Home » অর্থনীতি » এমন তামাশার নির্বাচন নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

এমন তামাশার নির্বাচন নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

political-cartoons-25দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের কারণে দেশ বন্দী অবস্থায় রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির টানা অবরোধ ও হরতাল এবং একদলীয় একটি নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের অনঢ় অবস্থান পরিস্থিতিকে সঙ্গীন করে তুলেছে। অন্যান্য দিক বাদ দিলেও অর্থনীতির যে সীমাহীন ক্ষতি হচ্ছে তার প্রতি ক্ষমতাসীনরা নজর না দিয়ে ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্ধেকেরও বেশী প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। এ রকম একটি নির্বাচনের জন্য অর্থনীতিকে এমন দূর্দশার দিকে ফেলে দেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? কারণ সবাই আমরা জানি, এ নির্বাচনী গোয়ার্তুমির জন্যই আজকের এ পরিস্থিতি। এ সঙ্গীন পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়কে ঘিরে জামায়াতশিবিরের হরতাল যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। এসব ঘটনায় শুধু মানুষ নয় দেশের অর্থনীতিও অবরুদ্ধ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবীদরা। রাজধানীর সঙ্গে কার্যত বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ জেলা শহরের যোগাযোগ। টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে জনজীবন শুধু নয়, অর্থনীতিও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে বলেও খবর মিলছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক এ সহিংসতায় মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা আগামী মাসের বেতন প্রদান করা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে। দোকান বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা আÍঙ্কে রয়েছে বেতন পাবেন কিনা। রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিষয় আমলে না নিয়ে আরো সংঘাতের পথইে হাটছে। বিরোধী দলের অবরোধও চলছে, পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের মোকাবেলার প্রস্তুতিও চলছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের অবস্থা কেমন হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

হরতালঅবরোধে বন্ধ থাকছে দোকানপাট, কলকারখানার উৎপাদন। বিঘ্নিত হচ্ছে আমদানিরফতানিও। হরতালের কারণে ক্ষতির পরিমান কত? এ নিয়ে সরকারের কোনো হিসাব না থাকলেও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি এর এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, একদিনের হরতালে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৫৪ কোটি টাকা। বছরে গড় ক্ষতি ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ, বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতি। সাম্প্রতিক ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একদিনে হরতালের কারণে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হয় ১৬০০ কোটি টাকা বা ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে হিসেবে ১৫ দিনের হরতালে যে ক্ষতি হয় তা দিয়ে অনায়াসে একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাইকারী ও খুচরা ব্যবসা, স্থল পরিবহন, শিক্ষা এবং সেবা খাতে একদিনের হরতালে ক্ষতি হয় ৫০২ কোটি টাকা। আর তৈরি পোশাক শিল্পে ৪০০ কোটি টাকার উৎপাদন নেমে আসে ২০০ কোটি টাকায়। ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে সাদা পতকা মিছিল করেছেন। সভা করে কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়েছেন।

আমদানিরফতানি দুটোই কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রাজস্ব আয় এবং আয়কর দুটোই কমছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও দেখা দিচ্ছে ভাটা। আমদানি কম, তাই ডলারের চাহিদা কম। চাহিদা কমের কারণে এর দাম কম। দৃশ্যত সুখবর, কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত রফতানিকারকরা। তার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রেমিট্যান্সওয়ালারা। তারা যে ডলার দেশে পাঠায় তার দাম কম। অতএব, তারা ডলার পাঠাচ্ছেন চোরাইপথে হুন্ডিতে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। লাখ লাখ শ্রমিকের রুজি নেই, আবাসন খাত ক্ষতিগ্রস্ত, দোকানদারি নেই, দোকান কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত। আয় নেই মানুষের অথচ খরচ বেশি। এতে সঞ্চয় হবে বিঘ্নিত। যারা মধ্যবিত্ত, তারা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। নিুবিত্ত বিত্তহীন হবে। বিত্তহীন মারা যাবে। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে অগণিত লোক। রাজনীতি ধ্বংস হচ্ছে, অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে, শিক্ষা ধ্বংস হচ্ছে, সমাজ ধ্বংস হচ্ছে।

১ হাজার ২০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি পোশাক কারখানা আগুন লাগিয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে। যন্ত্রপাতি গেছে, কাঁচামাল গেছে, স্টক গেছে, বিল্ডিং গেছে। মালিকব্যবসায়ী টিভির সামনে অসহায়ভাবে কাঁদছেন, সাহায্য চাইছেন সরকারের, ব্যাংকারদের। ব্যবসায়ীশিল্পপতিরা একযোগে এসবের প্রতিবাদ করছেন। অর্থনীতি পুড়ছে, কৃষি পুড়ছে, আমদানিরফতানি ব্যবসা পুড়ছে, হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকগুলো অজানা আশঙ্কায় দিন গুনছে। এ কথা সবাই আমরা জানি যে, বহু কষ্টে া ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ৪০৪২ বছর লেগেছে এ স্তরে উঠতে। প্রথমে ৩, তারপর ৪, পরে ৫৬ এবং আরো পরে ৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে অর্জিত হয়েছে। ২০১৩১৪ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সব হিসাবেই বলছে, এ হার সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি হবে না। দীর্ঘদিন পর এ নিচুস্তরে আমরা নামব। বলা বাহুল্য, একে আবার ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে উন্নীত করতে অনেক দিন লাগবে। বর্তমান সহিংস রাজনীতি, সহিংস অবরোধ প্রভৃতির প্রথম শিকার হবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার।

