আজকের এই অনিশ্চিত গন্তব্য। ঐতিহাসিক কালপঞ্জির সঙ্গে কি অদ্ভুত মিল! সে কারনে বাংলাদেশের জন্য আগামি মাসগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারন এখনো পর্যন্ত গোটা বাংলাদেশ এবং এর রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সবকিছুরই গন্তব্য অনিশ্চিত। বলা যায়, চোরাবালিতে খাবি খাচ্ছে বাংলাদেশ। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির তোষণ করে বেড়ে উঠতে দেয়া ফ্যানাটিক গোষ্ঠিগুলির সৃষ্ট জঙ্গিবাদ দমনের আন্তর্জাতিক মাতমে সাড়া দিয়ে ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ হাসিনা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সবশেষ চেষ্টায় রত। অন্যদিকে, জামায়াতের রাজনীতির কাছে জিম্মি খালেদা জিয়া ভারত বিরোধিতার মিশেলে হঠাও হাসিনা রাজনীতি চালু রেখেছেন। দুই প্রধান নেত্রীর এই ভয়াবহ প্রবনতা দেশকে নিয়ে এসেছে একেবারেই খাদের কিনারায়।

দুই নেত্রী এবং তাদের দল, জোট এখন প্রশাসন, পুলিশ এবং সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নিরীহ জনগনের ওপর। এখন প্রতিদিনের বাংলাদেশ জ্বলছে, ঝলসে যাচ্ছে শিশু, যুব, বয়স্ক নারীপুরুষ। প্রতিদিন লাশ পড়ছে মানুষের। হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে। আগামী ইতিহাস বিষ্ময় এবং ঘৃনা নিয়ে প্রত্যক্ষ করবে, ক্ষমতাশুধুমাত্র ক্ষমতার কারনে জনগনের রক্তের হোলি খেলেছেন। অকাতরে প্রান কেড়ে নিয়েছেন জনগনের। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, ব্রুট বা একক মেজোরিটি পাওয়া সরকারের হাতে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৮ অথবা ২০০১ সালে যে সংকট তৈরি হয়েছিল সে তুলনায় সবচেয়ে গভীরতর সংকটের মুখোমুখি এখন বাংলাদেশ।

দুই. বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে জাতিসংঘ এখন সবচেয়ে সক্রিয় এবং সম্ভবত: নিয়ামক হয়ে উঠতে চলেছে। মহাসচিব বান কি মুন’র পক্ষে তার রাজনৈতিক বিষয়ক সহকারী অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো গত ৬ ডিসেম্বর থেকে ৫ দিনের সফরে বাংলাদেশে। জাতিসংঘ সবশেষ মিশন নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তারানকো বাংলাদেশে। তিনি বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ, বিরোধী দলীয় নেতা, বিএনপি, এরশাদ ও জাতীয় পার্টি, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজপ্রায় বাদ পড়ছে না কেউই। কেবল অজ্ঞাত কুলশীল জনগন কি চায়, জনগন কতোটা খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে, সেটির খবর এদের কারো কাছেই নেই। তারানকো’র এবারের এই ৫ দিনের লম্বা সফরে করা বৈঠকগুলোর মধ্যে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, তিনি শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছেন না, দল ও সমাজের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি আরো কথা বলেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে। আশ্বাস পেয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে নির্বাচন পেছানো কেন, অনেক কিছুই করা সম্ভর। এর ফলে আপাতত মনে হতে পারে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সমঝোতার একেবারেই কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

বাস্তবে কি ঘটতে যাচ্ছে? ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দল যতই মৌখিক সদিচ্ছা প্রকাশ করুক না কেন, বাংলাদেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানই যে শুধুমাত্র সমস্যার সমাধান নয়, সেটি জনগন বুঝতে শুরু করেছে। স্পষ্টত: ক্ষমতাসীনদের জানাই হয়ে গেছে একটি মোটামুটি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা তাদের খুবই কম। সে কারনে, বাংলাদেশে অনেকেই বিশ্বাস করেন একক নির্বাচন করার দিকে আওয়ামী লীগের আগ্রহের কমতি হবে না। কারন, আগামী মেয়াদে তারা ক্ষমতায় না আসতে পারলে তাদের দলীয় ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। শুরুতে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের বিচার শুরু করুন না কেন, জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের দন্ড ঘোষিত হতে শুরু করেছে ইতিহাসের অমোঘ বিধান অনুযায়ী। সুতরাং আগামী নির্বাচনে জামায়াতবিএনপি ক্ষমতাসীন হলে এই বিচার প্রক্রিয়া কি থেমে যাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য, নাকি চিরতরে? অন্যদিকে, গত ৫ বছরে মামলাহামলা, ধারাবাহিক সন্ত্রাস, গুমখুনের শিকার বিএনপি ক্যাডার এবং সুযোগ সন্ধানীদের প্রতিশোধপরায়ণতার যে আশংকা নিরসনে গ্যারান্টি কি আছে? অতীত ধারাবাহিকতায় এইসব কঠিন প্রশ্নগুলোর মীমাংসা ছাড়া একটি নির্বাচন শুধুমাত্র সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ছাড়া জন নিরাপত্তার গ্যরিান্টি দিতে সক্ষম হবে কি?

আপাতত: এ সকল প্রশ্নের উত্তর জনগনের কাছে নেই। তার বদলে আছে আগত দিনের ভয়াল সহিংসতা ও নৈরাজ্যর আশংকা। এ থেকে পরিত্রান পেতে যে পরিমান শুভবুদ্ধি, দুরদৃষ্টি এবং প্রজ্ঞা দরকার তা আমাদের রাজনীতিবিদদের মাঝে না থাকার কারনে গোটা দেশ এখন অনিশ্চিত গন্তব্যর পথে হাটছে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রধান প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য শক্তির কূটকৌশলের খেলা। আমরা কেউই জানিনা, এই যাত্রায় ক্ষমতার লড়াইয়ে কত জীবন বলি হতে যাচ্ছে!