Home » রাজনীতি » জামায়াত প্রশ্নে আওয়ামী কৌশল ও অপরিণামদর্শী বিএনপি

জামায়াত প্রশ্নে আওয়ামী কৌশল ও অপরিণামদর্শী বিএনপি

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-26এক. রাষ্ট্র যখন গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলতে থাকে, তখন রাষ্ট্র নাগরিকদের মিত্র থাকতে পারে না। নাগরিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি শত্রুতার। আরেকভাবে দেখতে গেলে রাষ্ট্রের গুনাগুনের পরীক্ষা অন্য কোথাও তেমন দিতে হয় না, যেমনটা হয় ব্যক্তি নাগরিকের জীবনে। কাদের সুবিধা হচ্ছে, কাদের জন্য ঘনিয়ে আসছে বিপদ, তা দেখেই বোঝা যায়রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকল কিনা! বাঙালী হিসেবে আমরা দুদুবার স্বাধীন হয়েছি, আত্মতৃপ্তি পেয়েছি, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম, এবার বুঝি সব সমস্যা সমাধান করে ফেললাম। কিন্তু নাগরিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র এই পরীক্ষায় কখনই পাশ করতে পারেনি। যে কারনে স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পরেও আমাদের রাষ্ট্র গঠনের লড়াইটি অব্যাহত রয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির ভাগ্যের পরিবর্তন, অল্প কিছু মানুষের সুখসমৃদ্ধি অন্যদের দুর্ভোগএর রহস্য নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের চরিত্র এবং রাজনীতিকদের কার্যকলাপের ভেতরেই। ব্যক্তি এখানে শক্তিহীন, এমনকি যাদের ভাগ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের ফলেতারাও কি শক্তিশালী? রাজনীতিকরা ক্ষমতার পরিবর্তন এবং এ নিয়ে যতটা ভেবেছেন, সমাজ পরিবর্তনের ব্যাপারে সে তুলনায় মোটেই তাদের আগ্রহ ছিল না।

অজস্র রক্ত ও প্রান বিসর্জনের মধ্য দিয়ে একাত্তরে যে রাষ্ট্রটি অর্জিত হয়েছিল, সীমাবদ্ধ সম্পদ আর বৈশ্বীক রাজনীতির বৈরী প্রতিকুলতা সত্বেও এই রাষ্ট্র কয়েকবারই অমিত সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল। এই ভূগন্ডের মানুষ নিজস্ব উদ্যমে ও নিজস্ব স্বপ্নে, নীরবে ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় রাজনীতিক এবং সুবিধাাভোগীদের সৃষ্ট অনেক বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করেছে। জাতি হিসেবে সীমা ছাড়িয়েছে দেশদেশান্তরে, অর্জন করেছে বৈশ্বীক চরিত্র। ব্যক্তি মানুষের এই অর্জন একটি রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করতে পারে, যদি রাজনীতিকরা এর সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন। কিন্তু সেটি হয়ে ওঠেনি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, রাষ্ট্র হয়ে উঠতে গেলে কি কি প্রয়োজন হয়? প্রচলিত সংজ্ঞাগুলি ঘেঁটে পাওয়া যাচ্ছে সীমানা, পতাকা, জনগোষ্ঠি, সরকার। এ সবই তো আমাদের আছে। তাহলে বিয়াল্লিশ বছর পরে বাংলাদেশ আজও রাষ্ট্র হয়ে উঠলো কিনা এ নিয়ে বিতর্ক করা কেন? রাষ্ট্রনৈতিক বিতর্কের গভীরে না যেয়ে আমাদের হালনাগাদ সংবিধানের দিকে চোখ বোলালে পাঠক এর খানিকটা উত্তর পেয়ে যাবেন।

পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করার পরেও সংবিধান শুরু হয়েছে পরম করুনাময়ের নাম দিয়ে। প্রজাতন্ত্রের একটি রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম। রাষ্ট্রের মূলনীতিতে সংযোজিত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। কি অদ্ভুত বৈপরিত্য! রাষ্ট্রের সংবিধান গড়ে ওঠে নানাবিধ আদর্শিক ধারাকে সমন্বিত করে। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র দুটি আদর্শের নাম। রাষ্ট্র এবং আদর্শকে কখনই বিভাজন করতে না পারায় রাষ্ট্রীয় মুলনীতিতে গণতন্ত্রকে সন্নিবেশিত করে জুড়ে দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। রাষ্ট্রের চরিত্র যদি গণতান্ত্রিক হয়, সেটিকে তো অবধারিতভাবে গণতান্ত্রিক হতে হবে। আমাদের রাষ্ট্র নির্মাতাদের এ সম্পর্কে কি কোন সন্দেহ ছিল গণতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা জুড়ে দিলে যে গোঁজামিলটি তৈরী হয়? এরকম অজস্্র গোঁজামিল দিয়ে সংবিধানকে পনের বার কাঁটাছেঁড়ার পরেও রাষ্ট্রকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে আমরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলছি। কেন বলা হচ্ছে এটি? কারন ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি দিনকে দিন সহিংস হয়ে উঠছে। ধর্মকে যদি একটি আদর্শ ধরা হয়, তাহলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মানেই হচ্ছে আদর্শভিত্তিক রাজনীতিকে রাষ্ট্র আর আশ্রয়প্রশ্রয় দেবে না। তাহলে যারা সমাজতন্ত্র কায়েমের রাজনীতি করবে তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কি বাধা হয়ে দাড়াবে? রাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নীতিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? সুতরাং রাষ্ট্র ও তার মূলনীতির ভেতর এই বহুমাত্রিকতা ও পরস্পর বিরোধীতা শুরু থেকেই আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বিয়াল্লিশ বছর পার করে যেখানে এসব জটিলতা থেকে আমাদের মুক্ত হবার কথা ছিল, সেখানে আরো অধিক, অধিকতর রাষ্ট্রনৈতিক এবং রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে আমরা ঢুকে যাচ্ছি।

দুই. বিয়াল্লিশ বছর পরেও কেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারল না বাংলাদেশ? গণতান্ত্রিক সরকার পালাবদলের পর কি হবে, নির্বাচন কিভাবে হবে, পতিত স্বৈরাচার এবং ফ্যানাটিকদের নিয়ে সেই পালাবদলের খেলার বলি এখনো কেন জনগনকে হতে হবে? এর শেকড় অনুসন্ধান করতে হলে এই ভূগন্ডের মানুষের নৃতাত্বিক ও সমাজতাত্বিক চরিত্রের ওপর দৃষ্টি ফেলতে হবে। বাঙালীর চরিত্রের ওপর আলো ফেলতে গিয়ে একজন লর্ড মেকলে’র বিশ্লেষন ছিল এরকমঃ বড় প্রতিশ্রুতি, মিথ্যা অজুহাত, জালিয়াতি, প্রতারনা, শপথভঙ্গএই এলাকার মানুষের এগোনো ও পেছোনোর অন্যতম অস্ত্র। আরেকজন সমাজতত্ববিদের ভাষায় বাঙালীরা সাধারনভাবে সৌন্দর্য্য প্রিয়, ভাবুক, স্পর্শকাতর, আরামপ্রিয়, চাটুকারিতা প্রিয় ও নিয়তিতে বিশ্বাসী। অন্যদিকে আবার পরশ্রীকাতর, অদুরদর্শী, ভীরু, কলহপ্রিয়, ষড়যন্ত্রকারী, বিশ্বাসঘাতক আর অকৃতজ্ঞ। কারন হিসেবে কবি, গবেষক মোহিতলাল মজুমদার মনে করেন, বাঙালী শংকর জাতি হওয়ার কারনে জাতিগত চরিত্র অদ্ভুত বৈপরিত্যে ভরা।

এরকম বৈপরিত্য সত্বেও বাঙালী কয়েক দশক পর পর জেগে ওঠে নবজাগরন ঘটেকিভাবে? ১৯৫২, ৭১, ৯০, ২০১৩, সবই কি বৃথা? এর কি কোন মূল্য নেই? এই জেগে ওঠা মানুষের সামুগ্রিক শক্তির কোন প্রয়োগপ্রভাব নেই? বাঙালীর এই হঠাৎ জেগে ওঠা প্রসঙ্গে সমাজতত্ববিদ কামরুদ্দিন আহমেদ ‘বাঙালীর মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ’ বইয়ে লিখেছেন, “জীবন সংগ্রামে বাঙালী অনেক জাতির চেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ কেটে গেলেই সে আবার ঝিমিয়ে পড়ে। তার নিষ্ঠার অভাব। সে শক্তিকে ধরে রাখতে পারে না। পরিশ্রম করা থেকে বিরত থেকে জয়ী হয়েও শেষ পর্যন্ত নিয়তির কাছে তার পরাজয় বরন করতে হয়।”এ পর্যবেক্ষণ যে কতোটা বাস্তব সেটি বাংলাদেশের জনগনের একের পর এক আন্দোলন, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জন কিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা অনুধাবন করা যায়।

