Home » আন্তর্জাতিক » নেপালের নির্বাচনে মাওবাদীদের পরাজয় ॥ হিন্দুত্ববাদী দলের উত্থান

নেপালের নির্বাচনে মাওবাদীদের পরাজয় ॥ হিন্দুত্ববাদী দলের উত্থান

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

prachandaঅবশেষে নভেম্বরে নেপালে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। অনেক অনিশ্চয়তা, সঙ্কট, নাটক ও অবিশ্বাস সত্ত্বেও জনগণ দ্বিতীয়বারের মতো সাংবিধানিক পরিষদ (কনস্টিটিউয়েন্ট এসেমব্লি) গঠনের জন্য সফলভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সিএ চার বছর ধরে চেষ্টা করেও সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি। নানা ঘটনার পর ২০১২ সালে ওই পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়। ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে ভেঙে দেওয়া পর্যন্ত দেশটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ছিল, সামাজিকভাবেও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

জনগণ কেবল নতুন সংবিধান প্রণয়ন না করার জন্যই নয়, শান্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি যাতে একই পথে আবার পা না বাড়ায় সেটা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো এবং সেগুলোর নেতাদের ব্যর্থতার জন্য হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিল।

১ ডিসেম্বর ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ৬০১টি আসনের মধ্যে দেশটির প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল মধ্যপন্থী নেপালি কংগ্রেস পার্টি ১৯৬টি এবং মধ্যবামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ঐক্যবদ্ধ মার্কসবাদী লেনিনবাদী) ১৭৫টি আসন পেয়েছে। মাওবাদী অর্থাৎ ইউনিফাইড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা ২২০টি আসন পেয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। অর্থাৎ এবার তারা ধরাশায়ী হয়েছে। নির্বাচনে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয়ে আগ্রহী রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি ২৪টি আসন পেয়ে চতুর্থ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই দলটির আবির্ভাব নিয়ে অনেকে আতঙ্ক অনুভব করেছেন। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটির দুই কোটি ৭০ লাখ মানুষের ৮১ ভাগ হিন্দু, ৯ ভাগ বৌদ্ধ, .৪ ভাগ মুসলমান এবং ১.৪ ভাগ খ্রিস্টান। বাকিরা প্রকৃতি পূজারী।

এবার যে জনগণকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার আগে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে, তা বোঝাই যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এবং বিভিন্ন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক জানিয়েছে, সামান্য কিছু সংঘর্ষ ও অনিয়ম হলেও সার্বিকভাবে নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ। লোকজন উত্তেজিত থাকলেও তারা শান্তভাব ও সুস্থ মনোভাব প্রদর্শন করে। এবার বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রথমবারের ভোট দেয়। আর এর মাধ্যমে মনে হচ্ছে নেপালে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকশিত হওয়া শুরু করল।

সার্বিকভাবে ২০১৩ সালের সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন ছিল প্রাণবন্ত অংশগ্রহণমূলক। কেবল ভোটারদের উপস্থিতিই বেশি ছিল না, রাজনৈতিক দলগুলোও ছিল অনেক। সব মিলিয়ে ১২২টি দল এতে অংশ নেয়। আর ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭৮ শতাংশ।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল মাওবাদীদের তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়া। নেপালে সংবিধান প্রণয়ন না হওয়ার খেসারত তাকে দিতে হয়েছে। এমনকি একটি আসনে দলটির ক্যারিশমেটিক নেতা প্রচণ্ড (পুষ্প কমল দাহাল) পরাজয়ও বরণ করেছেন। নির্বাচনের ফলাফল যখন প্রকাশ হতে থাকল, তখন মাওবাদীরা জালিয়াতির অভিযোগ এনে ভোট গণনা বন্ধ করার দাবি জানায়। প্রচন্ডের দল অভিযোগ করেছে, সেনাবাহিনী এবং নির্বাচন কমিশন ষড়যন্ত্র কওে তাদেরকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তারা একটি তদন্ত কমিশনও গঠন করেছিল। তাতে দেখা যায়, সেনাবাহিনী ও নির্বাচন কমিশন কয়েক ঘণ্টার জন্য ব্যালট বাক্সগুলো তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তারপর সেগুলো আবার ভোটকেন্দ্রে এনে গণনা করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা কারচুপি করে। তবে সেনাবাহিনী ও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করে। অবশ্য, এই পরাজয়ের জন্য তারা কিছুটা নিজেরাও দায়ী। শান্তিচুক্তির পর তাদের জীবনযাপন প্রণালী অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া কয়েকটি ইস্যুতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রচন্ডের…. দলে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

তবে দলটি দুর্বিসহ পরাজয়ের পরও সাংবিধানিক পরিষদে তাদের আসনে বসার ইঙ্গিত দিয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, নির্বাচনে খারাপ করলেও তাদের প্রভাব রয়ে গেছে। নতুন সংবিধান প্রণয়নে তারা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের বাদ দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন বলতে গেলে অসম্ভব।

ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নির্বাচনকে সফল বলে অভিহিত করেছে। নেপালে রাজনৈতিক বিভক্তির পেছনে এসব দেশের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারত ও চীনের কাছে নেপাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। গত নির্বাচনে প্রচণ্ডের বিজয় ছিল চীনের জন্য সুখবর। এবার যারা জয়ী হয়েছেন, তারা কমবেশি ভারতমুখী বলে পরিচিত। তারাই দীর্ঘদিন নেপালের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। গেরিলা যুদ্ধের ইতি টেনে মাওবাদীরা গত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল প্রথমবারের মতো। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা এবং কায়েমি স্বার্থবাদিদের লাভলোকসানের হিসাবে তাদের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

তাদের সামনে এখন কঠিন রাস্তা। তারা যদি শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে, তবে তারা আবার মূল ভূমিকায় ফিরে আসতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা, তারা তাদের আদর্শ বলিষ্ঠভাবে উত্থাপন করতে পারলে কম আসন নিয়েও নতুন সংবিধান প্রণয়ন কার্যক্রমে তারা বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ফলাফলের কারণে নেপালে সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে আগেকার জটিলার অবসান হয়ে যাবে, তা মনে করার সময় এখনো আসেনি। দলগুলো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে একগুঁয়ে থাকলে আবারো অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। এমনকি মাওবাদীদের সঙ্গে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি ভণ্ডুল করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটা নেপালকে আরো বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)