Home » প্রচ্ছদ কথা » বন্ধুহীন বাংলাদেশ ॥ ভবিষ্যৎ সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতার সঙ্কট

বন্ধুহীন বাংলাদেশ ॥ ভবিষ্যৎ সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতার সঙ্কট

আমীর খসরু

political-cartoons-28প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাষায় জনসমক্ষে বলেছেন, কারো টেলিফোনে কোনো কাজ হবে না। আপাত দৃষ্টিতে নির্দোষ এ কথাটি তিনি যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হয়নি। আপাত নির্দোষ হলেও বাস্তবে শেখ হাসিনা দুনিয়ার তাবৎ শক্তিকে যে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তাও স্পষ্ট। আর বিশ্বজুড়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ এ দু’জন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে এমন কথা বলতে পারার মধ্যে দু’টো দিক আছে এক. এতে নেতৃত্বের সক্ষমতা, দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আরও প্রয়োজন হয়, ওই দুটোর সমন্বয়ে দেশের জনগণের উন্নয়নের মাধ্যমে সম্পৃক্তি বাড়িয়ে তাদের আস্থা অর্জন। দুই. এটা নেহায়তই বোকামি বা গোয়ার্তুমি কিংবা দুয়ের মিশেল। কিন্তু টেলিফোন করে তারা কি বলেছিলেন? দুজনেরই অভিন্ন একটি কথা ছিল, বার্তা তারা দিয়েছিলেন, আর সেটি হলো সমঝোতার ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। আর এতেই শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন।

ওই দুজনের বক্তব্য যে শুধুমাত্র তাদের বক্তব্যই নয়, এটা যে একটি মাত্র দেশ বাদে সারা দুনিয়ার ক্ষমতাধর, প্রভাবশালী দেশগুলোরই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি, পররাষ্ট্রনীতির প্রতিচ্ছবি তা বুঝতে হয় প্রধানমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন অথবা দ্বিতীয় যে কারণটির কথা ইতোপূর্বে বলা হয়েছে তারই লক্ষণ।

ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে। কিন্তু তারানকো মিশন ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ যে হবে তা আঁচ করতে পেরেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মধ্যেই একটি আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল, টিকে ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। তারানকো তার এবারের ঢাকা সফরের প্রথমদিকে দৌড়ঝাপ আর দফায় দফায় বৈঠক করে বুঝতে পারলেন আসল সমস্যাটি হচ্ছে কার অধীনে নির্বাচন হবে প্রশ্নটি সেখানে। বিষয়টি স্পর্শকাতর বলে তিনি সমঝোতার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে এই প্রক্রিয়াকে দুটো ভাগে ভাগ করলেন। প্রথম দফায় তিনি চাইলেন দৃশ্যমাণ একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে উভয় পক্ষকে আলোচনা বসানো। আর প্রথম দফার আলোচনা সফল হলে দ্বিতীয় দফায় তিনি মূল প্রশ্নের আলোচনা শুরু করবেন। প্রথম দফার শর্ত হিসেবে তিনি সরকার পক্ষকে বললেন, ঘোষিত তফসিল পেছানো, আন্দোলনসংগ্রামকালে গ্রেফতারকৃত বিরোধী নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলামোকদ্দমা প্রত্যাহার, সভাসমাবেশের অধিকার প্রদানসহ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। অন্যদিকে তিনি বিরোধী দলকে বললেন, এটা পূরণ হলে আলোচনাকালীন সময়ে কোনো ধরনের কর্মসূচি দেয়া যাবে না। বিরোধী দল এতে রাজি হয়ে প্রথম দফার আলোচনায় বসলো। সরকারি দলের নেতারাও বললেন, ওই শর্ত পূরণ তাদের দৃষ্টিতে সম্ভব, তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবের কথা শুনেই যারপরনাই নাখোশ হলেন তার নেতাদের উপরে। তিনি পাল্টা প্রস্তাব দিলেন, এ শর্ত মানা যাবে তবে নির্বাচনটি অতি অবশ্যই হতে হবে তার অধীনে এবং বিএনপিকে অবিলম্বে হরতালঅবরোধ প্রত্যাহার করে ভবিষ্যতে তারা এমন কর্মসূচি দেবে না এ ঘোষণা দিতে হবে। এরপর ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে নানা ঘটনা ঘটানো হলো আলোচনা ভেঙে দেয়ার জন্য। (এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে আমাদের বুধবার এর ৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিশ্লেষণ – ‘কেন ব্যর্থ হলো তারানকো মিশন)। কিন্তু বিরোধী দলের দৃষ্টিকে অন্যত্র সরিয়ে রাখার জন্য সরকারী দলের পক্ষ থেকে বলা হলো তারা আলোচনায় রাজি। অস্কার ফার্নান্দেজ সরকারী দলের কূটকৌশলের কাছে হার মেনে গেলেন। তিনি তার সফর একদিন বাড়িয়ে দিলেন এই আশায় যে, সমঝোতা হলেও হতে পারে। দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরুর কিছু সময়ের মধ্যেই সরকারী দলের পক্ষ থেকে এর নেতারা এক সুরে প্রধানমন্ত্রী যা শিখিয়ে দিলেন তাই বলতে থাকলেন। শুধু তারানকোই নয় বিরোধী দলের নেতারাও বিস্মিত হলেন। তারানকোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি আর হলো না। অবশ্য হওয়ার কোনো কারণও নেই।

