Home » রাজনীতি » নির্বাচন নির্বাসনে – জনগণ নির্যাতনে

নির্বাচন নির্বাসনে – জনগণ নির্যাতনে

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

political-cartoons-38দিন বদলের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৯ সালে তিনচতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। দিন বদলের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা, জনগনের দিন বদলেছে কিনা, ভাগ্যের আদৌ কোন উন্নতি হয়েছে কিনা, এ নিয়ে এন্তার আলোচনা, তুমুল বির্তক, অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এসে তারা নির্বাচনের ধারনাটি বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। তারা উপহার দিয়েছে একটি একক প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচন এবং সহিংস আতঙ্কিত বাংলাদেশ। নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সরকার এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এ কাজটি করতে ব্যর্থ হয়েছে, দিন বদলের নামে সুষ্ঠ নির্বাচনকে আপাতত: তারা নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

আমরা আপাতত: দৃষ্টি ফেরাতে পারি বিগত সময়ের অনুষ্ঠিত দুটি একদলীয় নির্বাচনের দিকে। তুলনা করার জন্য নয়, ইতিহাসকে স্মরণ করার জন্য মনে করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও তত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটির কথা। গোটা জাতি যখন মুক্তিযুদ্ধে রত তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ৭৮ টি আসন ও প্রাদেশিক পরিষদের ১০৫ টি আসনে নির্বাচনের তারিখ ছিল ১২ ও ২৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ঐ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল ১০৮ জনকে। এর মধ্যে জাতীয় পরিষদে ৫৩ জন এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৫৫ জন। এ আসনগুলি ভাগ বাটোয়ারা হয়েছিল জামায়াতে ইসলামী ১৪, পিডিপি১১, কনভেনশন মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী , কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কাইউম মুসলিম লীগ ৪ এবং পিপলস পার্টি৬। ভোটাভুটি ছাড়া এই নির্বাচনে বিজয়ীদের কোনদিন সংসদে বসার সুযোগ ঘটেনি। কারন ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে।

এর পরের একদলীয় নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। তৎকালীন বিএনপি সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ছুতোয় ঐ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত করেছিল এবং তিন মাস আয়ুর ঐ সংসদে ঐতিহাসিক ততত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলটি পাশ হয়েছিল। প্রধান বিরোধী দলগুলি অংশ না নিলেও ঐ নির্বাচনে নাম সর্বস্ব ৪৩ টি দল অংশ নিয়েছিল এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা ছিল ৪৯ জন। ১৯৭১ সালকে বাদ দিলে স্বাধীন বাংলাদেশে এ যাবতকালে সেটিই ছিল রেকর্ড। এ কলঙ্কজনক নির্বাচনের ইতিহাস ভুলতে না ভুলতেই ২০১৪ সালে অনুষ্ঠেয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসের কলঙ্ককে আরো স্থায়ীরূপ দেবে বলে ইতিমধ্যে সকলের কাছে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। এই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের সংখ্য ১৫৪ জন। একালের পৃথিবীর কোন দেশে সংসদ নির্বাচনে এ রকম ফলাফলের নজির নেই। আধুনিক পৃথিবীতে ফ্রি, ফেয়ার, ক্রেডিবল ও ইনক্লুসিভ নির্বাচনের যে কথাগুলো সবসময় শোনা যায়, এবারের নির্বাচন সেরকম প্রত্যেকটি শব্দকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও দীর্ঘকাল রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবার বিষয়টি পাকাপোক্ত হয়ে গেল। বিশেষত: জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের বদলে নির্বাচনে রাখা এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী দেখানোর জন্য রিটার্নিং অফিসারদের সরকারী দলের ইচ্ছায় যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ইতিপূর্বের সিইসি এম এ আজিজ বা সাদেক আলীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে অনেক অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। এক্ষেত্রে বর্তমান নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীনতা ও পরাধীনতার এক নতুন নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে এবং জনগনের সকল ইতিবাচক বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার পর্যন্ত য়ে সহিংসতা, হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে, তা আর কখনোই ঘটেনি।

