Home » আন্তর্জাতিক » ভারতে গণতন্ত্রের ঘাটতি

ভারতে গণতন্ত্রের ঘাটতি

অধ্যাপক কে এন পানিক্কর

indian-democracy[বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকে। কিন্তু এই গণতন্ত্রের বেশ কিছু সঙ্কট রয়েছে, রয়েছে ঘাটতি। দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক কে এন পানিক্কর তার ‘ডেমোক্রেসি ডেফিসিট’ নিবন্ধে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ২০১১ সালের ২৬ আগস্ট ভারতের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘ফ্রন্টলাইন’এ নিবন্ধটি প্রকাশিত হলেও আজও এর প্রাসঙ্গিকতা দেখা যায়। এ কারণেই নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ ছাপা হলো সম্পাদক]

যেসব মোহাচ্ছন্নতাকে ব্রিটিশরা তাদের জাতীয় চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে লালন করে থাকে নিজের সংশয়বাদী চেতনা আর আত্ম অনুসন্ধানের দৃষ্টি দিয়ে সেগুলোর একটির কথা বার্নার্ডশ অনেকবারই উল্লেখ করেছেন। শএর মতে ব্রিটিশরা নিয়মনীতির প্রতি মোহাবিষ্ট। এমনকি নীতিহীনতার মধ্যেও তারা কোনো না কোনো একটা নীতি আবিষ্কার করে ফেলে। যেমন নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাতি অর্জনকারী স্বৈরশাসক একজন রাজার পক্ষেও দাঁড়াতে পারে তারা নিজেদের দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে। একইভাবে পরিস্থিতি দাবি করলে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে থেকে সেই রাজার জন্য অনুমোদন আদায় করতেও দ্বিধা করে না তারা। সেই রাজাকেই আবার হত্যা করার প্রয়োজন দেখা দিলে গণতন্ত্রের নীতি (!) নামক নতুন নীতির দ্বারস্থ হয়ে আগেকার সেই দেশপ্রেমের নীতিকে তারা বিসর্জন দিতে পারে অবলীলায়। ব্রিটিশদের নীতি বলতে বার্নার্ডশ আসলে যা বুঝতে চেয়েছেন তা হলো সুবিধাজনক কতোগুলো অজুহাত। বাস্তব পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী এগুলোকে কখনো নিজেদের পক্ষে যেমন ব্যবহার করা হয় তেমনি আবার প্রয়োজন দেখা দিলে বাতিলও করে দেয়া হয়।

ঔপনিবেশিক প্রভুদের কাছ থেকে শেখা উদারনৈতিক নীতিচর্চায় অভ্যস্ত এবং ভারতীয় সভ্যতার গভীরে প্রোথিত গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত আধ্যাত্মিক গুরুদের আত্মত্যাগ ও কৃচ্ছ্রসাধনার মন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত ভারতীয়রাও একই ভাবে আদর্শবাদিতার প্রতি অনুরক্ত। দেশপ্রেম এবং গণতন্ত্র দুটিকেই তারা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে। তবে এ দুটির প্রতি তাদের অঙ্গীকার নীতিগত দিক থেকে না যতোটা, আচরণগত দিক থেকে তার চেয়ে অনেক কম। প্রায় সবাই মুখে মুখে হলফ করে গণতন্ত্রের কথা বললেও জীবনাচরণের ক্ষেত্রে এটিকে অনুসরণ করতে দেখা যায় খুব কম জনকেই। প্রসঙ্গক্রমেই বলতে হয়, নীতি এবং তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যেকার পার্থক্যটি বিশাল এবং সেই পার্থক্যটি প্রায় অমোচনীয়ই। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে সমতা। আলোচ্য প্রবন্ধে সেই সমতার আলোকেই নীতি ও তার প্রয়োগের মধ্যেকার পার্থক্যটির স্বরূপ উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়েছে। ভারতীয় গণতন্ত্রের সঙ্কটটি হলো এই যে, রাষ্ট্র সমতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সুশীল সমাজও সামাজিক ইস্যুগুলোর মোকাবেলা করতে পারার মতো ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়ও এটিই।

গণতন্ত্র হচ্ছে একটি সামগ্রিক ধারণার বিষয়। এর উপাদানগুলোও একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তথাপি এর প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সাম্যের কথা উল্লেখ করা যায়। এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়ে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্ম দিতে পারে। তবে সেই গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করছে উল্লেখিত সমতার বৈশিষ্ট্য তিনটি সেখানে কতোটা গুরুত্ব পায় এবং এগুলোর বাস্তবায়নই বা হয় কতোটা তার ওপর। সুতরাং বলা যায়, সমতার ধারণাটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ওপরই নির্ভরশীল হয়ে আছে ভারতে গণতন্ত্রের ভবিষ্যতটি। ভারত প্রজাতন্ত্র নীতি হিসেবেও সমতার কথাটি তার সংবিধানে লিখিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছে। তারপরও বলতে হয়, উল্লেখিত তিনটি ক্ষেত্রেই সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনো সুদূর পরাহত। এ অবস্থায় যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসমূহের বিস্তৃতিই গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্যে যথেষ্ট কিনা। ভারতের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় গণতন্ত্র ৬৩ বছর ধরে সমাজের ভেতর বিভক্তিকে লাগাতারভাবে গভীর থেকে গভীরতর করেছে।

