Home » রাজনীতি » স্ত্রীর ক্ষমতায়ন এবং যৌক্তিক দুর্নীতি

স্ত্রীর ক্ষমতায়ন এবং যৌক্তিক দুর্নীতি

এম. জাকির হোসেন খান

political-cartoons-37সবশেষ খবর হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে প্রার্থীদের হলফনামা নামিয়ে ফেলা হয়েছে। উদ্দেশ্য, সরকার দলীয় প্রার্থীদের সম্পদের যে পাহাড় গড়ে উঠেছে, শূন্য থেকে শত শত গুণ বেশি তা ধামাচাপা দেয়ার জন্য। ‘দলদাস’ নির্বাচন কমিশন যোগ্য কাজই করেছে, সন্দেহ নেই। কারণ স্বয়ং সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছিল, দুর্নীতিবাজদের স্থান বাংলাদেশে হবে না। হলফনামা যদি সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসী জেনে ফেলেন তাহলে এ বক্তৃতা বন্ধ হয়ে যাবে। অবশ্য ইতোমধ্যে যা কিছু বেরিয়েছে এবং তথ্যউপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে নানা জনের নামে তাতে ওই বক্তৃতা আর দেয়া উচিত হবে কিনা তাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। দেশেবিদেশে বাংলাদেশের দুর্নীতির যে সব কাহিনী প্রচারিত এবং প্রকাশিত হয়েছে তাতেই রাষ্ট্রটি দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন এমন একটি ধারণা সবার মনে আবারও গাঢ় হয়েছে। অথচ ২০০৮এর নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ করার কথা উল্লেখ করেছিল। যদিও এই জেহাদ অব্যাহত আছে, তবে তা বিরোধী দমনে এবং একদলীয় নির্বাচনে। পদ্মা সেতু, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ এবং সর্বোপরি শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি এবং দুর্নীতির মতো ঘটনা ঘটার পরেও তাদের মুখ থেকে ‘তারা দুর্নীতিমুক্ত ধোয়া তুলসি পাতা’ এমনটা প্রচারপ্রচারণা থেমে নেই। কিন্তু নির্বাচনী হলফনামায়ই (যাতে আসল তথ্য কতোটা দেয়া হয়েছে তা তদন্ত সাপেক্ষ) দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে কার সম্পদ কতোটা বেড়েছে। আর এসব কারণেই যে দুর্নীতি দমন কমিশন নামের একটি কাগুজে বাঘকে কাগুজে বিড়ালেরও অধম করা হয়েছে তা স্পষ্ট, উদ্দেশ্য পরিষ্কার। অথচ অর্থমন্ত্রী মঙ্গলবার সম্পদের এই মহাস্ফীতিকে ‘ক্ষমতায় থাকলে আয় বাড়া স্বাভাবিক’ বলে একে যৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থমন্ত্রী যখন এমন কথা বলেন তখন ধরে নিতে হবে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ কেন বাড়বে এবং তাদের যুক্তির মাপকাঠিটা কেমন? সরকার গঠনের সময় সরকার প্রধান কথা দিয়েছিলেন, মন্ত্রীএমপিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হবে।

বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের সকল তত্ত্ব এবং তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত করে অবৈধ, বিতর্কিত, ভোট ছাড়াই রক্তক্ষয়ী ১০ম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় প্রকাশিত সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, ২০০৮ এর তুলনায় ২০১৩ এ সম্পদের পরিমাণ কোন কোন ক্ষেত্রে ১৩২ গুণ বেড়েছে। এ এক অভাবনীয় আর্থিক উন্নতি জাতির কর্ণধারদের উল্লেখ্য, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি প্রতিবেদন মতে, ২০০২ সালে বাংলাদেশের বাইরে অর্থ পাঁচারের পরিমাণ মাত্র ০.৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও ২০১১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাড়ায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী পাঁচারকৃত অর্থের প্রধান উৎস হলো দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ।

