Home » অর্থনীতি » সরকারি হিসাবেই জীবন-যাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৪১ শতাংশ

সরকারি হিসাবেই জীবন-যাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৪১ শতাংশ

জিনিসপত্রের দাম বাড়ছেই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

economyসরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না মূল্যস্ফীতি। উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে ব্যাপকভাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চললে কয়েকদিন পর জোগান স্বল্পতা দেখা দেবে শহরগুলোয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভোক্তারা। ব্যবসাবাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে, চলছে না পণ্যবাহী গাড়ি। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের নভেম্বর মাসে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। পয়েন্ট টু পয়েন্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত অক্টোবর মাসে এই হার ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে। হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নভেম্বরে চাল, ডাল, আটা, মাছ, মাংস, শাকসবজি, দুধ ও অন্যান্য খাদ্য পণ্যের দাম বেড়েছে। আর এ কারণে গড় মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। নভেম্বরে খাদ্য পণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অক্টোবরে যা ছিল ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। তাই চাহিদার তুলনায় জোগান কম হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপর।

নভেম্বরে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। গত অক্টোবরে এটি ছিল ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। পরিধেয় বস্ত্র, আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি, চিকিৎসা সেবা, পরিবহন, শিক্ষা উপকরণ ও সেবা খাতের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। নভেম্বরে গড় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশে। আগের মাসে তা ছিল ৭ দশমকি ৫২ শতাংশ। এছাড়া খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আগের মাসে তা ছিল ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অক্টোবরে যা ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ সময়ে গ্রামেও গড় মূল্যস্ফীতির বেড়েছে। নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। অক্টোবরে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এছাড়া খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। আগের মাসে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। একই সঙ্গে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে হয়েছে ৪ দশমকি ৮৮ শতাংশ। অক্টোবরে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সরকারি হিসাবে বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ।

পাঁচ বছর আগে সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, সে সময় গরিবের মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ২৭ টাকা। সেই চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৪ থেকে ৩৬ টাকায়। মাঝে সব ধরনের চালের দাম আরও বাড়লেও চলতি বছরের শুরুর দিকে দর কিছুটা কমেছিল। কিন্তু দুই মাস ধরে চালের দাম আবার বাড়ছে। ২০০৮০৯ অর্থবছরে দেশে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। ওই অর্থবছরের অর্ধেক সময় পার হওয়ার পর, জানুয়ারিতে ক্ষমতা নিয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার। আর শাসন ক্ষমতার শেষ পূর্ণ অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০১২১৩ অর্থবছরের শেষে এসে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।

মাঝখানের চিত্রটি অবশ্য আরও খারাপ। বিবিএসের হিসাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বছরান্তে মূল্যস্ফীতির হার আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। যেমন ২০০৯১০ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, ২০১০১১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০১১১২ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা নিয়েছিল ভালো একটি সময়ে। বিশ্বমন্দার কারণে বিশ্বব্যাপী তখন কমছিল খাদ্যপণ্যের দাম। ফলে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, ২০০৯ সালের জুনে তা নেমেছিল ২ দশমিক ২৫ শতাংশে। এর পর থেকেই পরিস্থিতি আবার পাল্টাতে শুরু করে। বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতির চাপ। সরকারি হিসাবে বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যসূচক ছিল ২০৬ পয়েন্ট। মে মাসে মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ২৯০ পয়েন্টে। সাড়ে চার বছর সময়ে মূল্যসূচক বেড়েছে ৮৪ পয়েন্ট। এ হিসাবে সরকারের মেয়াদকালে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭৮ ভাগ।

এ সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে খাদ্যপণ্যের মূল্য। ২০০৯ সালে খাদ্যপণ্যের ভোক্তাসূচক ছিল ২২১ পয়েন্ট। ৯৮ পয়েন্ট বেড়ে মে মাসে তা ৩১৯ পয়েন্টে উঠে এসেছে। এ হিসাবে সাড়ে চার বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অবশ্য একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি।

টানা অবরোধের পর শুক্রবার মানুষ বাজারে ছুটেছে। কিন্তু নিু ও মধ্যবিত্তদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ছিল নাগালের বাইরে। সপ্তাহ ব্যবধানে লাগামহীন পণ্যের মূল্য বাড়ায় বেকায়দায় সীমিত আয়ের মানুষ। মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। দাম বেড়েছে চালেরও। খুচরা বাজারে নাজিরশাইল/মিনিকেট ৩৮ থেকে ৫৬ টাকা, পাইজাম/লতা ৩৮ থেকে ৪২ টাকা ও মোটা চাল স্বর্ণা ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। যা সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি।