একটি একদলীয় নির্বাচনের লজ্জাজনক ও হাস্যকর পরিনতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটি এখনও জাতি জানে না। তবে এর পরিনামে সহিংসতা ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে সেটি অন্তত: জাতির কাছে দৃশ্যমান। বড় দুই দলের দড়ি টানাটানির মাঝখানে পতিত সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের নোংরা খেলা ও রাজনৈতিক বহুগামিতার শিকার বড় দুই দল। তাকে নিয়ে একটি একক নির্বাচনের যে স্বপ্ন ক্ষমতাসীন দল দেখেছিল সেটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হাজার রকম ছলাকলার আশ্রয় নিতে হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারকে। এটিও একটি নজিরবিহীন ঘটনা। ক্ষমতার লড়াইয়ে বড় দুই দলের বিভেদ দেশের রাজনীতিতে সহিংসতা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে। এই ব্যর্থ রাজনীতি বাংলাদেশ নামক দেশটিকে অকার্যকর হিসেবে ব্যর্থ রাষ্ট্রের তিলক পরিয়ে দেবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনার সরকার সম্ভবত: পঞ্চদশ সংশোধনী পাশের পরে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে একটি একক নির্বাচনের নীল নকশা বাস্তবায়নের দিকে হাঁটছিলেন। এজন্য যা যা কিছু করা দরকার, যে সকল ফাঁদ পাতা প্রয়োজন, সেগুলি এক এক করে সরকার সামনে নিয়ে এসেছে। আর সেই পাতানো ফাঁদে বিএনপি হেঁটেছে জামায়াতকে সঙ্গে করে। এজন্য ধারনা করা হয়, বিএনপি যদি শেষতক নির্বাচনে আসতে রাজিও হত, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরী করা হত যাতে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। সরকারের পক্ষে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার জন্য বেশকিছু যুক্তি হাজির করা হয়েছে। যেহেতু যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিচারের রায় সরকার কার্যকর করছে, সে কারনে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে এটি অন্য কেউ মোকাবেলা করতে পারবে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে এ বিচার বন্ধ হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা যেহেতু জঙ্গিবাদকে প্রশয় দেননি সে কারনেই সহিংসতা বেড়েছে। যদি সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি অংশ নিত, তাহলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হত না। প্রধানমন্ত্রী আগ বাড়িয়ে আরো বলেছেন, তাহলে তাদের সঙ্গেও আসন ভাগাভাগি করে নেয়া যেত। বক্তব্য হিসেবে এসব ‘যদি’ এবং ‘তাহলে’ চমকপ্রদ বটে, কিন্তু অগ্রহনযোগ্য এবং অন্তসারশূন্য। নির্বাচন কোন ভাগাভাগির বিষয় নয়, এটি একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। নির্বাচন কমিশন সরকারের সহায়তায় সকলকে নিয়ে অবাধ, সুষ্ঠ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। এক্ষেত্রে বর্তমান কথিত বহুদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি এরশাদকে নিয়ে যে নোংরা, অরাজনৈতিক কাজগুলি করা হয়েছে সেটিও হাস্যকর ও লজ্জাজনক।

অপরিনামদর্শী এই কলঙ্কের দায় এড়াতে সরকার প্রধানসহ তার অনুসারীরা নানানরকম তত্ত্ব ও বাগাড়ম্বর করেই যাচ্ছেন। সবশেষ তত্ত্বটি হচ্ছে, দশম সংসদ নিয়ে আর কোন আলোচনা নয়, বিএনপি রাজি হলে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এটিকে জনগন এবং বিরোধী দল বর্তমান নির্বাচনকে জায়েজ করার জন্য আরেকটি আইওয়াশ বলে মনে করছে। কারন সরকার ইতিমধ্যেই এই গ্রহনযোগ্যতা ও পরিনাম নিয়ে সম্ভাব্য কি ঘটতে তার একটি ধারনা করতে পারছে। এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কোনো দেশের কাছেই গ্রহনযোগ্য হবে না। সহিংসতা আরো বাড়বে এবং নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেতে পারে, যার ফলে অর্থনীতি ও বানিজ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের ওপর ভর করে একটি স্বল্প মেয়াদী সরকার গঠিত হলেও আশংকা রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক ও নিবর্তনমূলক হয়ে ওঠার। ফলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ক্ষমতাবান দেশগুলির হস্তক্ষেপ বাড়বে। জাতিসংঘ সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে। আসতে পারে নানা আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ, যা আমদানীরপ্তানীর ওপর বিরুপ প্রভাব ডেকে নিয়ে আসবে। জঙ্গীবাদ বাড়ার আশংকা রয়েছে এবং লিবিয়া, মিশর, ইরাকের মত পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে।

এই পরিস্থিতি তৈরী করার জন্য প্রধানত: দায়ী হচ্ছে সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল, তারা কেউই এই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। কারন তাদের ক্ষমতায় থাকা অথবা আসার জন্য জনগনকে বিবেচনায় না নিয়ে সমস্ত নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দেয়ায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। একটি সুষ্ঠ নির্বাচন হলে জনগন আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেএই ভয়েই আতঙ্কগ্রস্ত দলটি হাস্যকর একটি নির্বাচনের পথে হেঁটেছে। অন্যদিকে, বিএনপি জোটের অংশ জামায়াত যে ভয়াবহ সন্ত্রাস ও ধ্বংসযজ্ঞ করেছে তার দায়ও তার উপরেও বর্তায়। শত সংকটেও অতীতে এই দলের এরকম রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব জনগন আর কখনই প্রত্যক্ষ করেনি। ফলে এরকম একটি নির্বাচনের ছায়ায় সাংবিধানিক কর্তৃত্ববাদী যে সরকার আসবে তা বাংলাদেশের সব অর্জন ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।।