২০০৮ এ যে সংসদ সদস্যের স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ছিলো ২৫ লাখ টাকা অবিশ্বাস্যভাবে আলাদীনের চেরাগে ২০১৩ এ তা বেড়ে দাড়িয়েছে ২৫ কোটি টাকায়। শুধুমাত্র পেশা এবং সংসদ সদস্যের সম্মানির মাধ্যমে যে প্রার্থীর ২০০৮ এ আয় ছিলো ২২ লাখ টাকা মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে বার্ষিক আয় বেড়ে ২.১২ কোটি টাকায় দাড়ায়। ইয়াবা সম্রাট বলে খ্যাত দক্ষিণের একজন এমপির গত ৫ বছরে আয় বেড়েছে ৩৫২ গুণ এবং নিট সম্পদ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। আরেকজন এমপি’র ২০০৮ সালে সাইকেলে চড়ে বেড়াতে না পারলেও ২০১৩ সালে কোটি টাকার দু’টি দামি গাড়ি ব্যবহার করেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, অর্থমন্ত্রী তারই নিয়ন্ত্রণাধীন জনতা ব্যাংক হতে ৩৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েই ক্ষান্ত হন নি জনতা ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হলমার্ক কেলেংকারির হোতা তানভীরকে পুনরায় ঋণ প্রদানে সুপারিশ করেছিলেন এমনকি যুক্তি দেখিয়েছিলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা আমাদের জন্য কোনো টাকাই না। শুধু তাই নয়, যে অর্থমন্ত্রী প্রদত্ত হলফনামার মাধ্যমে জানা যায়, তিনি এবং একাধিক মন্ত্রী. সংসদ সদস্য ‘দুষ্টু, রাবিশ এবং বোগাশ’ শেয়ার বাজারের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন। এটা এখন পরিস্কার, শেয়ার বাজার কেলেংকারির প্রধান হোতা কারা এবং কেনো ইব্রাহীম খালেদের রিপোর্টের কোনো ফলাফল ৩০ লক্ষ নি:স্ব বিনিয়োগকারী এখন পর্যন্ত দেখতে পারেনি।

 info

সূত্র: নির্বাচন কমিশন এবং বিভিন্ন সংবামাধ্যমে প্রকাশিত প্রার্থী কর্তৃক দাখিলকৃত হলফনামায় প্রকাশিত সম্পদের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণকৃত

সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক হলো, সর্বহারার অধিকার রক্ষায় শোষণমূক্ত সমাজের বিপ্লবী সৈনিক কিংবা সমাজতন্ত্রের নামে প্রায় ৪০ হাজার মেধাবী ছাত্রের জীবন ধ্বংশে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রীরাও হলফনামায় ‘টক শো’র মাধ্যমে মাসিক গড়ে ১২১৫ হাজার টাকা আয়ে ঢাকায় ‘সর্বহারা’র জীবন যাপনের কাল্পনিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। অথচ, আইজিডব্লিউ এর লাইসেন্স কিংবা বিভিন্ন চ্যানেল অনুমোদন এবং স্কুলে ভর্তি বাণিজ্যের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তারা অভিযুক্ত। শূধু তাই নয়, এক সময়ের বাম সৈনিক প্রাক্তন মন্ত্রী ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে ‘অদৃশ্য ইশারায়’ গত ৫ বছরে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত সম্পদ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য দেবার বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পদের অনেক প্রকৃত তথ্যই প্রার্থীরা চেপে গেছেন। ‘দলদাস’ নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় প্রার্থীরা হলফনামায় সঠিক তথ্য প্রদান না করেই প্রতারণার মাধ্যমে ভোটারবিহীন এ দশম নির্বাচনের আয়োজন।

শুধু কি তাই, বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা এবার ‘স্ত্রী ক্ষমতায়ন’ এর উজ্জল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন; একাধিক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যের দাখিলকৃত হলফনামায় দেখা যায়, ২০০৮ এ স্ত্রী গৃহিনী বা নব্য ব্যবসায়ী হিসাবে উপার্জন একেবারেই শূন্য অর্থাৎ খুবই সামান্য হলেও গত ৫ বছরে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের স্ত্রীরা তাদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সম্পদ উপার্জনে সক্ষম হয়েছেন। একজন এমপি’র ২০০৮ সালে দেওয়া হলফনামায় স্ত্রীর কোনো আয় না থাকলেও ২০১৩ এ তার স্ত্রীর আয় বেড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকায় দাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে ‘মেয়ে জামাই’ হিসাবে সরকারি দলের রাজনীতিকদের যে পোয়াবারো তাতে সন্দেহ নেই!

