Home » অর্থনীতি » অস্ত্র ক্রয়ে আন্তর্জাতিক দুর্নীতি :: সরকারগুলোর কোনো দায় নেই

অস্ত্র ক্রয়ে আন্তর্জাতিক দুর্নীতি :: সরকারগুলোর কোনো দায় নেই

imperialism-cartoonট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার। অথচ এই দুর্নীতি দমনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। এমনকি অনেক দেশে এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার বলে প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে জড়িতরা অবাধে দুর্নীতি করতে পারছে। দুর্র্নীতির মাত্রা যে কত ভয়াবহ, সাধারণ মানুষ তা জানতেও পারছে না। ব্রিটেনের গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এসংক্রান্ত প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ এখানে প্রকাশ করা হলো।

বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারকদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠসহ বেশির ভাগ দেশেই অস্ত্র ব্যবসায় দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য পেয়েছে ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)

রফতানিকারক দেশগুলোও এই দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার নয়। সন্দেহ হচ্ছে, তারা কেবল চোখ বুঝেই থাকে না, দুর্নীতিকে উস্কে পর্যন্ত দিয়ে থাকে। এই যেমন টিআই’র সমীক্ষায় অস্ত্র ব্যবসায় দুর্নীতিতে ‘অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি’তে থাকা সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া ও ওমানে অস্ত্র রফতানি করে ব্রিটেন। এসব দেশই ব্রিটেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সম্ভাবনাময় বাজার।

টিআই এই প্রথম এ ধরনের সমীক্ষা পরিচালনা করল। দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং বাণিজ্য ও শিল্পে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এনজিওটি এই উদ্যোগ নেয়। তারা তাদের সূচকে প্রতিরক্ষা খাতে সরকারগুলোর প্রয়াস তুলে ধরে। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উপাত্ত থেকে। প্রকাশ করা হয় ‘গভার্নমেন্ট ডিফেন্স অ্যান্টিকরাপশন ইনডেক্স’ শিরোনামে।

এতে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে বছরে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতি হয়ে থাকে। ২০০৯ সালে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে জি ৮ দেশগুলো সবাই মিলে ঠিক এই পরিমাণ অর্থই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

টিআই’র প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক মার্ক পেম্যান বলেন, ‘প্রতিরক্ষায় দুর্নীতি বিপজ্জনক, বিভক্ত সৃষ্টিকারী ও অপচয়মূলক। আর এর মূল্য দিয়ে থাকে নাগরিক, সৈনিক, কোম্পানি ও সরকারগুলো।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারগুলো এই দুর্নীতি প্রতিরোধে সামান্যই কোনো ব্যবস্থা নেয়। আর এর ফলে সাধারণ মানুষের নজর থেকে এসব দুর্নীতির দূরে থাকার বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। অথচ এসব অর্থ অপচয় না হয়ে আরো ভালো কোনো কাজে ব্যয়িত হতে পারত।’

টিআই সমীক্ষায় প্রতিরক্ষা দুর্নীতি প্রতিরোধে ৮২টি দেশের গৃহীত ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। এই দেশগুলোই ২০১১ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের ৯৪ ভাগ করেছিল। মোট পরিমাণটি ছিল ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

সমীক্ষায় দেশগুলোকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। শেষ তথা ‘এফ’ ভাগে থাকা দেশগুলোকে অভিহিত করা হয় ‘ভয়াবহ রকমের ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন।

ই’ ভাগের দেশগুলোকে অভিহিত করা হয় ‘অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ’। এসব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, শ্রীলঙ্কা, ভেনেজুয়েলা, ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া, মরক্কো, কাতার, উজবেকিস্তান ও জিম্বাবুয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলোতে দুর্নীতির সম্ভাবনা ‘নিম্ন’ বলে অভিহিত করা হয়েছে সমীক্ষায়। অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিতে দুর্নীতির শঙ্কা ‘খুবই কম’ বলে বলা হয়। এই তালিকায় কেবল এই দুটি দেশেরই স্থান হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশ দুটিতে প্রতিরক্ষানীতিতে পার্লামেন্টারি নজরদারি অত্যন্ত ব্যাপক।

সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় ৭০ ভাগ দেশ অপচয় ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। এসব দেশের অর্ধেকেরই প্রতিরক্ষা বাজেটে বলতে গেলে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা নেই, কিংবা থাকলে তা কেবল খুবই সীমিত তথ্যের ক্ষেত্রে। সমীক্ষায় আরো জানানো হয়েছে, ৭০ ভাগ দেশের নাগরিকদের গোপন অস্ত্র প্রকল্পগুলোতে তাদের সরকার কিভাবে ব্যয় করছে, তা জানতে দেওয়া হয় না।

সূচকে দেখা যায়, মাত্র ১৫ ভাগ সরকার প্রতিরক্ষা নীতিতে এমন রাজনৈতিক তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যা ব্যাপকভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর। ৪৫ শতাংশ দেশে প্রতিরক্ষা নীতিতে তেমন কোনো তদারকির ব্যবস্থা নেই। আর অর্ধেক ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ক্রয়ে ন্যূনতম মাত্রায় নজরদারি রয়েছে।

সমীক্ষার প্রধান লেখক অলিভার কভার বলেন, ‘এই সূচকটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করছে যে, এই খাতে দুর্নীতির মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টা ভুলভাবে বোঝা হয়। বিশেষ করে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে। আর তখন দুর্নীতি আরো ব্যাপক হতে পারে। আমাদের সূচক প্রত্যেককেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে এবং ঝুঁকি দূর করতে সহায়তা করবে।’

কভার আরো বলেন, ‘সরকারগুলের উচিত এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা। স্বচ্ছতা আনতে আমাদের প্রতিবেদন তাদেরকে বাস্তবসম্মত সমাধান দেবে। আর এটা করা গেলে সৈন্যদের জীবনও যেমন বাঁচবে, তেমনি নাগরিক ও সরকারের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারও বেচে যাবে।’