রাজনৈতিক সমতা

সামাজিক পার্থক্য যতোই থাকুক না কেন ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত গণতন্ত্রের কাঠামোগত প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা আছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনার ভাষায় কোনো ধরনের অস্পষ্টতা নেই। সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘সকল মানুষের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। অবস্থা, সুযোগ এবং আইনগত দিক থেকে সবাইকে সমান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’ ক্ষমতাসীনদের দ্বারা লাগাতারভাবেই সংবিধান সংশোধন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৯৫টি সংশোধনী আনা সত্ত্বেও সংবিধানের উল্লেখিত এই মৌলিক নীতিগুলো এখনো অক্ষতই আছে। তারপরও বাস্তব ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের চর্চা সবার জন্য ন্যায় নিশ্চিত করতে পারেনি। কারণ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ সব মানুষ সমানভাবে পায়নি।

আমরা রাজনৈতিক অধিকারের কথা দিয়েই শুরু করতে পারি। কোনো না কোনো ভাবে এটিই হচ্ছে গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিষয়। রাজনৈতিক অধিকারসমূহই সমতার নিশ্চয়তা দেয় যা ছাড়া গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ সম্ভব হয় না। রাজনৈতিক অধিকার বলতে অবশ্য অনেক বিষয়কেই বোঝায় যার মধ্যে রয়েছে মতপ্রকাশের এবং সংঘ করার স্বাধীনতা। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে নিজে প্রতিনিধি হওয়া কিংবা অন্যকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার বিষয়টি গণতন্ত্রের সর্বজনগ্রাহ্য একটি বৈশিষ্ট্য। জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকার এই ব্যবস্থাটি এই জন্যে গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যেকার বিভাজনকে ঘুচিয়ে ফেলে। কিন্তু সরকার তার এই প্রতিনিধিত্বশীলতার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে কেবল রাষ্ট্রের একটি আনুষ্ঠানিক অঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করে, মর্ম হিসেবে নয়। এখানেই প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাটি নিহিত। আর ভারতের ক্ষেত্রে এই অবস্থাটি খুবই প্রাসঙ্গিক।

ভারতে প্রতিনিধিত্বশীলতার পদ্ধতিটি হলো সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগ। এটি কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ভারতে সময় মতো সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস সর্বজনীন প্রশংসা লাভ করেছে। কেননা উপনিবেশউত্তর বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ভারতে যে নির্বাচনগুলো সফলভাবে অনুষ্ঠান করা গেছে তাই এখানকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রতিনিধিত্বশীলতার পদ্ধতিকে বড় ধরনের ন্যায্যতা দিয়েছে এবং এই ন্যায্যতাই আবার গণতন্ত্র চর্চার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এরপরও প্রতিনিধিত্বশীলতার এই পদ্ধতিটির গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ সবের একটি হলো এই পদ্ধতিটির মাধ্যমে সঠিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণ হচ্ছে কিনা। গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। আর এ কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠের এই প্রতিনিধিত্বটা কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাব্যস্ত হচ্ছে তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রতিনিধিত্বশীল একটি পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণের প্রশ্নে বিভিন্ন ধরনের মত ও ব্যাখ্যাই রয়েছে। কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি চালু আছে। ভারতের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে যিনি সর্বাধিক ভোট পান তিনিই নির্বাচিত বলে বিবেচিত হন। তবে এই পদ্ধতি দ্বারা এটা মোটেই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, যিনি বা যারা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি বা তারাই ওই নির্বাচনে ভোটদানকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন। একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায় না যে, তিনি বা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের পক্ষ হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন তিনি বা তারা আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অংশেরই সমর্থন পেয়েছেন। বহুদলীয় একটি ব্যবস্থায় এ জাতীয় অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ এই ব্যবস্থায় শুধু অনেক দলই নয়, অনেকেই ব্যক্তিগতভাবেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। একটি নির্বাচনী এলাকার ভোট যদি অনেক সংখ্যক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে তবে সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কোনো একজন মোট ভোটের ৫০ শতাংশের কম ভোট পেয়েও নির্বাচিত হয়ে যেতে পারেন। এ জাতীয় নির্বাচনী পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে রাজনীতির প্রকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই এ জাতীয় একটি অবস্থা প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব ফেলে। এই ত্রুটিটি এড়ানোর জন্য কোনো কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত হওয়ার শর্ত হিসেবে প্রদত্ত ভোটের অন্তত ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার বিধান চালু করার চেষ্টা চলছে।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার জন্য ভারতের সামাজিক অবস্থা অনুকূল কিনা। সমাজের বিত্তশালী, শিক্ষিত এবং ক্ষমতাবান অংশ থেকেই ভারতের শাসক রাজনৈতিক শ্রেণীটির উদ্ভব ঘটেছে। পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটিই এমনভাবে তাদের কুক্ষিগত হয়ে আছে যে, এখানে সমাজে গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লোকদের প্রবেশ করার কোনো রকম সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে আইন সভাসমূহে কিংবা পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব আছে বটে কিন্তু সে সব স্থানে কালেভদ্রেও তারা নিজেরা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায় না। একমাত্র ব্যতিক্রম কেবল তাদের জন্য নির্ধারিত কিছু সংরক্ষিত আসন। সুতরাং রাজনৈতিক সুযোগ এবং জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করার সামাজিক সামর্থ্য এখন সীমিত রয়েছে কেবল সমাজের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশেরই মধ্যে। এর বিপরীত একটি চিত্র প্রদর্শনের জন্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন এবং এপিজে আবদুল কালামের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। কিন্তু তাদের নিয়োগগুলো ব্যতিক্রম। আর ব্যতিক্রম নিয়মকেই সিদ্ধতা দেয়।

