Home » আন্তর্জাতিক » প্রধানমন্ত্রী হলেও কি মোদি আমেরিকায় নিষিদ্ধ থাকবেন?

প্রধানমন্ত্রী হলেও কি মোদি আমেরিকায় নিষিদ্ধ থাকবেন?

জন হাডসন

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

narendra-bhai-modiভারতে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কয়েকটি রাজ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় ধরনের কিছু কূটনীতিক সমস্যা ফুটিয়ে তুলেছে: ২০১৪ সালে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে যে লোকটি জয়ী হবেন বলে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করার আইনগত অধিকার রাখেন না। কারণ: সহস্রাধিক ব্যক্তি হত্যাকারী মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় তার সম্পৃক্ততা। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাটি অনেক ভারতীয়ের কাছে অপমানকর এবং তা ভবিষ্যত মার্কিনভারত সম্পর্কে হুমকি সৃষ্টিকারী। কিন্তু তবুও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের হাতে খুব কম বিকল্প রয়েছে।

গত সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যসভা নির্বাচনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে। জনমত জরিপকারীরা এখন বলছেন, আগামী বছরের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। আর এর ফলে প্রধানমন্ত্রী পদে দলটির বিতর্কিত প্রার্থী নরেন্দ্র মোদিই হবেন ভারতের পরবর্তী নেতা। প্রধানমন্ত্রী মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে কি না তা এখনো পররাষ্ট্র দফতর জানায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিনভারত সম্পর্কে বেশ প্রকট আকারে প্রভাব ফেলবে।

পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ম্যারি হার্ফ ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনকে বলেছেন, ‘ফলাফল কী হবে সে সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী আমি করছি না।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্টিভিস্টরা আমাদের জানাচ্ছেন যে, মোদি যদি কখনো আমেরিকায় পা ফেলার চেষ্টা করেন, তবে তারা বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ করবেন।

পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হলেও অসহিষ্ণু হিসেবে নেতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাকে কূটনীতিক ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, ২০০২ সালে গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তার ভূমিকার কারণে তার বিদ্যমান ব্যবসায়িক ভিসাও বাতিল করেছিল। ওই দাঙ্গায় প্রায় এক হাজার লোক নিহত হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগই ছিল মুসলমান। অভিযোগ রয়েছে, মোদিই ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়েছিলেন। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে গুজরাটের মুসলিম সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এর পরপরই মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব পাস হয়, যাতে নাৎসি আদর্শ এবং ‘বর্ণবাদী ঘৃণা’ বিস্তারের জন্য তার নিন্দা করা হয়। তবে মোদির সমর্থকেরা বলছেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ করার একটি বিশেষ তদন্ত দল দাঙ্গায় তার কোনো অপকর্মের সন্ধান পায়নি। তারা জোর দিয়ে বলছেন যে তিনি গুজরাটকে ভারতের অন্যতম দ্রুতপ্রবৃদ্ধি লাভকারী রাজ্য হিসেবে এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তবে ২০০৫ সালে মার্কিন কর্মকর্তারা এক অপরিচিত ও প্রাদেশিক ভারতীয় রাজনীতিবিদকে কালো তালিকাভুক্তিতে সামান্যই ঝুঁকি দেখতে পেয়েছিলেন। ওই সময়ে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের আওতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ভিসা বাতিল করে দেয়। ওই আইনে বলা হয়েছে, যেসব বিদেশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ‘মারাত্মকভাবে’ লঙ্ঘন করেন, তারা আমেরিকা ভ্রমণে যোগ্য নন। তবে বর্তমানে মোদি জাতীয় রাজনৈতিক অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, তাকে অবজ্ঞা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার সঙ্গে কাজ করার একটা উপায় বের করতে হবে,’ বলেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইন্ডিয়া প্রজেক্টের পরিচালক তানভি মদন। ‘প্রশ্ন হলো ওই কাজটি আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে না পরে করা হবে।’

কিন্তু উভয়টিতেই রয়েছে ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্র যদি মোদির ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখে এবং রাষ্ট্রদূতপর্যায়ে কূটনীতিক আলোচনা থেকে তাকে বাইরে রাখে, তবে বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে বাইরে রাখার ঝুঁকি নিতে হবে। অন্যদিকে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও জার্মানি মোদির সঙ্গে রাষ্ট্রদূতপর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি অবস্থা বজায় রাখা হলে তা হবে কোটি কোটি ভারতীয়ের জন্য অপমানকর।

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নেতৃত্ব এবং বিজেপির সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে,’ বলেন কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মিলন বৈষ্ণব। ‘আমরা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে কথা বলছি। কোনো আদালতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি, কোনো অপরাধে তিনি অভিযুক্ত হননি, তার বিরুদ্ধে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। ফলে কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র তাকে তাদের দেশে আসা প্রতিরোধ করতে পারে?’

