Home » প্রচ্ছদ কথা » আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের বৈধতার সঙ্কট শুরু

আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের বৈধতার সঙ্কট শুরু

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কট রেখে অন্য দেশে নাক গলানো

আমীর খসরু

political-cartoons-39আগামী নির্বাচনটি ইতোমধ্যেই গণতন্ত্র চর্চার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে দেশেবিদেশে ক্রমাগত প্রচার তো পাচ্ছেই, ইতিহাসেও এটি প্রাপ্য যথাযথ স্থান করে নিয়েছে। অনুন্নত একটি দেশে উদার গণতন্ত্র চর্চার উদাহরণ হিসেবে এতদিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হচ্ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পরিপূর্ণভাবেই উল্টে গেছে। বাংলাদেশ এখন আর এমন উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত তো হয়ই না, বরং উল্টো অভিধায় অভিহিত হচ্ছে দেশটি। কতোদিনে এই কলঙ্কের তিলক এবং নেতিবাচক অবস্থান থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে বা আদৌ পারবে কিনা তাই এখন একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কিন্তু এমন একটি দুর্ভাগ্যজনক, পুরো দেশবাসীর কাছে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে এবং পরিস্থিতি ক্রমাবনতিশীল হলেও এতে তোয়াক্কা করছেন না স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনরা কেউ। বরং প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় এ নির্বাচনটি যে একটি মহান অর্জন এমন মনোভাবই ফুটিয়ে তুলছেন। আর তার বক্তৃতাবিবৃতিতে তিনি যা বলছেন তাতে মনে হয়, এতে তিনি যারপরনাই আনন্দিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার সব শক্তিকে এক হাত দেখিয়ে দিতে পেরেছেন এমন একটা গভীর আত্মতৃপ্তি অনুভব করছেন। তাই যদি না হতো তাহলে কোনো টেলিফোনে কাজ হবে না, সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে জাতীয় সব বক্তৃতাবিবৃতি অবিরাম তিনি দিয়ে যেতে পারতেন না।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনটি যাতে সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য হয় সে পরামর্শটি দিয়ে যাচ্ছে দুনিয়ার সব প্রভাবশালী দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের এই মনোভাব এবং আকাক্সক্ষা যে এ দেশেরও সব মানুষেরই মনের কথা তাও সূর্যালোকের মতো সত্য। এসব ভুলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পক্ষ থেকে ‘ওদের আমরা বোকা বানাতে পেরেছি কিংবা তোয়াক্কা করি না’ বলে যে মনোভাব প্রদর্শন করা হচ্ছে, তাতে ঘোর বিপদ ডেকে আনা হয়েছে যার নজির অতীতে আর দেখা যায়নি। বার বার এর বিপদ সম্পর্কে সতর্ক সঙ্কেত দেয়া হচ্ছিল নানা মহল থেকে। কিন্তু এসব সতর্ক সঙ্কেতকে তারা তুবড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে বাংলাদেশের যে অবস্থা তাতে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পার পাওয়ার মতো যোগ্যতাদক্ষতা যেমন তার নেই, তেমনি দেশটির অর্থনীতিও জোরালো নয়। কাজেই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বেপরোয়াভাবে একতরফা, একদলীয় তামাশার একটি নির্বাচন করার যে বিপদ সেটি ঘনিয়ে আসতে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। নির্বাচনের বেশ আগেই যে টের পাওয়া যাচ্ছে তাই শুধু নয়, দৃশ্যমাণ হয়ে উঠছে ওই সব বিপদগুলো। ইতোপূর্বে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, যদি সব দলের অংশগ্রহণে বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন যদি না হয় এবং নির্বাচনকেন্দ্রীক সহিংসতা চলতেই থাকে,তাহলে তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক পাঠাবে না।

