Home » রাজনীতি » নজিরবিহীন নির্বাচন

নজিরবিহীন নির্বাচন

. মীজানূর রহমান শেলী

political-cartoons-27রাজনৈতিক দার্শনিক যাঁ য্য রুশোর পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের প্রতি কোনো ভালোবাসা ছিল না। গণতন্ত্র বলতে তিনি প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোতে সক্রিয় প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বুঝতেন। আধুনিককালে বিশাল ও জনবহুল দেশগুলোতে ওই ধরনের সরকার থাকতে পারে না। আধুনিককালে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রধানত চালু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। অবশ্য, রুশো সে ধরনের সরকার পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করতেন, জনগণের নির্বাচিত আইনপ্রণেতারা ব্যবস্থাটিকে পথভ্রষ্ট করে ফেলে। প্রতিনিধিত্বকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তারা যা পছন্দ করে তাই করে। পরিণতিতে, জনগণের সেবক হওয়ার বদলে নির্বাচনের পর তারা জনগণের প্রভুতে পরিণত হতে চায়। এ কারণেই রুশো বলেছিলেন, পরোক্ষ গণতন্ত্রে জনগণ চার বা পাঁচ বছর পর কেবল নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার সময়ই স্বাধীন হয়।

আগামী ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, প্রায় অর্ধেক নির্বাচকই নির্বাচনের দিনের স্বাধীন হওয়ার নামমাত্র সুযোগটুকুও পাবেন না। নির্বাচন কমিশন ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করার পর থেকে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলছে তাতে নানা জটিলতায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট যারা জাতির একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্বকারী তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। সবাই সম্যকভাবে অবগত রয়েছে যে প্রধান বিরোধীদলের নির্বাচন থেকে দূরে সরে থাকার কারণ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও প্রকৃতি নিয়ে সৃষ্ট মতপার্থক্য। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার মহাজোটের অংশীদারেরা দৃঢ়ভাবে বলছে যে সরকারি দলই নির্বাচন তদারকির জন্য অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করবে। তারা বলছে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে এমনটা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিএনপি এবং তার মিত্ররা জোর দিয়ে বলে যাচ্ছে যে দলীয় সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। তারা এ ধরনের সরকারকে দলের প্রতি অন্ধ অনুগত বলে মনে করে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে তারা বিরতিহীনভাবে মহাসড়ক, রেলপথ এবং নৌপথ অবরোধের মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে চলেছে। অবরোধ কেবল সহিংসই হচ্ছে না, এটা কার্যত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা জীবনকেও অচল করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতে ইসলামী নেতাদের শাস্তি দেওয়ায় ১৮ দলীয় জোটের প্রধান অংশীদার এই সংগঠনটি ব্যাপক সহিংসতার মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এই সবকিছুই দেশকে এটি মহাসঙ্কটে নিয়ে গেছে। অব্যাহত রাজনৈতিক বিভাজন প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণবিহীন জাতীয় নির্বাচনের পথ প্রস্তুত করেছে। এর ফলে দেড় শতাধিক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছেন। এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের, ডজন খানেক ১৪ দলীয় জোটের বাম দলগুলোর। বিএনপি নির্বাচন না করলে জাতীয় পার্টিও তাতে অংশ নেবে নাজাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম এরশাদ হঠাৎ করে এই ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দলটির অবস্থানও অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়েছে। গুজব রয়েছে, এরশাদের স্ত্রী রওশনের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেবে। বলা হচ্ছে, তাদের জন্য প্রায় ৬১টি আসন বরাদ্দ থাকবে, আর আওয়ামী লীগ পাবে ২২৭টি। যাই হোক না কেন, ধরে নেওয়া যায় যে আসন্ন নির্বাচনকালে সরকার শান্তি শান্তি অবস্থা বজায় রাখতে পারবে, যদিও নির্বাচনটি দেশে ও দেশের বাইরে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। সংবিধান এবং আইনি বিধান এবং প্রক্রিয়াগত পরিভাষায় নির্বাচনটিকে নিয়ে প্রশ্ন করা যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে ভয়াবহ সন্দেহ রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক এবং পর্যবেক্ষকেরা বলে আসছেন, অবিবেচনাপ্রসূত এই নির্বাচন জাতির জন্য কল্যাণকর হবে না। এতে আইনি তকমা থাকলেও এর নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন থাকবে।

তারপর আসে বাস্তব রাজনীতির প্রসঙ্গ। বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনের ফলে, এমনকি এগুলো কোনোভাবে সম্পন্ন করা হলেও, জাতি এমনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে যে জোড়া লাগানো হয়ে পড়বে আরো কঠিন। জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় ৬ ডিসেম্বর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এক ধরনের সংলাপ চললেও সংঘাতমূলক রাজনীতির অবসান ঘটেনি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের পর থেকে বিরোধী দলের অবরোধ আবার শুরু হয়েছে। গোপন সংলাপ থেকে কোনো ধরনের ইতিবাচক ফলাফল আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় নির্বাচনের পর নতুন বছরেও বিরোধী আন্দোলন সম্প্রসারিত হতে পারে। জাতি ও সমাজ ইতোমধ্যে বিপজ্জনকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগ গ্রহণ করে ডান চরমপন্থীরা তাদের অবস্থান আরো সংহত এবং নির্মম সহিংসতার পরিকল্পনা করতে পারে। জাতি ইতোমধ্যে জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতি বরণ করেছে। মাসব্যাপী অবরোধ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ১১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে, পেট্রোল বোমা দিয়ে আগুন ধরিয়ে নৃশংসভাবে বাসযাত্রীদের হত্যা করার ফলে নাগরিকদের মধ্যে গভীর দুঃখ, বেদনা ও কষ্টের সৃষ্টি হয়েছে।

ক্ষতি কেবল রাজনৈতিক বা আবেগপূর্ণ নয়, অর্থনৈতিকও। রাজনৈতিক গোলযোগ ও সহিংসতার কারণে ব্যবসাবাণিজ্য ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। শিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিদেশি এবং দেশিউভয় ধরনের বিনিয়োগও সর্বনিম্ন অবস্থায় নেমে গেছে। নভেম্বরে বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব স্থগিত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত কক্সবাজারের সোনাাদিয়ার কাছে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রাথমিক কাজের সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে। নভেম্বরে তৈরি পোশাক রফতানি আগের মাসের তুলনায় এক বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। জনশক্তি রফতানিও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ভ্রান্ত রাজনীতি ও অথর্ব কূটনীতি পতনের ধারাকে তরান্বিত করছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এখনো উল্লেখযোগ্য থাকলেও তাও চাপের মুখে রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও ব্যবসা আরো কঠিন হয়ে পড়ায় বিনিয়োগ কমছে। শিল্প বা বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা জমে ২৮০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশব্যাপী অবরোধ ও হরতালের প্রায় বিরামহীন রাজনৈতিক সহিংসতায় কৃষক, জেলে, ছোট ব্যবসায়ী ও পরিবহনকর্মীসবাই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। অব্যাহত সঙ্কটের কারণে অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ৫ জানুয়ারি সমাপ্য বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন চলমান রাজনৈতিক সঙ্ঘাত সমাধানে কোনো আশার আলো দেখাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। এতে বরং সঙ্ঘাত আরো তীব্র হতে পারে এবং আরো কঠিন সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। যে কোনোভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং কার্যকর রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বোঝাপড়া প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ মীমাংসা জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাবলীর সমাধান করতে পারে। সক্রিয় গণতন্ত্রের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের সত্যিকার শিক্ষা হচ্ছে এটাই।।