তবে বিজেপির ইতিহাস ব্যাখ্যায় সবাই একমত নয়। মোদির কার্যক্রম নিয়ে ক্যাপিটল হিলে প্রবল উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের (আইএএমসি) মতো মোদিবিরোধী গ্রুপগুলো মোদির সমর্থক সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত। তারা মোদিকে গণহত্যাকারী হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী মনে করে। কেউ যাতে তার সমর্থনে কিছু করতে না পারে, তা তারা নিশ্চিত করতে চায়। আইএএমসি ক্যাপিটল হিলে তাদের দাবি ফলপ্রসূ করার জন্য ফিডেলিস নামের একটি লবি ফার্ম ভাড়া করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী মোদি যাতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য মোদিবিরোধী গ্রুপগুলো আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানতে পেরেছে। ‘আমাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের স্বজনদের সঙ্গে কাজ করছে,’ জানিয়েছেন কোয়ালিশন অ্যাগেইনেস্ট জেনোসাইডের প্রতিষ্ঠাতা শেখ উবাইদ। তিনি বলেন, ‘মোদি যুক্তরাষ্ট্রে আসতে চাইলে আমরা তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও নির্যাতন মামলা দায়ের করতে প্রস্তুত।’

তবে হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের মতো মোদিপন্থী গ্রুপগুলো অভিযোগ করেছে, মোদিবিরোধী গ্রুপগুলো ভারত ও এর নেতাদের নামে কলঙ্ক ছড়াচ্ছে। ‘এটা অবশ্যই হতাশাজনক যে ভারতীয়আমেরিকানেরা ভারতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক একটি ত্রুটিপূর্ণ ও অপমানকর প্রস্তাব প্রয়োগের জন্য আমেরিকান লবিং ফার্মকে নিয়োগ করেছে,’ বলেছেন হিন্দু আমেরিকা ফাউন্ডেশনের জে কানসারা।

মোদিপন্থী শিবির ক্যাথি ম্যাকমরিক রজার্স এবং অ্যারন শ্যাককের মতো উচ্চপদস্থ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের দ্বারস্থ হয়েছে। তবে ফলাফল মিশ্র। ২০১৩ সালে গুজরাট সফরের পর ম্যাকমরিক মোদির উচ্ছৃসিত প্রশংসা করলেও গণহত্যাবিরোধী গ্রুপগুলোর অভিযোগের পর নভেম্বরে ক্যাপিটল হিলে ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে রিপাবলিকান নেতাদের সাথে কথা বলার আমন্ত্রণে সাড়া দিতে অস্বীকার করেন।

আইনগতভাবে মোদির ভ্রমণ মর্যাদাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের জন্য কঠিন কিছু নয়। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের আওতায় পররাষ্ট্র দফতর আগে মোদিকে ভ্রমণ করতে না দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও বর্তমানে তারা ওই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে বাধ্য নয়।

হার্ফ বলেন, ‘আমাদের স্থায়ী নীতি হলো মুখ্যমন্ত্রী ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন এবং অন্য যেকোনো আবেদনকারীর মতো তার আবেদনও যাচাইবাছাই করা হবে। আর সেটা হবে মার্কিন আইন অনুসারে।’ তবে মোদি সম্ভবত ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নতুন করে আবেদন করবেন না।

বিকল্পভাবে যুক্তরাষ্ট্র চলনসই একটা কাজ করতে পারে, যেমন একটি বিবৃতিতে বলে দিতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র কখনো ভারতের কোনো নেতাকে তাদের দেশে প্রবেশে বাধা দেবে না। তবে এতেও সমস্যা আছে। ‘পররাষ্ট্র দফতরের বন্ধুরা বলছেন, তারা এই ইস্যুটির ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন রয়েছেন। তবে নির্বাচনের কারণে সংযত রয়েছেন,’ জানিয়েছেন বৈষ্ণব। ‘তারা এটাকে ভারতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রার্থী সম্পর্কে অনুমোদনসূচক বা অনধিকারমূলক কাজ করতে চান না। পররাষ্ট্র দফতর ভারতীয় সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার খবর হতে চায় না।’ মদনও এর সঙ্গে একমত। ‘ভারতে বৈদেশিক হস্তক্ষেপের যেকোনো ইঙ্গিত চরম নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। কংগ্রেস দল বলতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র মোদির পক্ষ নিয়েছে।’

মোটামুটিভাবে বলা যায়, পররাষ্ট্র দফতর এই ইস্যুতে চুপচাপ রয়েছে। ‘ইস্যুটি যে পররাষ্ট্র দফতরের জন্য উভয় সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে সামান্যই,’ বলেছেন মদন। ‘ভারতীয় রাজনীতিতে মোদি একটি বড় ব্যক্তিত্ব। তারা বিভিন্ন দৃশ্যপট নিয়ে চিন্তা করেনি, এমনটা কল্পনা করা অসম্ভব। তবে তারা কী চায়, তা অস্পষ্ট।’

(ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন, ১১ ডিসেম্বর ২০১৩)