এর মধ্যে জাতিসংঘের বিশেষ দূতের ঢাকা সফর, দৌড়ঝাপ, দূতিয়ালিসহ আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটির কার্যক্রম এবং ক্ষমতাসীনদের দিক থেকে তা কিভাবে ভন্ডুল করে দেয়া হয়েছে তা সবাই অবগত। এমনকি সমঝোতার যে কথাটি বার বার তারা বলছিলেন তাও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এক প্রকার নাকচই করে দেয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন বলা হতে পারে পর্যবেক্ষক না পাঠালেও নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু হয়েছে এবং তারা সারাবিশ্বে এমন প্রচারপ্রচারণা চালিয়ে সব কিছু ঠিকঠাক করে ফেলবেন বন্ধু রাষ্ট্রের সহযোগিতায় এমন হিসাবনিকাশ ইতোপূর্বেকার ভুলগুলোর চাইতেও বড় ভুল। একটি কথা মনে রাখতে হবে, মিথ্যা বড় মিথ্যার জন্ম দেয়, ভুল বড় ভুলের জন্ম দেয়, আর ছোট মিথ্যুক বড় মিথ্যুকে পরিণত হয় ওই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই। একটি বিখ্যাত কথা রয়েছে তুমি একজন মানুষকে মিথ্যা দিয়ে একবার বোকা বানাতে পারবে, কিন্তু মিথ্যা বলে মানুষকে বার বার বোকা বানানো সম্ভব নয়। বরং এতে আখেরে নিজেরই চরম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে তারা এমন একটি নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। এর ঠিক পরের দিনই কমনওয়েলথ জানিয়ে দিল একই কথা। এর পর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়ে দিয়েছে তারা এমন নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে শুধু তারা জানিয়েই দেয়নি, তাদের মুখপাত্র গভীর হতাশাও ব্যক্ত করেছেন এই বলে যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় এমন একটি নির্বাচনে তারা তাদের পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আর একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌছাতে না পারায়ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্তুষ্ট নয় বলে ওই মুখপাত্রের বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এমনই এক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ অন্যান্যরাও যে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না, সে বিষয়টি আগেও বুঝতে পারা গিয়েছিল, এখন পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হলো।

বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষক না পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তার অর্থ হচ্ছে, তারা এই নির্বাচনটিকে বৈধ বলে মনে করে না। আর এ নির্বাচনটি যারা করছেন তাদের বৈধতার সঙ্কটও পুরো মাত্রায় প্রকট হয়েছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, নিজে নিজে গণতন্ত্রের ফর্মুলা বানিয়ে এবং ওই গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে কালোত্তীর্ণ ভাবা, রাষ্ট্রীয় সব বাহিনী কাজে লাগিয়ে জনগণের মুখ বন্ধ করে নির্বাচনটি অবাধ এবং সুষ্ঠু হয়েছে এমনটা প্রচার করা খুব সহজ, কিন্তু এতে যে বৈধতা মিলবে না দেশে এবং বিদেশেতা এখন বোধবুদ্ধি থাকলে বুঝতে পারা উচিত।

শুধু বৈধতার সঙ্কটের বার্তাটি যে এর মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হয়েছে তাই নয়। একই সঙ্গে দুনিয়া জুড়ে আরও একটি বার্তা এবং সঙ্কেত পৌছে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচনের নামে আসলে একটি তামাশা এবং প্রহসন চলছে। আর এর অর্থ হলো বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিতে এখণ গণতন্ত্র তো অনুপস্থিত রয়েছেই, সঙ্গে সঙ্গে দেশটির নানা অর্জন এখন সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে যেসব ঘটনাগুলো ঘটছে তাতে আগামীতে নির্বাচনের নামে যে সরকারটি গঠিত হবে তারাই যে শুধু বৈধতাহীন হিসেবে তখন গণ্য হবে তাই নয়, এখন থেকেই এর প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে গেছে। এ বৈধতার সঙ্কটটি বর্তমান সরকারকেও সঙ্কটাপন্ন করেছে। সোজা কথায়, আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানের সরকারটিও একদলীয়, একতরফা একটি নির্বাচনের কারণে বৈধতার সঙ্কটে ভুগছে। এ সঙ্কট শুরু হতে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্তটি যে শেষ সঙ্কট তাই নয়, সামনের দিনগুলোর সঙ্কট যে আরো গঠিন, জটিল এবং ভয়াবহ হবে তার আলামত ইতোমধ্যে দৃশ্যমাণ হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতগণ যতো ব্যাখ্যাই দিন না কেন, ১৬ ডিসেম্বরের ঘটনার মধ্যদিয়ে তারা তাদের ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না। এখন তারা পরবর্তী কর্মপদ্ধতি কি হবে তা নির্ধারণে আলাপআলোচনায় রত রয়েছেন।