প্রশ্ন হলো, সম্পদের পাহাড় বানানো এসব মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা গত ৫ বছর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রী হলফনামায় কৃষি আয়ের মাধ্যমে গত ৫ বছরে গড়ে ৫.২৫ লাখ টাকা করে মোট ২৬.২৫ লাখ টাকা এবং গাছ বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা উপার্জন দেখিয়েছেন। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ১৫টি দুর্নীতির মামলা সহ সরকারি দলের নেতাদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয় অথচ দুদকের চেয়ারম্যান এর মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ ছিল না। তাছাড়াও, সিংগাপুর হতে পাঁচারকৃত অর্থ উদ্ধার করতে সরকার সক্ষম হলেও অথচ, বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনী এ সব টাকার কুমিরদের অর্থের উৎস সম্বন্ধে অবহিত নন, এটা কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

এটি এখন প্রশ্নবোধক হয়ে দাড়িয়েছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীকে বাদ দেয়া হলেও পরে প্রধানমন্ত্রী তাকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দেয়ার মধ্যদিয়ে দুর্নীতির অবাধ অধিকার নিশ্চিত করলেন। আর যদি উপার্জিত অর্থ এবং সম্পদ বৈধভাবেই অর্জিত হয়ে থাকে তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতাধর সরকারি দলের মন্ত্রীএমপিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ না করে বিরোধী দলের নেতাদের সম্পদের হিসাব নেয় কেন? সর্বশেষ দুদক আইন ২০১৩ সংশোধনীটি সরকারের হঠাত গৃহীত কোনো পদক্ষেপের অংশ নয় বরং দুদককে অকার্যকর করে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে সরকারের গৃহীত পূর্ব পরিকল্পনার অংশ। অথচ আওয়ামী লীগ এর নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮ এর দিনবদলের সনদ (প্যারা ২) উল্লেখ করা হয় যে, ‘‘ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে, ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশী শক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ জোরালো হচ্ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সবচেয়ে অবাক বিষয় হলো, রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর এসব ব্যক্তির সম্পদের পাহাড় হঠাৎ মাটি ফুরে বের বা উদয় হয়নি। গত পাঁচ বছরে অস্বাভাবিক এ অর্থ উপার্জন সংক্রান্ত তথ্য বিক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ পেলেও দুদক সে সম্পর্কে অনুসন্ধান না করে উল্টো সরকারি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করতে সহায়তা করে। নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট হওয়ার নামে দুদকের পক্ষ থেকে হলফনামায় প্রার্থীদের দাখিলকৃত তথ্য যাচাই না করে প্রকারান্তরে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে সহায়তা করছে। দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে ক্ষমতাধরদের যোগসাজশে দায়িত্ব পালনে অবহেলায় দুদকের কর্মীরা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার কথা। তাছাড়াও, ব্যক্তির প্রকৃত আয় এবং সম্পদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর হলেও বাস্ত^বে এ প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুযায়ী বিরোধী রাজনীতিকদের সম্পদ খোঁজা এবং মামলার মাধ্যমে হয়রানির কাজে লিপ্ত। মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা উপার্জনকৃত অর্থের কর ফাঁকি দিলেও এনবিআর এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। তাছাড়াও, দুর্নীতি খোঁজার নামে দুদক এবং এনবিআর একই সম্পদ খোঁজার কাজ করলেও বাস্তবে সমন্বয় না থাকায় এর ফলাফল শূণ্য।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের সংবিধানের ২০() অনুচ্ছেদে (‘‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুর্পাজিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবে না”) সুস্পষ্টভাবে দিক নির্দেশনা থাকলেও তা লংঘন করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রচেষ্টাকেই জায়েজ করা হচ্ছে।।