Home » অর্থনীতি » আরও বীমা কোম্পানি :: যোগ্যতা দলীয় আনুগত্য

আরও বীমা কোম্পানি :: যোগ্যতা দলীয় আনুগত্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

insurance-1বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে নাম বদলের নামে সামনে যা পেয়েছে তা সবই দখল করে নাম লিখেছে। ওই যে দখল শুরু তার পর থেকেই টেন্ডার দখল, জমি দখল থেকে শুরু করে দখল নামের এমন কোনো জিনিস নেই যা তারা করেনি। এরপরে শুরু হলো হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ডেসটিনিসহ নানাবিধ কেলেঙ্কারি অর্থাৎ ব্যাংক ঋণ দখল। এ দখলেরই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকবীমা সব কিছুই তারা পেয়ে গেলেন দলীয় আনুগত্যের কারণে। অতিসম্প্রতি আরও কিছু বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে স্রেফ দলীয় লোকজনদের এবং তাদের সুপারিশে।

দুই দফায় ১৬টি বীমা কোম্পানির অনুমোদন দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ)। অনুমোদন পাওয়া সব কোম্পানিই রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে। নতুন বীমা অনুমোদন দেয়ার আগে ৪২টি সাধারণ বীমা, ১৭টি জীবনবীমা ও একটি বিদেশি জীবনবীমা মেটলাইফ আলিকো এবং সরকারি সংস্থা সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশন নিয়ে ছিল দেশের বীমা খাত। সম্প্রতি দুই দফায় যোগ হয়েছে আরো ১৬ বীমা কোম্পানি। রাজশাহী৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলমের সুপারিশে আলফা ইসলামী লাইফের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। আর এর কর্ণধার হলেন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী নাজিমউদ্দিন আহমেদ। স্বদেশ লাইফের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরীকে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের সুপারিশে ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আওয়ামী লীগের নেতা জাকের আহমেদ ভূঁইয়াকে। আর যমুনা লাইফ ইনস্যুরেন্সের জন্য সুপারিশ করেছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ছেলে সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন। এছাড়াও ডায়মন্ড লাইফ ইনস্যুরেন্সের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নাকে।

এর আগে গত ৪ জুলাই প্রথম দফায় ১১টি বীমার অনুমোদন দেওয়া হয়। কোম্পানিগুলো হলো মেজর জেনারেল (অব.)হাফিজ মল্লিকের বেস্ট লাইফ, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের তাইয়ো সামিট লাইফ, এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর গার্ডিয়ান লাইফ, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ফরিদুন্নাহার লাইলীর জেনিথ ইসলামী লাইফ, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এবং ব্যবসায়ী নূর আলীর চার্টার্ড লাইফ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামের প্রটেকটিভ লাইফ, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সোনালী লাইফ, কানাডাপ্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আহাদের এনআরবি গ্লোবাল লাইফ, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম নাসির উদ্দিনের মার্কেন্টাইল লাইফ, সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নাল হক সিকদারের সিকদার ইনস্যুরেন্স কোম্পানি এবং বাংলাদেশ সেনাকল্যাণ সংস্থার সেনাকল্যাণ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি।

নতুন বীমা কোম্পানি অনুমোদন দেয়ার উদ্দেশ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি বীমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা২০১৩ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। গেজেট প্রকাশের পর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন বীমা কোম্পানির নিবন্ধনের জন্য আইডিআরএর পক্ষ থেকে আবেদনপত্র চাওয়া হয়। এরপর তিন দফা সময় বাড়িয়ে ১৫ মে পর্যন্ত তা বর্ধিত করা হয়। এই সময়ের মধ্যে মোট ৭৭টি আবেদন জমা পড়ে। প্রাথমিকভাবে ১১ নতুন বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে নয়টি জীবনবীমা ও দুটি সাধারণ বীমা কোম্পানি রয়েছে। বীমা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ৬২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে, যা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। বিদ্যমান কোম্পানিগুলোই ঠিকমতো চলতে পারছে না। এই অবস্থায় রাজনৈতিক বিবেচনায় এর আগে ১১টি বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়লে বীমা খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে এবং বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তখন তারাই দলীয় প্রভাবশালীদের তুষ্ট করতে নতুন নতুন ব্যাংকবীমার অনুমোদন দিয়ে থাকে। তবে এবারে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতির আকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। বাস্তবতা হল, গত কয়েক বছর ধরে দেশের ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিরাজ করছে স্থবিরতা। এ অবস্থায় নতুন নতুন বীমা কোম্পানি গড়ে উঠলে সেসবের আয়ের উৎস কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। দেশে বিদ্যমান বীমা কোম্পানিগুলোই ভালোভাবে চলতে পারছে না। বীমা খাতে চলছে নানা অনিয়ম। বীমা কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতার কাছে প্রায় জিম্মি হয়ে পড়ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সব নিয়মকানুন মেনে বীমা করেও দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার পরে মাসের পর মাস অতিবাহিত হলেও দাবির অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। অধিকাংশ কোম্পানিই নানা অজুহাতে ঠকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানার মালিককে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলো ২০১১ সালে প্রিমিয়াম বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে আয় করেছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে গ্রাহকদের দাবির অর্থ ফেরত দিয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। এ অর্থ পেতেও নানা ঝক্কি, পদে পদে হয়রানি।

আসলে বীমা ব্যবসা সম্প্রসারিত হলেও এ খাতে কোনো সুষ্ঠু ও সমন্বিত নীতিমালা না থাকায় কোম্পানিগুলো বীমা দাবির অর্থ পরিশোধে সময়ক্ষেপণ করছে মাসের পর মাস। এ প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন বীমা কোম্পানি এলে সেগুলো কতটা ভালোভাবে চলতে পারবে, তাদের বীমা গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কিনা, সেটা এক বড় প্রশ্ন। নতুন নতুন ব্যাংকবীমার অনুমোদন দেয়ার ফলে দেশে লুটপাটের পরিমাণ এবং এর আখড়ার সংখ্যা বাড়ছে কিনা, জনমনে এ প্রশ্নও রয়েছে। উপকারভোগীর অনুপাতে দুর্ভোগে পতিত ও প্রতারিত লোকের সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে গেলেই বিপদ বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নতুন বীমা কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি এগুলোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর সেগুলো যাতে নিয়মনীতি মেনে চলে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে।।