প্রধানমন্ত্রী মনে করতে পারেন তারানকোর উৎপাত থেকে তিনি বেঁচে গেছেন। কিন্তু এতে যে কোনো লাভ হয়নি তা ক্রমে ক্রমে টের পাওয়া যাচ্ছে। অস্কার তারানকোর সফরটি সফল না হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তিনি ইতোমধ্যে তার আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট জমা দিয়েছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।

তারানকো পরবর্তী সময়কালে সহিংসতা আরো বেড়েছে। দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক উদ্বেগউৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হচ্ছে। কারণ এমন একটি উত্তরাধুনিক বা পোস্ট মর্ডান নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে অর্ধেরও বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। যে নির্বাচন নিয়ে এত সঙ্কট, এত সংলাপ তা এখন গিনেজ বুক তো অবশ্যই বিশ্ব ইতিহাসেও স্থান করে নিয়েছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ওই সব উদ্বেগউৎকণ্ঠা, পরামর্শ আর টেলিফোনকে কেন তোয়াক্কা করবেন? তিনি হয়তো মনে করছেন ইতিহাস সৃষ্টিতে ওরা বাধা সৃষ্টিকারী।

এ উদ্বেগউৎকণ্ঠা, পরামর্শ আর সহযোগিতার আশ্বাসে কাজ না হলে অভ্যন্তরীণভাবে তো অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের সামনে একটি কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসার বিষয়টি নিয়ে এখন আর কেউ আলোচনাই করছেন না। বরং এর চেয়ে বড় বড় ঘটনা এখন ঘটতে শুরু করেছে। যার কিছুটা দেখা গেল ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের কার্যক্রমে। বিজয় দিবসের মতো জাতীয় উৎসবের অনুষ্ঠান নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তা এদেশে আর কখনই ঘটেনি। কূটনৈতিক দিক থেকে এটা সত্যিকার অর্থেই নজিরবিহীন। সম্প্রতি ইইউ পার্লামেন্টের কর্ম অধিবেশনে বাংলাদেশের বিদ্যমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর এতে প্রকাশিত হয় তাদের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। একটি প্রস্তাবও পাস হয় ওই পার্লামেন্টে। ধারণা করা হচ্ছে, অচিরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠবে। এবারে গতবারের মতো শুধু উদ্বেগ জানানোর মধ্যদিয়েই তারা ক্ষান্ত দেবেন কিনা সন্দেহ। এ কথাটি মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন পণ্য রফতানির বিশাল বাজার রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে।

মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের পক্ষ থেকে আবারও মার্কিন কংগ্রেসে শুনানি অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম দফার যে শুনানিটি অনুষ্ঠিত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুখকর হয়নি। জানুয়ারির সম্ভাব্য শুনানিটি কেমন হতে পারে তা বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না।

এ কথা অনেকেরই জানা এবং এ সম্পর্কে বহুবার বলা হয়েছে যে, জাতিসংঘ এমনই একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা নিজেরা এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় মূলত প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে আলাপআলোচনা এবং অনুমোদন সাপেক্ষে। বাংলাদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যে সঙ্কট, সংঘাত, সহিংসতা চলছে সেক্ষেত্রে জাতিসংঘ কি সিদ্ধান্ত নেবে তা স্বল্পকালেই জানা যাবে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী নিউইয়র্ক টাইমস তার সম্পাদকীয়তে ইঙ্গিত দিয়েছে যদি সংঘাতসহিংসতা না কমে তবে নিষেধাজ্ঞা আসলেও আসতে পারে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার নানা ধরন রয়েছে। যে ধরনেরই হোক না কেন, যে দেশের বিরুদ্ধে ওই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় সে দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মক পর্যায়ে ক্ষুণ্নহয়।

জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাবটি এখনও রয়েছে। কিন্তু ওই সংস্থাটির বিবাদমান পক্ষগুলো রাজি না থাকলে কখনো কোন নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজনের দিকে যায় না। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে এমন পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধ্য করা হয় যাতে নির্বাচনটি তাদের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশীদের সংখ্যা তালিকার শীর্ষে। শুধু জাতিসংঘ বা পশ্চিমী প্রভাবশালী দেশগুলোই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কি করবে তাও বিচার্য বিষয়। ইতোমধ্যে জনশক্তি রফতানি তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। নানাবিধ চাপ রয়েছে দেশটির উপরে। যদিও সরকার প্রধান ওই চাপকে তোয়াক্কা করেন না, তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি তোয়াক্কা করুন কিংবা নাই করুন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার আরো চাপের মুখে পড়বে বলেই মনে হয়। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে যে সরকারটি গঠিত হবে, সে সরকার শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণভাবেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও চরম বৈধতার সঙ্কটে পড়বে। অব্যাহত সংঘাতসংঘর্ষ আর তা দমনে যে সব সশস্ত্র কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে তা চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে বহু গুণে। এ চাপের সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেবে আরও বৈধতার সঙ্কট।।