চালের দাম বাড়া প্রসঙ্গে রাজধানীর চালের পাইকারি বাজার বাবুবাজারের চাল ব্যবসায়ীরা বলেন, হরতালে পরিবহন সংকটে চালের দাম কিছুটা বাড়তি। তবে গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এবার সব ধরনের চালের দামই অনেক বেশি। দাম কেন বেশি? জানতে চাইলে তারা বলেন, ধানের দাম বেশি তাই চালের দামও বাড়তি। একশ্রেণির চাল ব্যবসায়ী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তারা মনে করছে সরকার এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে বাজারে মনোযোগ দিতে পারবে না। মাছভেদে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এদিকে অবরোধের কারণে খালাস না করতে পারায় চট্টগ্রাম পোর্টে আটকে আছে আমদানিকৃত অনেক পণ্য। এগুলো একদিকে যেমন পচনের আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি আবার খালাস না করায় ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের জরিমানা। নাম না প্রকাশের শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শত শত কোটি টাকার মাল খালাস করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বিশাল অঙ্কের জরিমানা, যার ফলে বাজারে এসব মালের সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া পরিবহন খরচের কারণেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। আগে পণ্য পরিবহন খরচ ছিল ১৫ হাজার টাকা। এ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার টাকা। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বেই। রাজধানীর কাওরানবাজার, শান্তিনগর বাজার ও হাতিরপুল বাজার ঘুরে দেখা গেছে, টানা কর্মসূচির পর শুক্রবার অবরোধ না থাকায় বাজারে মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। দাম আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই ভিড় বাড়ছে বলে জানালেন ক্রেতারা। এ আশঙ্কা থেকে মধ্য, নিু ও বিত্তবানরা যে যার মতো কেনাকাটা করেছেন। বিত্তবানদের মাছমাংস বেশি কিনতে দেখা গেছে। আর মধ্য ও নিুবিত্তরা যেসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে অর্থাৎ চাল, ডাল, সবজি ইত্যাদি কিনেছেন বেশি। ক্রেতারা জানান, বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁঝ আর আদার তেজটাই বেশি। গত সপ্তাহে যে পেঁয়াজ (দেশি) প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৮০ টাকায়, এখন এর দাম ৫০৭০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রেতারা ১৫০ টাকা দাম হাঁকাচ্ছেন। পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এটি কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১০০১২০ টাকায় (মানভেদে)। পেঁয়াজের ঝাঁঝের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদার তেজ। গত সপ্তাহে যে আদার দাম ছিল ১০০ থেকে ১৬০, বিক্রেতারা এখন এর দাম হাঁকাচ্ছেন ২০০ টাকা। এক মাস আগে প্রতি কেজি দেশি রসুন ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে। আর ৬৫ টাকার আমদানি করা রসুন এখন কিনতে হচ্ছে ৮০ টাকায়। ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরের আদা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা দরে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের চালের দাম তিন থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। দেশি ও আমদানি করা মশুর ডালের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। চিনির দাম বেড়েছে তিন টাকা পর্যন্ত। আর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে লিটার প্রতি ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। দেশি মসুর ডাল কেজি প্রতি ১০০ থেকে ১১০ টাকা এবং চিনি ৫৮ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১০০ থেকে ১০৬ টাকা, আর বোতলজাত সয়াবিন তেল ১ লিটার ১১৭ থেকে ১২০ টাকা, ৫ লিটারের বোতল ৫৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০১৫ টাকা বেড়েছে। মুরগী ও ডিমের দামও উর্ধ্বমুখী। টানা অবরোধের কারণে মাছের বাজারেও একই অবস্থা। চাষের কৈ মাছের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০০ টাকা। বাইলা মাছ ১০০ টাকা বেড়ে ৬৫০ টাকা, কাচকি মাছ ৫০ টাকা বেড়ে ২৫০ টাকা, ইলিশ ২০ টাকা বেড়ে ১৮০ টাকা ও জাটকা ২০ টাকা বেড়ে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য মাছের দামও বাড়তির দিকে রয়েছে বলে জানালেন মাছ ব্যবসায়ীরা।।