মার্কিন সিনেটে ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরিস্থিতির উপরে যে প্রস্তাবটি (S.RES 318)উত্থাপিত এবং স্বল্পকালেই কমিটিতে ১৮ ০ ভোটে পাস হয়েছে তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। পাসকৃত প্রস্তাবটিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এই বলে যে, – এক. চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সরাসরি ও কার্যকর সংলাপের ব্যবস্থা করা, দুই. এ সঙ্কটের কারণে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সে কারণে বাংলাদেশের সামনের সঙ্কটগুলো মোকাবেলা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তিন. যে সংঘাতসহিংসতা চলছে তা বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং একে নিন্দা জানানোর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আহ্বান এবং সঙ্গে সঙ্গে শান্তিপূর্ণ উপায়ে যাতে রাজনৈতিক প্রতিবাদ জানানো যায় তার ব্যবস্থা করা, চার. আগামী নির্বাচনে যাতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন তার নিরাপত্তা প্রদান এবং পরিবেশ তৈরি করা, পাঁচ.জাতিসংঘের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর যে উদ্যোগ তাতে সমর্থন প্রদান, ছয়. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার কর্মীদের হয়রানি বন্ধ করা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এ প্রস্তাবটি পাসের সময় যে শুধু এ বিষয়গুলোই আলোচনা করা হয়েছে তা নয়, এর বাইরেও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নানাবিধ আলোচনা হয়েছে। আর এ কারণে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে মার্কিন আইন প্রণেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের বলতে হচ্ছে, আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠান সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই করতে হচ্ছে। প্রয়োজনে এবং যে সমঝোতার প্রচেষ্টা চলছে তা কার্যকর হলে এ সংসদটি ভেঙে দিয়ে নতুন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে বাংলাদেশ সরকার যেকোনো সময় প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু এতে বর্তমান নির্বাচন প্রশ্নে মার্কিন মনোভাবের যে আদৌ পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়। তারা এ নির্বাচন সম্পর্কে তাদের অটল এবং সুদৃঢ় মনোভাবই পোষণ করছেন আগের মতোই।

ইতোপূর্বে মার্কিন কংগ্রেসে এক দফা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরেক দফা শুনানির কথা বলা হচ্ছে। জানুয়ারির যে কোনো সময়ে এ শুনানিটি অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা খুবই বেশি। তবে নির্বাচনের পরে শুনানিটি হলে তাতে কি আলোচনা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

বিশ্বে জুড়ে যখন এ অবস্থা চলছে বাংলাদেশের এ নির্বাচনটি নিয়ে, তখন পার্শ্ববর্তী দেশটির অবস্থানের কোনোই পরিবর্তন হয়নি। ভারতীয় পার্লামেন্টের সরকারি টিভি চ্যানেলের চলতি সপ্তাহে এক বিতর্কে ভারতীয় দু’জন কূটনীতিক বলেছেন, বিএনপিজামায়াত আবার ক্ষমতায় এলে তা ভারতের জন্য বিপর্যয়ের শামিল হবে। কারণ হিসেবে তারা জঙ্গিবাদের উত্থান, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ভারতের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বৃদ্ধি, বিশেষ করে ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থান হবে বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের বক্তব্যে এও পরিস্কার হয়েছে যে, তারা বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসুক এটা কোনোক্রমেই সমর্থন করছে না। এটা তাদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এ দু’জন কূটনীতিকের বক্তব্য আর ভারত সরকারের বক্তব্য যে একই তা সবারই জানা।

বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংঘাত এবং সংঘর্ষ চলছে সে কারণে বরং ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থানের সম্ভাবনাটা বেশি রয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোও মনে করছে, বর্তমানে যে সংঘাতসহিংসতার পরিস্থিতি চলছে তার সুযোগ নিয়ে বরং উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে এবং এর সম্ভাবনা যথেষ্ট। এ সংঘাতসংঘর্ষ এবং সরকারি ভূমিকার কারণেই ইতোমধ্যে এর আলামত কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সরকার এটিকে কূটকৌশল হিসেবে গ্রহণ করে দুনিয়াজুড়ে প্রচার করছে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। জঙ্গিবাদের যদি উত্থান হয়ে থাকেই তাহলে তা সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু এ উদ্বেগের কারণকে সরকার দমনের বদলে তা নিয়ে প্রচারের দিকেই বেশি ব্যস্ত। এখানে বলতেই হবে, সরকার হেফাজতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে মাঠে নামিয়ে ধর্মীয় গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে এবং এখন আবার প্রচারপ্রচারণা চালাচ্ছে সরকারের যতোটুকু কাজে লাগে ঠিক ততোটুকুই। কিন্তু সবাই জানে যে, সরকার জঙ্গিবাদ দমন করছে না, এ নিয়ে ফায়দা লুটছে। আর ভারতের ক্ষেত্রে এ জঙ্গিবাদ যতো বড় ইস্যু তার চেয়েও বড় ইস্যু হচ্ছে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা কৌশলগত অবস্থান। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তাদের এই গোপন এজেন্ডার কথা তারা জোরেশোরে কখনো বলছে না। বর্তমান সরকার ট্রানজিটসহ যে সব সুযোগসুবিধা দিয়েছে তা যে হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং এতে ভারতের নিরাপত্তা কৌশলগত দিক থেকে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে এ কথাগুলো সরাসরি না বলে এদিকসেদিক করে তারা ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যদি মৌলবাদীতায় আচ্ছন্ন হতো তাহলে গত আগস্টসেপ্টেম্বরে ভারতের উত্তর প্রদেশের মোজাফফর নগরে দীর্ঘ দুই মাস ধরে যে নৃশংস হিন্দুমুসলিম রায়ট হয়ে গেল এবং নিহত হলো অসংখ্য মানুষ, সে সময়ে এ দেশটিতে তো তার কোনো প্রভাব পড়েনি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন চলতি বছরই সে দেশে ৪১০টি ছোট বড় রায়টের ঘটনা ঘটেছে। আর দু’বছরে ঘটেছে সরকারি হিসেবেই ৮৬১টি। কই, বাংলাদেশে তো তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না? তাহলে ভারত কিভাবে বলছে, বাংলাদেশে কোন সরকার থাকলে তাদের জন্য কোন সুবিধাটি হবে। এ কথাটিও বলা দরকার, গত কয়েক বছরে ভারতেরই মধ্যে যে সব উগ্রবাদীতার ঘটনা ঘটেছে এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণ তো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সরকার তো নয়ই। কাজেই মৌলবাদের উত্থান যদি হয়, জঙ্গিবাদ যদি বেড়ে থাকে তা দমনের দায়দায়িত্ব দাদাদের নয়, বাংলাদেশের সরকারের এবং জনগণের। এটা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ কখনই কোনো উগ্রবাদ তো বটেই ধর্মীয় জঙ্গিবাদকে পছন্দ করেনি এবং করে না। শায়খ রহমান এবং বাংলা ভাইদের কার্যক্রমকে জনগণ যেমন প্রশ্রয় দেয়নি, তেমনি যেদিন তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তখন কেউই এতে দুঃখ প্রকাশ করেননি। কারণ এ দেশের জনগণ মৌলবাদীতায় কখনো আচ্ছন্ন নয়। এ জন্যই ভোটের সময় ধর্মীয় দলগুলো অন্যান্য দলগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম ভোট পেয়ে থাকে।