তিন. রাজনীতিকরা বাংলাদেশকে এখন মহাসংকটের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। ক্ষমতাসীন সরকার ও দল ক্ষমতায় থাকার জন্য সবকিছুকে উপেক্ষা করে একটি একক নির্বাচন করে ফেলতে যাচ্ছেন। এটি করতে গিয়ে যে রাষ্ট্রনৈতিক সংকটগুলো তৈরী হয়েছে সেটি থেকে বেরিয়ে আসার কোন সুযোগই রাজনৈতিক দলগুলো অবিশিষ্ট রাখছে না। যুদ্ধাপরাধীর বিচার এবং জাতীয় নির্বাচন এক বিষয় নয়এটি ক্ষমতাসীন দল দাবি করলেও দুটি বিষয়কে নিয়ে রাজনৈতিক অসদুদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করতে গিয়ে আজকের এই সংকটকে তুঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল শুরুতে সেই যাত্রায় যে ভুলগুলি করা হয়েছে, তার মাসুল এখন জাতিকে গুনতে হচ্ছে। এটা দিবালোকের স্পষ্ট যে, যতটা না যুদ্ধাপরাধের বিচার, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখানে কাজ করেছে।

১৮ দলীয় জোটের প্রধান শরিক ক্ষমতাসীনদের এই পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে এবং যদিও তারা দাবি করে আসছে যে, যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে জামায়াতের ধ্বংসাত্মক আন্দোলন ও নাশকতামূলক কর্মকান্ড তারা সমর্থন করে না। তারা শান্তির্পূর্ন আন্দোলন করছে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে এবং সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে। কিন্তু জনগন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, প্রধান বিরোধী দল নিজেদের যোক্তিক আন্দোলনকে জামায়াতশিবিরের সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি করে ফেলেছে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, ভিডিও বার্তা বিবৃতির মাধ্যমে বিএনপি’র কর্মসূচি ঘোষিত হবার পরেই জামায়াতশিবিরের ক্যাডারদের হত্যা, নৈরাজ্য এবং নাশকতা শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে কাদের মোল্লার প্রানদন্ড কার্যকর হবার পরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা ও জনগনের ওপর আক্রমন মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা মনে করিয়ে দেয়। সরকার এরকম একটি পরিস্থিতি সম্ভবত: চাচ্ছিলএই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে একক নির্বাচনটি সম্পন্ন করে ফেলতে এবং বিএনপি’র এই অপরিনামদর্শী আন্দোলন জনগনের বিপক্ষে সেই কাজটিকে সহায়তা করছে বলে জনগনের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

চার. বাংলাদেশের সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত অর্থনীতি এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনজীবিকা। অর্থনীতি অচল হয়ে যাবার জোগাড়। বাংলাদেশের সাধারন মানুষের নীরব উদ্যোগগুলোর ফলে গত দুই দশকে অর্থনীতির অর্জনগুলো ভেস্তে যেতে বসেছে। সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, উৎপাদন কমে যাচ্ছেধ্বংস হচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। যুদ্ধাবস্থার মত প্রতিদিনই জীবন হাতে নিয়ে স্বল্প আয় মানুষদের কাজে নামতে হচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকে বুঝতে হবে যে, তাদের কাঁধে ভর করে জামায়াত রাষ্ট্র ও জনগনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধাত্মক সহিংসতায় লিপ্ত রয়েছে। নিবন্ধন বাতিল হওয়া ও শীর্ষ নেতাদের বিচার বন্ধে তারা চরম নৈরাজ্যের দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এর মধ্যে সরকার তার একক নির্বাচন অনুষ্ঠান এজেন্ডা বাস্তবায়নে জামায়াতের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নিয়ে অবাধে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দিচ্ছে। এর অন্তর্নিহিত কারন হচ্ছে, মূল দাবির প্রতি জনগনের দৃষ্টিকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা। যদি বিএনপি একটি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায় তাহলে তাকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে জামায়াত প্রশ্নে তাদের সিদ্ধান্ত কি হবে? জনগন স্পষ্ট করে সেটিই জানতে চায়?