Home » মতামত » ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার জন্য সংবিধানের দোহাই

ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার জন্য সংবিধানের দোহাই

ফারুক আহমেদ

freedom-of-thoughtবাংলাদেশে এ পর্যন্ত সব শাসক দলের ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার প্রয়াস এবং সকল কর্মকান্ডের জন্য সব সময়ই সংবিধানের দোহাই দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে শাসক দলগুলোর রাজনীতি কখনোই জনস্বার্থ নিয়ে আবর্তিত হয়নি। আবর্তিত হয়নি ক্ষুধা দারিদ্র, স্বাস্থ্যশিক্ষা,শিল্পকৃষি সংক্রান্ত কোন নীতির সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে। সব সময়ই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রানান্তকর চেষ্টা হয়েছে। বিয়াল্লিশ বছর ধরে এর উপরই শাসক দলগুলোর রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। সংবিধানের দোহাই এর রাজনীতি এখন যে পর্যায় অতিক্রম করছে গণতান্ত্রিক এবং সভ্য দুনিয়ায় এর কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে সংবিধান কি শাসক দলের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার রক্ষা কবজ, নাকি জনগণের অধিকার সংরক্ষণের দলিল?

সংবিধান কোন ধ্র“ব বিষয় নয়। সংবিধানের প্রকৃতি নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের উপর। এক.সংবিধান কাদের দ্বারা প্রণীত। দুই.কারা, কেন এবং কিভাবে সংবিধানের বিধানগুলো পালন করবে।তিন .কারা কোন কোন লক্ষ্যে সংবিধানের বিধানগুলো প্রয়োগ করবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে জনগণের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে, প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহনে। ফলে এই রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিমূলে রয়েছে গণতন্ত্রের কথা। সেদিক দিয়ে শাসন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হবে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। শাসন ব্যবস্থার রূপ এবং জনগণের অধিকার সংরক্ষনের জন্য সংবিধানও গণতান্ত্রিক হওয়ারই কথা ছিল। গণতান্ত্রিক সংবিধানের অর্থ কতকগুলো ভাল মানুষের ভাল ভাল কথা লিপিবদ্ধ করে রাখা বই হতে পারে না। তাই বাংলাদেশের গোড়ার সংবিধান কতটা ভাল বা মন্দ তা শুধুই কথার ভাল মন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে যদি এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয় যে, সে সংবিধানের প্রণেতা কারা ছিল। সংবিধানের প্রণেতা কারা ছিল তার উত্তর পাওয়া যায় যখন সংবিধান প্রণেতা হিসেবে কতকগুলো ব্যাক্তি বিশেষের নাম এমনভাবে উচ্চারিত হয় যেন সংবিধানের বিধানগুলো তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ভাল মানুষি অভিপ্রায় থেকে প্রণীত। এর মধ্য দিয়ে বুঝা যায় বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে জনগণের প্রত্যক্ষতো বটেই পরোক্ষ ভূমিকাও ছিল না। যে জনপ্রতিনিধিদের কথা বলা হয় জনগণ তাঁদেরকে সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত করেননি।

বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহনে রাষ্ট্র গঠন হলেও সংবিধান প্রণয়নে জনগণের ভুমিকা না থাকাই জনগণের সংগ্রামের এক বড় অসমাপ্তির এবং অপ্রাপ্তির দিক। পরাধিন দেশে এই জনপদের মানুষের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বঞ্চনা যেমন ছিল স্বাধীন দেশে নিজেদের দ্বারা গঠিত রাষ্ট্রে জনগণ অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়নি। আর স্বাধীন দেশে জনগণের রাজনৈতিক বঞ্চনার গোড়ার কথা হলো সংবিধান প্রণয়নে তার ভুমিকা না থাকা।

একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের মূল কথা হতে হয় ()একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচিত শাসক দল এবং তাদের সরকার যাতে গণবিরোধী এবং স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে () শাসক দল যাতে নির্ধারিত কাঠামো এবং নীতির বাইরে কোন আইন প্রণয়ন বা কালাকানুন প্রণয়ন করতে না পারে () নিজেদের ইচ্ছামত জনগণের কোন রকমের অধিকার হরণের নীতি গ্রহণ না করা () ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কোন রকমের ফাঁকফোকর তৈরী করতে না পারে ইত্যাদি। তাই গণতান্ত্রিক সংবিধান কখনোই শাসক দলের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার সাংবিধানিক অজুহাত তৈরীর বিষয়ে পরিণত হতে পারে না। এ সংবিধান জনগণের ভোটে নির্বাচিত শাসক দলকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অধিকারকে সংরক্ষণ করে। এই দায়ীত্ব পালনের বাইরে শাসক দলের এবং সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন এবং এ সময়ের বাইরের সকল স্বৈরাচারী এবং দমন মূলক আচরণের থেকে জনগণের রক্ষা কবজ হলো সংবিধান। সেদিক দিয়ে সংবিধান হলো ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে শাসক দলের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জায়গা। সরকারের দায়বদ্ধতার জায়গা হলো সংবিধান।

একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণীত হওয়ার কথা সংসদে সাংবিধানিক সভার মাধ্যমে। আর সেখানে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের আশাআকাঙ্খাই প্রতিফলিত হবে এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এটা এ দেশে কখনই হয়নি। কারণ সংবিধান প্রণয়ন এবং পরবর্তীতে এর খোলনলছে পাল্টে ফেলা হয় জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধেই। অর্থাৎ সংবিধানটি শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় জনগণকে নানা ধরনের নির্যাতননিপীড়নের বৈধতা দেয়ার একটি পুস্তকে। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলগুলো গণদাবিকে উপেক্ষা করার জন্য সাংবিাধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে, সংকটের কথা বলে। কিন্তু হওয়ার কথা তার উল্টো। ক্ষমতাসীনদের দমনমূলক এবং স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরূদ্ধে জনগণের হাতিয়ার হওয়ার কথা সংবিধান। বাংলাদেশে তা কখনোই হয়নি। বরং শাসক দলের জনগণের উপর যত দমনপীড়ন, যত গণবিরোধী নীতি সব কিছুই হয়েছে সংবিধানের দোহাই দিয়ে। তাই শাসক দল যখন সংবিধান রক্ষার বা সংকটের কথা বলে তখন তারা নিজেদের শাসন ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জনগণের দিক থেকে প্রতিরোধ এবং বাধা উত্তরণের কথাই বলে। শাসক দল যে সংবিধানের দোহাই দেয় তা জনগণ দ্বারা প্রণীত নয়। এ সংবিধান শাসক দলের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। এ পর্যন্ত পনেরোবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। কোন সংশোধনই জনগণের অভিপ্রায়ে হয়নি। হয় শাসক দলের স্বার্থ সংরক্ষণে অথবা শাসক দলগুলোর মধ্যকার সংকট নিরসনে তাদের অভিপ্রায়ে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান শাসক দল সংবিধানের যে পঞ্চদশ সংশোধন করেছে সেখানে জনগণের অধিকার এবং জনস্বার্থ স¤পূর্ণরূপে উপেক্ষিতই শুধু হয়নি পদদলিত হয়েছে।

শাসক দলের সংবিধান রক্ষার দোহাই মানেই সংবিধানের নামে তাদের অন্যায্য স্বার্থরক্ষার দোহাই। যে সংবিধান জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না, জনগণের দিক থেকে সে সংবিধান রক্ষার সংগ্রাম নয় বরং জনগণের সংগ্রাম হলো তাদের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহনে সংবিধান সভার মাধ্যমে নিজস্ব সংবিধান প্রণয়নের সংগ্রাম। জনগণের সামনে এখন এটাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগ্রাম।।