ভারতে বর্তমানে নির্বাচন শুরু হয়ে গেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য হিন্দু মৌলবাদী বিজেপিসহ উগ্রপন্থী দলগুলো নির্বাচনে জয়লাভ করছে। আগামীতে নরেন্দ্র মোদীর মতো একজন ব্যক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ তো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তাহলে নিজের দেশ রেখে অন্য দেশের দিকে হাত বাড়ানোর এ কোন কৌশল? আর এ কৌশলে বাংলাদেশের সরকারসহ যারা শামিল হয়েছেন তারা কোন উদ্দেশে শামিল হয়েছেন তা বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা নয়। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশটির এতো অতিআগ্রহের পেছনের মূল কারণটি কি?

পশ্চিমী দুনিয়া উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদের ব্যাপারে ভারতের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। তারা বলছেন, বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া উচিত সকল দলের অংশগ্রহণে। বাংলাদেশের জনগণও তাইই চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল এবং এর প্রধান একটি মাত্র দেশের দিকেই তাকিয়ে আছেন দেশের জনগণের শক্তিতে তিনি বিশ্বাসী নন।

সব মিলিয়ে একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠানের আগেই ওই নির্বাচনটি অবৈধ হয়ে পড়েছে দেশে এবং বিদেশে। আর এর মাধ্যমে নির্বাচন হওয়ার আগেই ক্ষমতাসীনরাও বৈধতার সঙ্কটে ভুগছে। কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে তা শুধু ক্ষমতাসীনদেরই নয়, সমগ্র দেশ এবং এর জনগণকে সীমাহীন একটি সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।।

2 টি মন্তব্য

  1. বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যদি মৌলবাদীতায় আচ্ছন্ন হতো তাহলে গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভারতের উত্তর প্রদেশের মোজাফফর নগরে দীর্ঘ দুই মাস ধরে যে নৃশংস হিন্দু-মুসলিম রায়ট হয়ে গেল এবং নিহত হলো অসংখ্য মানুষ, সে সময়ে এ দেশটিতে তো তার কোনো প্রভাব পড়েনি। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন চলতি বছরই সে দেশে ৪১০টি ছোট বড় রায়টের ঘটনা ঘটেছে। আর দু’বছরে ঘটেছে সরকারি হিসেবেই ৮৬১টি। কই, বাংলাদেশে তো তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না? তাহলে ভারত কিভাবে বলছে, বাংলাদেশে কোন সরকার থাকলে তাদের জন্য কোন সুবিধাটি হবে। এ কথাটিও বলা দরকার, গত কয়েক বছরে ভারতেরই মধ্যে যে সব উগ্রবাদীতার ঘটনা ঘটেছে এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে – সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণ তো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সরকার তো নয়ই। কাজেই মৌলবাদের উত্থান যদি হয়, জঙ্গিবাদ যদি বেড়ে থাকে তা দমনের দায়দায়িত্ব দাদাদের নয়, বাংলাদেশের সরকারের এবং জনগণের। এটা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ কখনই কোনো উগ্রবাদ তো বটেই ধর্মীয় জঙ্গিবাদকে পছন্দ করেনি এবং করে না। শায়খ রহমান এবং বাংলা ভাইদের কার্যক্রমকে জনগণ যেমন প্রশ্রয় দেয়নি,তেমনি যেদিন তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় তখন কেউই এতে দুঃখ প্রকাশ করেননি। কারণ এ দেশের জনগণ মৌলবাদীতায় কখনো আচ্ছন্ন নয়। এ জন্যই ভোটের সময় ধর্মীয় দলগুলো অন্যান্য দলগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম ভোট পেয়ে থাকে।

  2. Mohammad Fazle Rabbani

    Patriot jurnalist. Please write more on this critical moment of the our country and want to see you in talk show. 
    Allah apner valo karun.