প্রতিটি পার্লামেন্টেই সমাজের উচুস্তর থেকে আসা সদস্যদের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি পার্লামেন্টটিকেও একান্তভাবেই কোটি এবং কোটি কোটিপতিদের ক্লাব হিসাবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। বহু প্রশংসিত নির্বাচন এতই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে যে, সাধারণ একজন নাগরিক নিজের শক্তি ও যোগ্যতা বলে এই নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সমর্থ হচ্ছেন না। সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারা বলতে বুঝায় কেবল নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দিতে পারাকে। এর ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শ্রেণী বিন্যাসটি আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকবে।

অধিকার প্যাকেজ

সংবিধান দেশের জনগণকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রদান করেছে। বিষয়টি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রশংসিতও হয়েছে। অধিকারগুলোর কথা হরহামেশা আলোচিতও হয়ে আসছে জনসভায়, বিশ্ববিদ্যালয়র শ্রেণী কক্ষে এবং অতি অবশ্যই পার্লামেন্টে। বলা চলে, প্রায় প্রত্যেকেই গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে কথাবার্তা শুরু করে কিন্তু বিপুল অধিকাংশ জনগণেরই গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো অংশগ্রহণই প্রায় নেই। যেটুকু আছে সেটুকু কেবল ওই ভোটদানের মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।

প্রচলিত ধারণা, এমনকি উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণেও বলা যায়, প্রতিনিধিত্বশীলতার প্রক্রিয়া আর গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থা পরস্পর অভিন্ন জিনিস। উদাহরণস্বরূপ স্যামুয়েল হান্টিংটনকে উদ্ধৃত করে বলা যায়, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের আত্মা। এটিকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, এটি অপরিহার্য।’ বস্তুত ভোটের বিষয়টিকে এতো চিত্তাকর্ষকভাবে আদর্শায়িত করা হয়েছে যে এর ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া অনেক ত্রুটিবিচ্যুতিও মেনে নেয়া হচ্ছে। যেমন টাকা দিয়ে ভোট কেনা এবং ভোটারদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনামূলক সামগ্রী বিলিবন্টন করা। এর একটা কারণ হলো সার্বিক বিচারে নির্বাচনগুলো নিয়মিতভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এবং এর ফলে জনগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। আর কেবল শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাই যে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছে তা নয়। গরিব এবং পল্লী অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষও এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল হচ্ছে এবং এর মধ্যদিয়ে তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পরিপক্কতার পরিচয় দিচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের প্রজ্ঞা এবং বিবেচনাবোধ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। জরুরি অবস্থা এবং ৫ বছরের হিন্দু মৌলবাদীদের শাসন শেষে ভারতীয় ভোটারদের আচরণ তাদের রাজনৈতিক পরিপক্কতারই পরিচয় বহন করে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের মনে অসন্তোষ জন্ম নিতে শুরু করে। ওই সময় সংঘটিত অধিকাংশ হিংসাত্মক ঘটনা এবং বিদ্রোহের পেছনেও কাজ করেছিল এই অসন্তোষের ব্যাপারটিই। অন্যদিকে রাষ্ট্রও এই অসন্তোষ জন্ম নেয়ার কারণগুলোর সুরাহা না করে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের পথ বেছে নেয়। ফলে জনগণের বড় একটি অংশ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাব্য একটি কারণ এই যে, রাষ্ট্র ও সমাজে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কাঙ্খিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। আসলে ভারতীয় গণতন্ত্র কর্তৃত্বের অতিমাত্রায় কেন্দ্রিকতা এবং ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আসছে। মহাত্মা গান্ধী যথাযথভাবেই বিষয় সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছিলেন এবং এ জন্যই তিনি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে গ্রাম স্বরাজ স্থাপনের পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত গণতন্ত্রের চর্চাকে কার্যকরভাবে প্রসারিত করার জন্যে রাষ্ট্র যে পঞ্চায়েত রাজ কায়েম করেছিল তা খুব একটা ফলদায়ক হয়নি। এর ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সচল রাখার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মতামত প্রদানের আর কোনো সুযোগই থাকল না। প্রতিনিধিত্বশীলতার পদ্ধতিটিও তাই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলো না। এটি কেবল নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের একটি ভিত্তিই তৈরি করে দিতে পারলো।।