পরিবহনের ব্যবস্থা নেই। আগে সড়কপথে সমস্যা হলে নৌপথে পণ্য আসত। এখন তাও সম্ভব নয়। নৌকা চলাচল বন্ধ। নৌপথে অবরোধ চলছে। তাও শুধু শুক্রবারটা বাদ। মাত্র ১২ ঘণ্টা সময়। এখন সার বীজ, তেল, কীটনাশক গ্রামে যাওয়ার কথা। পরিবহনের অভাবে তা যেতে পারছে না। ফলে আগামী বোরো ফসল হবে ক্ষতিগ্রস্ত। রবিশস্য এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডাল, সরিষা প্রভৃতি ফসল তোলা কঠিন ব্যাপার। চালের মৌসুম এখন। মিলাররা চাল করছেন। কিন্তু তা ঢাকায় আসছে না। পরিবহন নেই। পাওয়া গেলেও এর ভাড়া তিন গুণ। লাখ লাখ ড্রাইভারহেলপারপরিবহন শ্রমিক বেকার। তাদের বেতন নেই। রুটিরুজির পথ বন্ধ। মালিকদের পক্ষে বেতনভাতা দেয়া সম্ভব নয়। মালিকদের বিপদ অন্যত্র। অনেকেরই ব্যাংকঋণ আছে। তারা কিস্তি দিতে পারছেন না। শুধু পরিবহন ব্যবসায়ীরা নন, পর্যটনহোটেল ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক রফতানিকারকরা। সবাই ধেয়ে আসছে ব্যাংকের দিকে। ঋণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। সুদ মাফ করতে হবে। ব্লকড অ্যাকাউন্ট খুলে সুদ হিসাব বন্ধ করতে হবে। আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পিএডিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করতে হবে। ব্যাংকগুলোর গায়ে জ্বর এসে গেছে। এত বোঝা কীভাবে তারা বহন করবে। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের যে কড়াকড়ি নিয়ম, তা মেনে ব্যাংকগুলো কীভাবে গ্রাহককে সাহায্য করবে। কোথায় লাভমুনাফা? লোকসানের আশঙ্কা অনেকের। খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কা । তাহলেই আবার মূলধন ঘাটতি ।

দেশের অফিসআদালত থেকে রাস্তাঘাট, সেতু ভাংচুর করা হচ্ছে। এর ক্ষতি অনেক। গত এক বছরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিবহনের ক্ষতির একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তার মতে, শুধুমাত্র ভাংচুরের কারণেই গত এক বছরে পরিবহন মালিকদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, একদিন বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তিনি আরো জানান, গত এক বছরে হরতাল ও অবরোধসহ রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে প্রায় ৮০০টি গাড়ি এবং ভাংচুরের শিকার হয়েছে প্রায় ৩ হাজার উল্লেখ্য, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি মো. সবুর খান এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘একদিনের হরতালে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, তার পরিমাণ ২০ কোটি মার্কিন ডলার। পনেরো দিনের হরতালে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা দিয়ে অনায়াসে একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব’। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষণীয়। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গত কয়েক মাসের বিক্ষোভ, হরতাল ও অবরোধে দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পচনশীল পণ্যের উৎপাদক ও ব্যবসায়ী, রফতানিকারক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পরিবহন মালিকরা। ব্যাংকের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই তাদের

সাম্প্রতিক হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) অনেক বাসে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। এতে চার মাসে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সাম্প্রতিক হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) অনেক বাসে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। এতে চার মাসে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ১১ ডিসেম্বর থেকে ১০ এপ্রিল সময়ে যাত্রী পরিবহন আশঙ্কাজনকভাবে কমায় সংস্থাটির রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ফলে চার মাসে বিআরটিসির মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

বিআরটিসির ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও হরতালে বেসরকারি মালিকানাধীন প্রায় পাঁচ হাজার বাস ভাংচুর ও ৫০০ বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রচুর প্রাইভেট কারে আগুন দিয়ে মধ্যবিত্তদের সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করে দেয়া হচ্ছে। বিআরটিসির তথ্যমতে, সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে হরতালের দিনগুলোয় বসিয়ে রাখা হচ্ছে ভারত থেকে আনা নতুন আর্টিকুলেটেড (দুই বগিবিশিষ্ট জোড়া লাগানো) ৩৫টি বাস। পাশাপাশি ভারত থেকে আনা ২৯০টি দ্বিতল বাস, কোরিয়া থেকে আনা ১০০টি এসি ও ১৫৫টি ননএসি বাসও বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে চীন থেকে ২০১০ সালে কেনা পুরনো বাসগুলো দিয়ে যাত্রীসেবা দিচ্ছে সংস্থাটি। দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখার পাশাপাশি হরতালে সিটি সার্ভিসের যাত্রীও কমে গেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতায় ভাঙচুরজ্বালাওপোড়াও কর্মসূচিতে দেশের সড়ক পরিবহন খাতকে একটি প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রবণতাটি যেন বেড়েই চলছে। বিভিন্ন সময় সরকার ও বিরোধীদলগুলোর সহিংস কর্মসূচিগুলোর কবলে পড়ে সড়ক পরিবহনগুলো ১ হাজার ৪শ’ ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার লোকসান গুনেছে। বেকার থেকেছেন প্রায় ৬৮ হাজার পরিবহন শ্রমিক। চলতি বছর ৪৫ দিনের হরতালের অভিজ্ঞতা থেকে এখন হরতালের আগের দিন ও স্বাভাবিক দিনেও গাড়ি চালিয়ে নিরাপদ বোধ করতে না পারায় তাদের মাঝে একটা অসন্তোষও তৈরি হচ্ছে।।